ছাত্র আন্দোলনে উত্তপ্ত রাজনীতি

ঠিকানা ডেস্ক : কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্র আন্দোলনে হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতির ময়দান। গত ৮ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগে ছাত্র জমায়েতে পুলিশ-ছাত্রলীগের যৌথ হামলার পর সে আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সাধারণ ছাত্রদের যৌক্তিক অহিংস আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে কেউ কেউ হঠাৎ করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগদানকারী ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় হল ছাত্রলীগের নেত্রীরা। এতে কমপক্ষে ৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে মোর্শেদা নামের এক ছাত্রীর পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ছাত্রলীগের নেত্রীরা আন্দোলনকারীদের মারধর করা শুরু করলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের সভাপতি ইশরাত জাহান এষাকে পাল্টা মারধর করে। পরে তাকে হলের ২০৮ নম্বর রুমে আটকে রাখে শিক্ষার্থীরা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানি ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি হলের ভেতর গিয়ে বের হয়ে এসে বলেন, হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হল কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগ নেত্রী ইশরাত জাহান এষাকে বহিষ্কার করেছে বলে তিনি জানান। এ সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। দ্রুত গাড়িতে করে স্থানত্যাগ করেন। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগের তরফে জানানো হয়, এশাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এশাকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।
আন্দোলনের নেপথ্যে কী ঘটছে : কোটা সংস্কার আন্দোলনের মিছিলে অনেকের হাতেই ছিল শেখ মুজিবের ছবি। একটি অরাজনৈতিক ইস্যুর আন্দোলনে ছাত্ররা কোন রাজনৈতিক নেতার ছবি নিয়ে মিছিল করছেন, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এমন নজির সম্ভবত এটাই প্রথম।
গত ৮ এপ্রিল, রবিবার, ঢাকার শাহবাগে ছাত্রদের যে বড় মিছিলটি সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করছিল, তাতে অনেকের হাতেই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা এবং প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। শুধু তাই নয়, আন্দোলনকারীদের মুখে শোনা যাচ্ছিল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান। যেটি আসলে সচরাচর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের অনুসারী সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশেই শোনা যায়। কিন্তু একদিন পরে সোমবার পার্লামেন্টে সরকারের কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী খুবই কড়া ভাষায় এ আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে, এর পেছনে ‘জামায়াত-শিবির স্বাধীনতা বিরোধীদের’ এজেন্টরা ইন্ধন দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন।
তার মন্তব্য আন্দোলনকারীদের এতটাই ক্ষুব্ধ করে যে, তারা ১০ এপ্রিল, মঙ্গলবার, বিকেল পাঁচটার মধ্যে মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে ক্ষমা চাওয়ার সময় বেঁধে দেয়। নইলে তাদের ‘স্থগিত রাখা’ আন্দোলন আবার শুরু হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেয়।
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার পর সরকার যেমন এ আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি আছে বলে অভিযোগ করছে, তেমনি আন্দোলনকারীরা পাল্টা অভিযোগ করছেন যে তাদের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নানা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে এক আপোস আলোচনার জের ধরে বিভক্ত হয়ে গেছে আন্দোলনের নেতৃত্ব।
নেতৃত্বে আসলে কারা : সরকারি চাকরিতে কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু থেকে যারা সংগঠিত করেছেন, তাদের একজন নুরুল হক। তিনি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি হতে এ সংগঠনের ব্যানারেই চলছে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন।
নুরুল হক জানান, তাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বা আছেন, কিন্তু আন্দোলনটি সম্পূর্ণই অরাজনৈতিক।
‘আমি আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, এখন কোন দলের সঙ্গে নেই। অন্য অনেকে হয়তো কোন দলের সঙ্গে থাকতে পারেন। কিন্তু আমাদের আন্দোলন একেবারেই অরাজনৈতিক। এর পেছনে কোন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নেই। যদি থাকতো আমরা অনেক আগেই সহিংসতার পথ বেছে নিতে পারতাম। কিন্তু আমরা শুরু থেকে একেবারে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন করেছি।’
নুরুল হক বললেন, যারা এ আন্দোলনের পেছনে জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্র খুঁজছেন, তারা আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন।
কিন্তু আন্দোলন যদি এতটাই অরাজনৈতিক হবে, তাহলে মিছিলে কেন তারা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বহন করছেনÑ প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন বাংলাদেশের স্থপতি। এটা যদি কেউ সামনা-সামনি স্বীকার নাও করে, মনে-প্রাণে কিন্তু বিশ্বাস করে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি বৈষম্যমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, আমরাও বৈষম্য দূর করার আন্দোলন করছি। সেজন্যেই আমরা তাঁর ছবি নিয়ে মিছিল করেছি।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তাদের মনে এমন আশংকা আগে থেকেই ছিল যে এ আন্দোলনকে সরকার বিরোধী আন্দোলন বলে চিহ্নিত করা হতে পারে। সেজন্যেই তারা সচেতনভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ব্যবহার করেছেন, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়েছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক তা অস্বীকার করে বলেন, এ ছবি বহনের সিদ্ধান্তটি তাদের সংগঠনের বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবেই নেয়া হয়েছিল। তবে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রী তাসনীম জাহান বলেন, শুরু থেকেই তাদের একটা সচেতন চেষ্টা ছিল এই আন্দোলনকে যেন কোনভাবেই সরকার বিরোধী বলে চিহ্নিত করা না যায়।‘আমরা কোনভাবেই সরকার বিরোধী নই। আমরা সরকারের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তকে সন্মান জানাই। অথচ মিডিয়া এটি এমনভাবে প্রচার করছিল যে আমরা একটা সরকার বিরোধী আন্দোলন করছি। এটা আসলে ভুল।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন গত ৯ এপ্রিল, সোমবার, বিকেলে ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দেন, তাতে স্পষ্ট যে, তারা এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন।
তিনি লেখেনÑ ‘আন্দোলন করতে যারা এসেছে অধিকাংশের হাতেই দেখলাম বঙ্গবন্ধুর ছবি। সাধারণত আন্দোলন-সংগ্রাম-শ্লোগানে বঙ্গবন্ধুর হরেক রকমের ছবি নেতাকর্মীরা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু অবাক করা বিষয়, এখানে সবগুলো ছবি একই রকম অর্থাৎ একই ছবি। রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকাÑ সবখানে সরকারি অফিসে ব্যবহৃত ছবিগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ছবিগুলোর সরবরাহকারী গোষ্ঠী একটিই।’
আওয়ামী লীগের একেবারে উচ্চ পর্যায় থেকে ছাত্রলীগের নেতারাও এ আন্দোলনের পেছনে এখন একই ধরণের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। ‘জামায়াত-শিবির’ এর পেছনে রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন।
কিন্তু আন্দোলনের নেতা নুরুল হক কিংবা সংগঠক তাসনীম জাহান সরকার বা তাদের সমর্থকদের এ রকম বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তাসনীম জাহান বলেন, ‘মতিয়া চৌধুরীর মতো একজন নেত্রী এ কথা বলে আসলে নিজেকেই ছোট করলেন। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, আর উনি আমাকে রাজাকার বলে দিলেন, এটা তো ঠিক হলো না। একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে আমরা এটা আশা করি না।’
নুরুল হক বলেন, তাদের আন্দোলনে অনেক দলের নেতা-কর্মীরাই আছেন। কিন্তু তারা সচেতনভাবে একটি চেষ্টাই করেছেন, যাতে কোনভাবেই জামায়াত-শিবিরের কেউ এ আন্দোলনে থাকতে না পারে। একই সঙ্গে বামপন্থীরাও যাতে এতে যোগ দিতে না পারে।
নেতৃত্বের দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব : গত ৯ এপ্রিল, সোমবার যোগাযোগ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ২০ জন ছাত্র প্রতিনিধি দেখা করতে যান। তারা ফিরে এসে আন্দোলন এক মাসের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের একজন নেতা।
ছাত্র প্রতিনিধিরা যখন টিএসসির মোড়ে এসে সমাবেশে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানান, তখন সেটি চিৎকার করে ‘না না’ ধ্বনি দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা।
নুরুল হক অভিযোগ করেন, কিছু বামপন্থী আসলে এ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে চাইছে। তারা এর সুযোগ নিতে চাইছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, এ আন্দোলনে তারা নৈতিক সমর্থন দিলেও এটিকে তারা সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে দেখেন। তারা তাইি সচেতনভাবেই এ আন্দোলনের মঞ্চ থেকে দূরে থাকছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্সের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন,‘সরকার, বিরোধী দল অনেকেই আমাদের কাছে এসেছে, যারা এটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা বলতে চাই, আমরা ছাত্ররা একটা দাবিতে রাস্তায় নেমেছি, এটা কোনভাবেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হতে পারে না। গুটিকয় হয়তো এর মধ্যে থাকতে পারে, কিন্তু আমরা সেটা দেখছি।’