জনগণই কেবল কোনো নেতাকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখে

ঠিকানাকে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

সাঈদ-উর রব : প্রফেসর এমিরিটাস ড. আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একটি নাম। প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার মানুষ বলে সর্বমহলে পরিচিত। সঙ্কট উত্তরণে জাতি তার কাছ থেকে সুপরামর্শ পায়। সাংস্কৃতিক এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঠেও তিনি সমান সক্রিয়। সম্প্রতি তিনি আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন ওহাইয়োর কলম্বাসে অনুষ্ঠিত বঙ্গমেলা-২০০৮ এ। সেখানেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ প্রতিনিধিকে নাতিদীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারটি দেন। সাক্ষাৎকারে তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি সব বিষয়ই কিছু স্পর্শ করে গেছেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের শিক্ষকতা জীবন অর্ধশতাব্দীকালের। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। মাঝে ৬৯-৮৫ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত অবশিষ্ট পুরোটা সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এখন পর্যন্ত। ৫০ বছরের এই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তার বড় প্রাপ্তি কী? মৃদু অথচ দৃঢ়ভাষী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর প্রফেসর এমিরিটাস-এর স্বীকৃতি। এ আমার পরম পাওয়া। এই অর্জন খুবই তৃপ্তিকর। শিক্ষাক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে মনে হলো খানিকটা উদাস হলেন। বললেন, যখন ছাত্র ছিলাম, তখন পরিস্থিতি পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন রকম ছিল। কোনোরকম সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছিল না। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাস চলে এসেছে। তারপরও মনে করি ছাত্র রাজনীতি থাকা দরকার। অবশ্য রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি এবং সন্ত্রাস পরিহার করাও দরকার। শিক্ষকদের রাজনীতি সম্পর্কে তার অভিমত হচ্ছে, শিক্ষক রাজনীতি বরাবরই ছিল। কিন্তু পরে তার রূপ অনেক বিকৃত হয়েছে। আমরা যত না নিজের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করছি , তার চেয়ে বেশি দলীয় মতামত প্রচারে সক্রিয়। অবশ্য এতে পদোন্নতি মেলে, স্বার্থ উদ্ধার হয়। তবে এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশি ক্ষতি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের কাছে শিক্ষকদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বর্তমান পরিস্থিতি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে যেকোনভাবে একটা সাধারণ নির্বাচন করার চেষ্টা হয়েছিল যা অবাধ ও নিরপেক্ষ হতো না বলে তিনি ধারণা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সেনাসমর্থিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ফলে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা হয়েছে। এ সরকার নির্বাচন, সরকারি কর্মকমিশন পুনর্গঠন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ফলে তাদের প্রতি জনসমর্থন হ্রাস পেয়েছে। তিনি আশা করেন ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। তবে এই নির্বাচনের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল অন্তত ৬ মাস অর্থাৎ জুন মাস হতে রাজনীতির ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়া। কীভাবে নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির আলোচনা অর্থপূর্ণ হতে পারতো। তবে সরকার সরাসরি আলোচনা করতে গিয়ে অনেক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফেলেছে, যেখান থেকে বের হয়ে আসা সহজ হচ্ছে না। কিন্তু তেমনভাবে বের হয়ে আসতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার আভাস দিয়েছিলেন তারা ২ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকবেন না। সেটি ঘটবে বলে আশা করি। তারা যদি মেয়াদ বাড়াতে চান, কিংবা অন্য কোনভাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার বা বিকল্প সরকার প্রবর্তনের চেষ্টা হয়, জনসাধারণ তা মেনে নেবে বলে আমি মনে করি না। বর্তমান সেনাসমর্থিত সরকার যেভাবে এসেছে তাকি সমর্থনযোগ্য? এতে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি?- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, এ সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে এলেও দীর্ঘকাল তার অবস্থান সংগত নয়। একে নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যাবে না। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন নিয়েও তো প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্বল্পকালীন হলেও নির্বাহী ক্ষমতা হাতে নেয়া গণতান্ত্রিক কিনা। আমাদের বাস্তব অবস্থায় যেখানে অবিশ্বাস চূড়ান্ত, সেখানে অন্য কোন পথও ছিল না। এ সরকার সম্পর্কে এ কথা অন্যভাবেও বলা যায় যে, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে যে অবস্থা ছিল তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার দরকার ছিল। দুই নেত্রীকে মাইনাস করা সম্পর্কে তিনি বলেন, দুর্নীতির মামলায় সাজা পাওয়া কিংবা অন্য যেসব কারণে একজনের কারো নির্বাচনে প্রার্থিতা সংবিধান সম্মতভাবে বাতিলযোগ্য না হলে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা অসঙ্গত ও অন্যায় হবে। জনগণই কেবল কোন রাজনৈতিক নেতাকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখেন এবং জনগণের তেমন রায়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত। ড. আনিসুজ্জামান রাজনৈতিক দল ও জনগণের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ২০০৭ সালেও তাদের প্রতি আহবান জানিয়েছিলাম তারা যেন তাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করে যান এবং যথাসম্ভব সৎ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আমি মনে করি, তাদের ভোট দানের অধিকার যেন তারা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করেন। এক্ষেত্রে কোনো বাধা বা পূর্ব নির্দিষ্ট কোন পথ তারা যেন স্বীকার না করেন। সুশীল সমাজ নিয়ে তিনি বলেন, এখন তাদের তেমন ভূমিকা দেখি না। অবশ্য যখন আগেও কথাবার্তা বলেছেন, তখনও তারা এক জোট হয়ে বলেছেন মনে হয়নি। তাই তার প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন ভিন্ন হতে বাধ্য। সময় কাটান কীভাবে জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, দৌড়াদৌড়ি করে। সভা সমিতিতে যোগ দিয়ে আলোচনা করে। এর বাইরে সময় পেলে ক্রিকেট খেলা দেখি। বই পড়ি, গান শুনি। বর্তমানে লেখকদের লেখার মান সম্পর্কে তিনি বলেন, খারাপ নয়, তবে যুগান্তকারীও নয়। অবশ্য আমি আশাবাদী। এখনকার সময়ে আগের মতো লেখক হয়নি ঠিক, তারপরও নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ এবং কিছু তরুণের লেখাও তো পাঠকেরা পড়ছেন। তিনি প্রবাসীদের শেকড়ের পরিচয়, নিজস্ব শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার আহবান জানিয়েছেন। ডঃ আনিসুজ্জামান বিশ্বাস করেন, আমরা যেখানেই থাকি এই পরিচয় নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।