জলের গান থেমে থাকে না

শোনা যাচ্ছিল, কনক আদিত্য চলে গেছেন দল ছেড়ে। তাহলে কি দলটির হারমনি থাকবে? রাহুল আনন্দের বাড়িতে যখন আমরা কথা বলছি দলটির সঙ্গে, তখন সিলেট থেকে ফিরে সেই আড্ডায় যোগ দিয়েছেন কনক আদিত্যও। কারও ব্যবহারেই মনে হলো না ভেঙে যাচ্ছে দলটি। সবাই তাঁদের স্বাভাবিক তারুণ্যের চপলতায় মুখর হয়ে থাকলেন। জানালেন, এমন অনেক পরিবেশনা তাঁরা করেছেন, যেখানে রাহুল, কনক বা জার্নাল ছিলেন না। তাতে তো পরিবেশনায় কোনো সমস্যা হয়নি। তাঁদের কথায় মূর্ত হলো, চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়। একসঙ্গেই চলবে সব—হাসি-আনন্দ-ঠাট্টা। তবে সময়ের প্রয়োজনে সরে যাবে কেউ—এটাই নিয়ম।
আমাদের রাতের আড্ডাটি ছিল প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। রাত সাড়ে ১১টায় যখন আড্ডার সমাপ্তি ঘটল, তখন দলটির বন্ধনের শক্তিই যেন টের পেলাম আমরা। জলের গান ভাঙে না—এটাই বোঝা গেল অনায়াসে। কত না কথা হলো, তা থেকে অল্প কিছু নিয়েই আজকের এই লেখা।

নতুন গানের জন্ম
খুব মন খারাপ ছিল রাহুল আনন্দের। ভালো লাগছিল না কিছু। কতটা খারাপ, তা বোঝাতে বললেন, ‘এমনকি স্ত্রী, সন্তান, পরিজন—কাউকেই ভালো লাগছিল না।
তখন তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়ে বসলেন ধানমন্ডি লেকের ধারে। লেকে ভাসছিল একটা হলুদ ফুল। আর রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই তরুণ-তরুণী। তরুণীর পরনে হলুদ জামা। তাঁদের ব্যাপারে রাহুলের মনে কোনো আগ্রহই জন্মায়নি। কিন্তু তাঁরা কথা বলছিলেন উচ্চ স্বরে। না চাইলেও তাঁদের কথাগুলো আসছিল রাহুলের কানে।
মেয়েটা বলছেন, ‘বিয়ে করতে পারবে না, তো প্রেম করেছিলে কেন?’
মিনমিনে স্বরে ছেলেটি বলছিলেন, ‘তুমি তো বোঝোই, আমার আর্থিক অবস্থা…’
‘প্রেম করার সময় মনে ছিল না?’

কথা প্রসঙ্গে রাহুলের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, অন্য কারো সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিয়ের শাড়িও কেনা হয়ে গেছে। ঝগড়াঝাঁটি যখন উত্তুঙ্গে, তখন কী যেন হয়ে যায় ছেলেটার। অসহায় ছেলেটা যেন বীর হয়ে ওঠেন। বলেন, ‘বিয়ে করলেই হবে তো?’ বলে ফোনে বন্ধুদের আসতে বলেন তিনি। তারপর রাহুলের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যান তাঁরা। হ্রদে ভাসা, বাতাসে কাঁপতে থাকা হলুদ ফুলের পাশ দিয়ে চলে যান হলুদ নারী। আর তখনই পলাশগাছের ওপর থেকে ডেকে ওঠে একটা হলুদ কুটুম পাখি ‘কুটুম আয় কুটুম আয়’ বলে।
এই পুরো ঘটনাই জন্ম দিল একটি গানের। কোন গান—সে প্রশ্ন করার আগেই জলের গানের সদস্য ঐশ্বর্যের কণ্ঠে উঠে আসে, ‘হলুদ ফুল, হলুদ ফুল/ বিবাহের বাতাসে তুমি দোলো/ অচেনারে চিনবে বলে পাপড়িগুলো মেলো।’

এ গানটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গাওয়া হয়নি কোথাও। আমরা যারা ‘জলের গান’-এর সঙ্গে বসেছি কথা বলতে, তাদের সৌভাগ্য হলো সে গানটি শুনবার। বাদ্য ছিল না তেমন কিছু, কিন্তু একটু বাঁশি, একটু হারমোনিয়াম, ঘানার বাদ্যযন্ত্র তারাওয়া আর হাতের সঙ্গে হাতের ছোঁয়ায় উঠছিল এক অদ্ভুত সুর।

বিদায় কনক?
ফিসফিস ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। জলের গান থেকে বিদায় নিচ্ছেন কনক। জলের গানের জার্নালের সঙ্গে বহুবার এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। সুশ্রী মুখের হাসিমাখা রহস্য ভেদ করে কিছুই জানতে পারিনি। এরপর একদিন কনকই জানালেন ফেসবুকের মাধ্যমে, জলের গান থেকে সরে গেছেন তিনি। কিন্তু সেখানেই বলেছেন, নতুনদের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবে জলের গান।

বিষয়টা আমাদের ভালো লাগে। চারদিকে ভাঙনের শব্দ শুনি। কনকের সেই স্ট্যাটাসে বোঝা যায়, এটা মোটেই ভাঙন নয়। সে কথাই সোমবার রাতের আড্ডায় বলছিলেন কনক আদিত্য। ‘আমরা কখনোই চাইনি প্রচলিত ধারার ব্যান্ডের মতো হবে জলের গান। নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীই সেখানে গাইবেন। চেয়েছি, এর চেয়ে বড় কিছু হব আমরা। পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারলে জায়গা ধরে রাখার কোনো মানে নেই। রাহুলের অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। ও গান বানিয়ে লিখে ফেলতে পারে, আরেকজনকে তৈরি করে নিতে পারবে। হয়তো ১৫ দিন, ২০ দিন একটু অসুবিধা হবে, তারপর সব চলবে আগের মতো।’ যোগ করেন, ‘যখন শুরু করেছিলাম, তখন ছিল এক রকম। এখন আমাদের রসদ অনেক। সম্পদের পরিমাণ বেশি। অন্য কাউকে হাল ধরতে হলে বেশি সমস্যা হবে না।’

কথাগুলো বলে তিনি তাকালেন রাহুলের দিকে। রাহুল বললেন, ‘সব তো তুমি একাই কইয়া ফালাইলা!’
কনক হেসে বললেন, ‘ওস্তাদ, আমি তো শুধু সূত্র ধরাইয়া দিলাম।’
রাহুল বললেন, ‘প্রাকৃতিক ঝড় কাম্য। কিন্তু অন্য ঝড় কেউ কখনো চায় না। আমি কোনো দিন চাইব না, আমার ডান পাশে কনক আর বাঁ পাশে জার্নাল অনুপস্থিত থাকুক। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছুই হয়। মেনে নেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। এই তো সেদিন একটি টিভি অনুষ্ঠানে আমরা গান করলাম। কনক বলল, ও সাউন্ড ঠিক করবে। আমি ছাড়া সবাই, এমনকি অনুষ্ঠানের সঞ্চালকও কনককে গান গাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছিল, কিন্তু আমি করিনি। করিনি এ জন্য যে ও শিল্পী। ও শব্দ ব্যবস্থাপনা করতে চাইছে, সাউন্ডই করবে। ও সাউন্ডে হাত দিলে কোন জায়গায় বাড়ালে–কমালে তা পরিমিত হবে, তা ও জানে। সেটাই করুক না।’

কনক বললেন, ‘আমি তো চাই, একদিন দর্শক আসনে আমি, রাহুল, জার্নাল বসে জলের গানের পরিবেশনা দেখব। কিংবা টেলিভিশনে জলের গানকে দেখলে টেলিফোনে একে অন্যকে বলব, দ্যাখ, জলের গান। আসলে আমরা যখন শুরু করি, তখন চেয়েছিলাম, জলের গান একটা প্ল্যাটফর্ম হবে। তা হয়েছে।’
রাহুল কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘আসলে আমরা যে যেখানেই থাকি, জলের গান নিজের মতোই চলবে। কে বলে কনক চলে গেছে। এই তো পাশেই বসে আছে।’
কথাটার হয়তো নির্দিষ্ট একটা মানে নেই।