জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

এ কথা প্রথমেই বলে নেয়া জরুরি যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি যার জীবন ও কর্ম শত আঙ্গিকে সমৃদ্ধ প্রসারিত এবং উদ্ভাসিত তাঁকে সম্পাদকীয়র সীমিত পরিসরে উপস্থাপন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেই কথা জেনেই এই সম্পাদকীয়। কেবল তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধ নিবেদনের প্রয়াস মাত্র। বাঙালির সকল অর্জন, সকল সমৃদ্ধি, সকল কর্ম, সকল অগ্রযাত্রা, গর্ব-অহংকারÑ এক কথা স্বদেশের মানচিত্র তিনি। বাঙালির মন ও মননেও তিনি।
তাইতো জাতির জনকের জন্ম এবং প্রয়াণ দিবসে সমগ্র বাঙালি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হয়। সামনে ১৫ আগস্ট। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহাপ্রয়াণ দিবস। জাতীয় শোক দিবস। দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে এক গভীর শোকের দিন। এদিন জাতির জনককে সেনাবাহিনীর একদল আদর্শভ্রষ্ট দুর্বৃত্ত ঘাতক সপরিবারে হত্যা করে। হত্যা করে তার প্রিয়তমা স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, ৩ পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শিশুপুত্র শেখ রাসেল, সদ্য বিবাহিত দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী কামাল যাদের হাতের মেহেদির রঙ তখনো মোছেনি, ছোট ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি সেরনিয়াবাত, শিশুপুত্র সুকান্ত, ভাগিনা শেখ মনি ও তার অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রী আরজু মনিসহ প্রায় ২০ জন নিকটাত্মীয়কে হত্যা করে পৃথিবীর বর্বরতার ইতিহাসে এক নৃশংসতম নজির স্থাপন করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান এবং আজ বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পরিচালিত করছেন।
ঘাতকদের এই বর্বরতার পেছনে লক্ষ্য ছিল বাঙালির লক্ষ কোটি প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থহীন, দিকহীন, লক্ষ্যহীন করে পাকিস্তানি খুন, ধর্ষণ, শোষণ, বঞ্চনার পুরনো পথে পরিচালিত করা। কিন্তু যাদের নেতা এবং আদর্শ বঙ্গবন্ধু স্বয়ং, যাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু, যিনি বাঙালিদের শিখিয়েছেন শত্রæর বিরুদ্ধে কী করে লড়াই করতে হয়, কী করে বিজয় অর্জন করতে হয়, তাদের লক্ষ্যচ্যুত এবং দিকভ্রান্ত করে সাধ্য কার। জাতি হিসেবে বাঙালি লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। খুনিদের উদ্দেশ্য যেমন সাধিত হয়নি, তেমনি ২১ বছরে খুনিরা পার পেয়ে গেছে বলে যে ভাবনায় আবিষ্ট হয়েছিল, সেই মোহ ভঙ্গও তাদের ঘটেছে। ২১ বছর পর তাঁর আত্মজা শেখ হাসিনা যিনি সেই ১৫ আগস্টের কালো রাতে ঘাতকদের বুলেটের বাইরে ছিলেন অলৌকিক কোনো ইশারায়, তার শাসনে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলেছে মূল হোতারা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত বালাদেশ পরিচালনার জন্য মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। ওই সাড়ে ৩ বছরেই তিনি তার স্বপ্নের সোনার বাঙলা গড়ার পথ নির্দেশ করে গেছেন। বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে এক শ্রেণীর মানুষ দেখা যায় যারা যেকোনো অজুহাতে বঙ্গবন্ধুর সমালোচনায় মেতে উঠেন, তারা বঙ্গবন্ধুর কোনো অবদানই দেখতে পায় না, বা দেখতে চায় না। অথচ বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশকে একটা মর্যাদাশীল দেশের গৌরব দান করে গেছেন। তিনি দেশের অভিজাত শ্রেণি, সামরিক অসামরিক আমলা, ভদ্র নাগরিক সমাজকে উদ্দেশ করে দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলার জন্য বারবার তাগিদ দিয়ে গেছেন। তিনি বারবার সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় বিচার রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ঘোষণা করে সমাজে সেই নীতি প্রতিষ্ঠার উপর জোর দিয়ে গেছেন।
তিনি তার সকল কর্মে বাংলাদেশ এবং দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায় বিচার, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনকে অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি এমন এক প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী নির্ভীক রাজনীতিক ছিলেন যিনি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করেছিলেন। প্রকৃত জাতি গঠনে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। বাংলা ভাষা শিল্প সাহিত্যের উন্নয়নে পথ নির্দেশনাও দিয়ে যান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধে যে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিলেন, কয়েক লাখ মা- বোন সম্ভ্রম হারালেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাস্তবায়নে আপসহীন থেকেও সাধারণ নাগরিক জীবনে মৌলিক মানবিক অধিকার কথা বলার স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের, চলাচলের সমাবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করা, শিক্ষা ও গণস্বাস্থ্য পরিচর্যার অধিকার সংরক্ষণের কথাও বলে গেছেন। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তিনি বিশ্বের অন্যতম একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার তাগিদ অনুভব করেন এবং সে লক্ষ্যে ড. কামাল হোসেনকে প্রধান করে ৩৪ সদস্যের একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিশন গঠন করে দেন ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল। এবং সেই কমিটি প্রণীত সংবিধান ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির ৪০৪ জন সদস্যের অনুমোদনে। একই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থেকে সেই সংবিধান কার্যকর হয়। তিনি প্রথম ১৯৭৪-এ ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষা এবং ’৫২-এর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখান। সেই ধারা তার কন্যা শেখ হাসিনা এখনও চলমান রেখেছেন। তিনিই পররাষ্ট্রনীতিতে শত্রæতা ত্যাগ করে মিত্রতার নীতি গ্রহণ করে বলেছিলেন, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন যতটা প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক, ঠিক ততটাই ছিলেন মানবিক। বাংলাদেশটাকেও তিনি একটা মানবিক রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিলেন। তার প্রজ্ঞাবান ও সাহসী নেতৃত্বে মাত্র ২৩ বছরে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের জোঁয়াল ভেঙে সকল শাসন শোষণ, বৈষম্য-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। আর এই ২৩ বছরের লড়াই সংগ্রামে তাকে জেলে কাটাতে হয় প্রায় ১৫ বছর।
বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে কখনও আপস করেননি। পিছু হটেননি। জয় বাংলা সেøাগানে তিনি নিজে যেমন শক্তি খুঁজে পেতেন, শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালি জাতিও এই জয়বাংলা সেøাগানে সকল সংকট মোকাবিলায় সাহস সঞ্চয় করেছে সামনে চলার। কিন্তু এমন একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহান নেতা, বাঙালি জাতির পিতা যিনি বঙ্গবন্ধু তাকে আমরা বাঁচতে দেইনি। কতিপয় মীরজাফর তাকে হত্যা করে বাঙালি জাতির ঘাড়ে বিশ্বাসঘাতকের কলঙ্ক লেপে দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙালি ঘাতকদের যেমন কোনোদিন ক্ষমা করেনি, তেমনি জাতির পিতাকেও বিস্মৃত হয়নি। ঘাতকরা ফাঁসিতে ঝুলেছে, জাতির পিতা আসন পেতেছেন বাঙালি হৃদয়ে। কেউ কেউ হয়তো বঙ্গবন্ধুকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছে, কিন্তু তিনি বাঙালির হৃদয় জুড়ে আছেন জনকের আসনে।
বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর সকল স্তরে, জাতীয় পতাকায় জাতীয় সঙ্গীতে, শস্য ক্ষেতে দোল খাওয়া ফসলে, নদীর কলতানে, পাখির কুজনে তিনি আছেন এবং থাকবেন। বঙ্গবন্ধু আছেন এবং থাকবেন বাঙালির মননে, চেতনায়, ভালোবাসায় অমর অক্ষয় এবং অব্যয় হয়ে। তার কাছে আমাদের অশেষ ঋণ। হে জাতির পিতা, হে বঙ্গবন্ধু, তুমি আমাদের ক্ষমা কর। তোমার প্রতি আমাদের অতল শ্রদ্ধা।