চীন-মার্কিন বিরোধে যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ এপেক সম্মেলন

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : সুদীর্ঘ ২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হলো এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলন। বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তীব্র বিরোধের কারণেই শেষ মুহূর্তের যৌথ বিবৃতি প্রকাশে ব্যর্থ হন অংশগ্রহণকারী নেতারা। যে সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে এপেকের যাত্রা, এবারের আয়োজনে তার কোনো উপস্থিতি ছিল না বলে সমালোচনা চলছে। খবর বিবিসি, সিএনএন ও রয়টার্স।
পাপুয়া নিউগিনির রাজধানী পোর্ট মোর্সবিতে অনুষ্ঠিত এপেক সিইও সামিটে সদস্য দেশগুলোর নেতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এবারের সম্মেলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার ছায়া বিদ্যমান ছিল।
পাপুয়া নিউগিনির প্রধানমন্ত্রী পিটার ও’ নেইল বলেন, ‘এখানে উপস্থিত দুটি বড় জায়ান্ট’ সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। তিনি আরো উল্লেখ করেন, এপেক সম্মেলনের চেয়ারম্যানের বিবৃতিটি পরে প্রকাশিত হবে। ২০২০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে ‘উদার ও মুক্ত বাণিজ্য’ নিশ্চিতের চেষ্টা করবে এপেক এ কথা উল্লেখ করে নেইল তার মন্তব্য শেষ করেন।
এ দিকে শুধু বাণিজ্য ইস্যু নয়, আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে এ সম্মেলনেও তীব্র মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে। সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করতে মানুস আইল্যান্ডে একটি নৌঘাঁটি নির্মাণে অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির (পিএনজি) উদ্যোগের সঙ্গে যোগ দেবে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেন, এ ঘাঁটি ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং সমুদ্র অধিকার সুরক্ষায়’ সহায়তা করবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও নিশ্চিত করেছেন, বাণিজ্য বিষয়ে মতানৈক্যই চূড়ান্ত বিবৃতি প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, ‘বেশকিছু বিষয়ে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।’ সম্মেলনের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র জানিয়েছেন, অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা-বিষয়ক একটি নির্দিষ্ট লাইন নিয়ে চীন সম্ভবত উদ্বিগ্ন ছিল। তিনি আরো জানান, চীনের জন্য সবচেয়ে ‘সমস্যাযুক্ত’ লাইনটি ছিল, ‘আমরা সব ধরনের অন্যায্য বাণিজ্যচর্চাসহ রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্মত।’ তিনি বলেন, ‘তারা মনে করেছিল ‘অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা’ বিষয়টির মাধ্যমে কোনো কিছুর আভাস দেয়া হচ্ছে। এ সামান্য বিষয়ে চীনের উদ্বেগ দেখে মনে হচ্ছে, তাদের একটি সমঝোতায় পৌঁছানোয় সত্যিকার অর্থেই কোনো ইচ্ছা নেই।’
এর আগেও অনেকবার ট্রাম্প প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগ এনেছে। বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষাসহ নিজেদের বেশকিছু দাবি পূরণে চীনকে বাধ্য করতে দেশটির ২৫ হাজার কোটি ডলারের রফতানি পণ্যে শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এপেক সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তে উপস্থিত ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও চীনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এনে বলেন, ‘বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে চলেছে চীন কিন্তু সেই দিনের এখন সমাপ্তি ঘটেছে।’
অন্য দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এপেকে দেয়া ভাষণে বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমেই’ সব ব্যবধান দূর করা যাবে। এপেক সম্মেলন যৌথ বিবৃতি ছাড়া শেষ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে চীনের গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীনকে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ভাবা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলিটদের মারাত্মক ভ্রম। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সমস্যার পেছনে ভুল করে চীনকে দোষ দিয়ে যাচ্ছে। চীন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নতি করেছে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে সুবিধা নিয়ে নয়।’
কোনো ইশতেহার ছাড়াই এপেক সম্মেলন শেষ হওয়ায় সমালোচনা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির এশিয়া বিভাগের পরিচালক ইউয়ান গ্রাহাম বলেন, ‘এটিকে এপেকের প্রতিষ্ঠাকালীন বাণিজ্য দৃষ্টিভঙ্গির মৃত্যু বলা যায়। এপেক ছিল আঞ্চলিক সম্মেলনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মীমাংসাযোগ্য একটি প্লাটফর্ম।’
সহযোগিতা নয়, বরং এবারের সম্মেলনটি ছিল পারস্পরিক নীতিমালা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বিরোধে পূর্ণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অংশগ্রহণকারী বলেন, ‘আমি মনে করি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এপেকের স্পিরিট ছিনতাই করেছে।’
গত ১৯ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শোয়াং বলেন, এপেক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রচ- রাগ নিয়ে’ অংশগ্রহণ করেছিল। যার ফলে বিতর্ক, মতানৈক্য সৃষ্টি হয় এবং ‘ঐক্যতানের পরিবেশ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এপেক একটি গভীর সহযোগিতার প্লাটফর্ম, এটি পারস্পরিক সমালোচনার কোনো জায়গা নয়।’
আগামী সপ্তাহে আর্জেন্টিনায় জি২০ সম্মেলন উপলক্ষে সম্ভবত মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। এপেকের পর সেখানে দুই দেশ কী ভূমিকা নেয়, এখন সেদিকেই লক্ষ সবার।