চেনা মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে

কত আপন, কত প্রিয় সব মানুষ। প্রবাসজীবনের সুখ-দুঃখের সাথি। চেনামুখের এসব মানুষ নিজেদের স্বজনের চেয়েও ছিল অধিক স্বজন। নিঃসঙ্গ মুহূর্তের সঙ্গী। কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কসের গ্রোসারি, রেস্টুরেন্টে দেখা-সাক্ষাৎ। আলাপ-পরিচয় গল্পে আড্ডায় প্রহরের পর প্রহর পার করে দেওয়া।
এখন সেই চেনা দৃশ্য নেই। নেই সেই চেনা আসর। ট্রাম্প-ঝড়ে স্বস্তির সেই পরিবেশ যেমন নেই, তেমনি নেই চেনাজানা প্রিয় সেই মুখগুলো। সর্বত্র একটা থমথমে ভাব। আতঙ্কের ছায়া প্রিয়জনদের চোখেমুখে। আমরা জানি, মৃত্যুর পর মানুষ হারিয়ে যায়। খুঁজলেও আর চোখে পড়ে না। ভিড় জমায় আকাশের তারার মেলায়। ট্রাম্প জমানায় ভয়ে-আতঙ্কে যারা নিউইয়র্কে আমাদের চারপাশের চেনা দৃশ্য থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে, তারা কোথায় যাচ্ছে? যারা তারার মালায় মিশে যাচ্ছে, তাদের জন্য কষ্ট বেশি হলেও প্রতীক্ষার কষ্ট নেই! খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশার যন্ত্রণাও নেই! কিন্তু যারা দেশের প্রেসিডেন্টের ভয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের তো স্বজনদের প্রতিমুহূর্তেই ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা, অথচ না পাওয়ার বেদনা বুকে নিয়ে চলা।
দুঃসহ একটি সংবাদ ঠিকানার গত ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ সংখ্যার লিড নিউজ হয়ে অভিবাসী অনেকের বুকেই শেল হয়ে বিঁধেছে। শিরোনামটি হচ্ছে : ‘স্বস্তি নেই বাংলাদেশি কম্যুনিটিতে : পরিচিত মুখগুলো হারিয়ে যাচ্ছে : নতুন বছরে ড্রিম এ্যাক্ট/ ১২ মাসে সোয়া ২ লাখ অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট বহিষ্কার’। দুশ্চিন্তায় কাতর হওয়ার মতোই সংবাদটি। ১ বছরে যদি আমাদের চেনাজানা সোয়া ২ লাখ মানুষকে এ দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়, তবে তো চেনা চারপাশটা ফাঁকা লাগারই কথা! এই সোয়া ২ লাখ মানুষের মধ্যে যে কার কত প্রিয় স্বজন-বন্ধু মানুষ হারিয়ে গেছে, তা-ও হিসাব করে বের করা কঠিন। এই সোয়া ২ লাখ মানুষের মধ্যে আমার এবং আমাদের যেমন স্বজন আছে, তেমনি আছে অন্যান্য কম্যুনিটির মানুষও। আমাদের মতো তাদের বুকেও একই হাহাকার জাগাচ্ছে। তাদের চারধার থেকেও চেনামুখগুলো হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যাচ্ছে।
স্বজন হারানোর এই পরিস্থিতি শুরু হয়েছে ২০১৭-এর জানুয়ারিতে আমাদের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই ইমিগ্র্যান্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন। অবশ্য নির্বাচনী প্রচারণাকালেই তিনি ইমিগ্র্যান্টদের বিতাড়ন অভিযানে নামবেন বলে অঙ্গীকার করেন। ইমিগ্র্যান্টদের শুধু বহিষ্কারই করা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের হয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে গ্রেফতার, বহিষ্কার, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় আটক। এর সংখ্যাও ৩ লক্ষাধিক। এর মধ্যে সহ¯্রাধিক বাংলাদেশিকে আটক করা হয় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার সময়। তারা বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আছে বহিষ্কারের অপেক্ষায়।
ট্রাম্প আমলে বাংলাদেশিসহ সব ইমিগ্র্যান্ট কম্যুনিটিই বহিষ্কার আতঙ্কে আক্রান্ত। অনেকে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় স্বপ্ন গড়ার সব প্রয়াস ত্যাগ করে স্বদেশে চলে গেছে। অনেকে যার যার বহুদিনের চেনা স্টেট ছেড়ে অন্য কোনো অচেনা স্টেটে পাড়ি জমিয়েছে। অনেকেই আবার আগে যেমন মুক্তমনে খোলামেলা চলাফেরা করত, এখন আর সেভাবে চলাফেরা করে না। তাই তাদের চেনাজানা আড্ডায়-আসরে দেখা যায় না আগের মতো। আমরা ট্রাম্পের ইমিগ্র্যান্টবিরোধী নীতির ফলে ক্রমাগত স্বজন হারাচ্ছি, প্রতিবেশী হারাচ্ছি এবং আগামী দিনে এভাবে হারাতেই থাকব, সেই আতঙ্কে ভুগছি।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইলেইন ডিউক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইমিগ্র্যান্টবিরোধী নীতি সমর্থন করে বলেছেন, ‘আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধী, অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট দমনের যে অঙ্গীকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করেছেন, তার প্রয়োজনীয়তা এখন সবাই অনুভব করতে পারছেন।’ মন্ত্রীর কথাটা যে মোটেও সত্য বা বাস্তবানুগ নয়, তা উপলব্ধি করা যায় প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়রের একটি বক্তব্যে। গত অক্টোবর মাসে তিনি নিউইয়র্কে ‘দেশে ও বিশ্বে স্বাধীনতার চেতনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন নীতিকে দায়ী করে বলেছিলেন, ‘জাতীয়তাবাদ বিকৃত করে তা দেশীয়বাদে পরিণত করে উগ্রবাদকে উসকে দিয়ে ঘৃণার বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।’ ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি সহযোগী পত্রিকার সংবাদে ‘আমেরিকায় ঘৃণার বিস্তÍার ঘটছে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ খবরটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইয়াহু নিউজ ইতিহাসবিদ, সমাজতত্ত্ববিদ ও মনস্তত্ত্ববিদদের ওপর একটি তথ্যবহুল জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানেও দেখা যায়, মার্কিন সমাজে আজ ঘৃণার যে বিস্তার ঘটছে তার জন্য তারা দায়ী করলেন ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন বিরোধী কর্মসূচি। তবে তাদের মতে, এ পরিস্থিতি অভিবাসীর দেশ হিসেবে সমাদৃত আমেরিকার জন্য মোটেও শুভ নয়। কোন দেশের জন্য, বিশেষ করে আমেরিকা, যে দেশের আবিষ্কার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিÑসবকিছুই ইমিগ্র্যান্টদের হাত ধরে, সে দেশে মানুষে-মানুষে ঘৃণা, বিদ্বেষ, কল্যাণকর নয়। ঘৃণা বিভাজন সৃষ্টি করে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি নষ্ট করে। তৈরি করে দেয় দূরত্ব। এ রকম সমাজে সহমর্মিতা থাকে না। দায়িত্ববোধ, কর্মোদ্দীপনা হরণ করে। ফল হিসেবে একসময় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি থমকে দাঁড়ায়।
আমেরিকার অন্তত এ কথা বিস্মৃত হওয়া কল্যাণকর হবে না যে, বৈধতার ছাপমারা একটি সার্টিফিকেটই সব পাপমুক্তির ছাড়পত্র হতে পারে না। আমেরিকান বলে আজ যারা দাবিদার, আমেরিকার আবিষ্কার এবং অগ্রগতি কোনোটাই তাদের হাতে নয়। আদিবাসী নামের অবহেলিত মানুষেরাই আমেরিকার সব সৌরভ ও গৌরবের দাবিদার। অথচ এই সভ্য এবং আধুনিক যুগে তাদের দাসত্বের জীবন নিয়ে চলতে হচ্ছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মানুষ যারা, তারা ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ করে চলেছে; যা খুবই অন্যায় ও অনৈতিক।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস নিনা, পিন্টা ও সান্তা মারিয়া নামের তিনটি জাহাজ নিয়ে ১৪৯২-এ স্প্যানিশ প্যালোস বন্দর থেকে এশিয়ার দিকে যাত্রা করে ভুল পথে এসে পৌঁছায় আমেরিকায়। এরও ৪০০ থেকে ৬০০ বছর আগে এশীয় বংশোদ্ভূতরা পা রাখে আমেরিকার মাটিতে। একাদশ শতকে প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে আমেরিকায় আসেন লেইফ এরিকসন। ২৪২ বছর আগে আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জিত হয় যাদের নেতৃত্বে, তাদের পূর্বপুরুষের আদি পরিচয় কি আজকের অভিবাসী-বিদ্বেষী ট্রাম্পদের জানা আছে? ইতিহাসকে সবারই একটু বিবেচনায় রাখতে হয়। নইলে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হয়। সেই কঠিন সময়ে আমেরিকা উদ্ধারে আবার হয়তো ইমিগ্র্যান্টদেরই এগিয়ে আসতে হবে!
তাই আসুন, ঘৃণা ছেড়ে ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় আমরা সবাই মিলে বসবাস করি আমেরিকায়।