জগাখিচুড়ি ঐক্যফ্রন্টের আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্য কী

মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার

তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন হুমকি দেওয়া শুরু করেছেন, যার কোনো রাজনৈতিক ক্রেডেনশিয়াল নেই, নেই কোনো জনসমর্থন ও জনসংযোগ। কিন্তু হুমকি দিয়ে বলেছেন, সাত দফা না মানলে তিনি এবং তেনারা নাকি দেখে নেবেন। হায়রে বাংলাদেশের রাজনীতি। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্য না পেলে যে কামাল হোসেনকে কেউ চিনত না। সেই কামাল হোসেন আজ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে হুমকি দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে, যিনি গত ৩৭ বছর জীবনের ওপর বাজি ধরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। গত ১০ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে একটা মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, দারিদ্র্য দূরীকরণসহ বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালের পর একাত্তরের পরাজিত শক্তি কর্তৃক বিনষ্টিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পূর্ণ বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসছেন। তখন এই সময়ে ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক অপশক্তিকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার হুমকি দিচ্ছেন। ড. কামাল হোসেন যেহেতু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন না, তাই হয়ত তিনি জানেন না মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরে ওই অপশক্তিকে কিভাবে পরাজিত করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তো এখনো জীবিত আছে এবং তাদের সন্তানেরাও এখন নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। এক দিকে কথিত ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতির জন্য আরেকটি ট্র্যাজেডি হলেও অন্য দিক থেকে মন্দের ভালো এই জন্য যে, এর মাধ্যমে ড. কামাল হোসেনসহ অন্য সবার আসল রূপটি এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়ে গেল। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, তিনি বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করেছেন, তারেক রহমান এবং জামায়াতের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। একবিংশ শতাব্দীতে ছাই দিয়ে মাছ ঢাকার দিন শেষ। এসব ছলনাপূর্ণ কথা মানুষের বুঝতে সময় লাগে না। বিএনপির অপর নাম জামায়াত এ কথা একটু দেরিতে হলেও বাংলাদেশের মানুষ বুঝে ফেলেছে। আমার এ কথাটি কোনো কথার কথা নয়, এটি নির্মম ও কঠিন সত্য কথা। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির জন্ম হয় ১৯৭৮ সালে। কিন্তু তার জন্ম প্রক্রিয়া ও কর্মকা- শুরু হয়ে যায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের অব্যবহিত পর। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক শাসক হওয়ার পর থেকেই সেই কাজ শুরু করেন।
তিনি সামরিক আদেশ জারি করে মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাহাত্তরের সংবিধান থেকে একেবারে মৌলিক নীতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সংবলিত সব শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাতিল করে দিলেন। এগুলো তো রাজনীতি ও রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়। তিনি তো তখনো রাজনীতিক হননি এবং জনগণের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তিনি এ কাজগুলো করলেন। বিএনপির জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশে একটা ফ্রেশ রাজনৈতিক দল হিসেবে। তাহলে মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং সেখান থেকে উৎপত্তি হওয়া রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও দর্শনের সঙ্গে বিএনপির তো কোনো বিরোধ ও শত্রুতা থাকার কথা নয়। এগুলোর সঙ্গে জামায়াতের চিরদিনের শত্রুতা এ কথা সবাই জানে। ১৯৭১ সালে জামায়াত এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ইতিহাস বাতিল করে দেওয়ার মাধ্যমে তো জামায়াতের এজেন্ডাই বাস্তবায়িত হয়ে গেল। নাম দিয়ে কী হবে, কাজটিই তো ব্যক্তি ও দলের আসল পরিচয় বহন করে। এ কথা তো দিবালোকের মতো পরিষ্কার, বাংলাদেশের জামায়াত হলো পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল, এ কথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপি নামের ছদ্মাবরণটি ধারণ করা তখনকার বাস্তবতায় জরুরি ছিল এবং এটি বিএনপিকে বহুবিধ রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। এটিকে শক্তিশালী করার জন্য বিএনপির নেতৃত্বে আনা হয়েছে জিয়াউর রহমানকে, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত। তার সঙ্গে আরও গুটিকয়েক ক্ষমতা ও সম্পদলোভী কক্ষচ্যুত মুক্তিযোদ্ধা যোগ দেওয়ায় মানুষ তখন বিভ্রান্তিতে পড়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে এদের আসল রূপটি বুঝে ওঠতে পারেনি। বিএনপির এই ছদ্মাবরণটি আরও পুরু করার জন্য কিছু দিনের জন্য জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশের দ্বারা সাংবিধানিক বিধি নিষেধ তুলে দিয়ে মূল জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়, যাতে মানুষ বিএনপিকে জামায়াত বলে আর সন্দেহ করতে না পারে। তাই বিএনপির যে কর্মকা-, যার সামান্য কিছু উপরে উল্লেখ করেছি, তাতে বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলা তো দূরের কথা তাদের বাংলাদেশে রাজনীতি করার মৌলিক অধিকার থাকার কথা কি না সেটাই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে ধরা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ বৃহত্তর তরুণ সমাজের কাছে। কারণ ২৩ বছর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জনের মাধ্যমে যে আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই আদর্শের শুধু বিরোধিতা নয়, সেগুলো ধ্বংস করাই যাদের উদ্দেশ্য তারা কি বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, আমাদের রাজনীতির দুর্ভাগ্য জাতিদ্রোহের মতো আদর্শ নিয়ে তারা বহাল তবিয়তে বাংলাদেশে রাজনীতি করছে। তারপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনাটির বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখুন। এ সংক্রান্ত মামলার রায় সম্প্রতি আদালত থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। জজ মিয়া নাটক সাজানো, এত বড় ভয়ঙ্কর অপরাধের আলামত নষ্ট করে ফেলা, তথাকথিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রহসন, ঘটনার পর আরও প্রায় আড়াই বছর ক্ষমতায় থেকে তদন্ত শেষ না করাসহ সর্বশেষ মামলার রায়ে যা বেরিয়ে এসেছে, তাতে দল হিসেবে বিএনপি কি এই হত্যাকা-ের দায় এড়াতে পারে?
তাহলে কি এই দাঁড়াল না যে, ড. কামাল হোসেন আঁতাত করলেন বিএনপির বেনামে জামায়াতের সঙ্গে এবং যে দলটি সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত। শুধু পার্থক্য এতটুকু যে, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে, আর কলুষিত রাজনীতির বিভ্রান্তিতে বিএনপির নিবন্ধন বহাল আছে। সম্মানিত পাঠকদের অনুরোধ করব জিয়াউর রহমান কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী সম্পন্ন করার পর ওই সংবিধানের দিকে তাকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের যে স্বরূপটি পাওয়া যায় তার সঙ্গে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপির শাসনের স্বরূপটা মিলিয়ে দেখলে অবশ্যই উপলব্ধি করবেন ওই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে কি এই দাঁড়াল না যে, বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তান বানাবার যে প্রকল্প জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন সেই কাজটির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন প্রায় সেরে ফেলেছিলেন ২০০১-২০০৬ মেয়াদের জামায়াত-বিএনপি সরকার। এহেন বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল যখন আঁতাত করেন এবং তার নেতা হন তখন বাংলাদেশের মানুষের বুঝতে বাকি থাকে না এনাদের আসল উদ্দেশ্য কী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কোথায় ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পূর্বে ও পরে তার ভূমিকা এখন মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ঐক্যফ্রন্টের অপর নেতা আ স ম আবদুর রব গংয়েরা স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দলের খেতাব পেয়েছিলেন। ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না তো বহুরূপী। জাসদ, বাসদ, আওয়ামী লীগ হয়ে তিনি এখন বেনামে বিএনপি। একবার পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল তিনি লন্ডনে অবস্থিত বিএনপির এক নেতার সঙ্গে কথোপকথনে বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দু-চারটি লাশ ফেলে দিলেই আন্দোলন জমে উঠবে। সুতরাং ঐক্যফ্রন্টের মিথস্ক্রিয়া ও লেগেসি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। আর এটা বাংলাদেশের মানুষ বুঝে ফেলেছে বলেই তারা আজ দেশের বৃহত্তর মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তাই নির্বাচন তাদের উদ্দেশ্য নয়। নির্বাচন উদ্দেশ্য হলে জয়ী হওয়ার পর কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা স্পষ্ট করে বলতে পারছে না কেন? আগে বললেও এখন কামাল হোসেন বলছেন তিনি কিছুই হতে চান না। আর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন, এ কথা ড. কামাল, রব, মান্না কেউ-ই লজ্জায় বলতে পারছেন না। সুতরাং জগাখিচুড়ি বাংলাদেশ বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন নয়, আসলে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে নির্বাচনকে বানচাল করার জন্যই তারা মাঠে নেমেছেন। কারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী এসব ছদ্মবেশীদের প্রত্যাখ্যান করবে- সেটা তারা বুঝে ফেলেছে।
লেখক : রাজনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক