জাতীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ ও বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

রেহানুজ্জামান

নতুন বছর শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া নির্বাচনমুখি হওয়া শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেছেন এ বছরের শেষ দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের মধ্যে নড়েচড়ে বসার ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দু হাজার আঠার সালকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সাল হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এই সালই হচ্ছে চলমান আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের শেষ বছর। যদি দেশের রাজনৈতিক হাল-হকিকত ভাল থাকে সুস্থ থাকে, পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে। তাহলে এ বছরেই নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেয়া সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

ইতোমধ্যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে দুটি ফেয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোন পক্ষই কমিশনের বিপক্ষে অভিযোগের তীর নিক্ষেপের সুযোগ পায়নি। কারণ নির্বাচন পরিচালনায়, তধারকিতে নির্বাচন কমিশন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। কারণ বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিএনপির অনেক অভিযোগ ছিল তিনি নাকি নিরপেক্ষ ব্যক্তি নন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রধান বিরোধী দলকে নিয়ে যে সংশয় ছিল তা এখন কিছুটা আস্থানির্ভর বলে মনে হচ্ছে।

গত ১/২৯/১৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটের হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তিনি নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমালোচনা করেছেন, বক্তৃতার মঞ্চে দেশিয় স্টাইলে যেভাবে বিরোধী দলকে প্রথমে ওঝার মত ঝাড়তে হয় ঠিক সেভাবেই তিনি ঝেড়েছেন, তার সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন এবং আগামী নির্বাচনে নৌকাতে ভোট দেয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন।

যেহেতু সরকার প্রধান জাতীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছেন এবং তিনি নিজে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। এখন আর সংশয়ের অবকাশ নেই, নির্বাচন সময়মত অনুষ্ঠিত হবার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিলেটের হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারতের পর পরই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদও বিরাট এক দলীয় বহর নিয়ে সিলেট অভিমুখে শাহজালালের রওযা জিয়ারতের উদ্দেশ্য রওয়ানা হন। এরশাদ সাহেব মাজার অভ্যন্তরে পৌঁছামাত্রই সাংবাদিকরা নির্বাচনী বিষয় নিয়ে তাকে অনেক প্রশ্ন করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকে তিনি সরাসরি নাকচ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরপেক্ষ নয়, তিনি বলেন কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকারই ভালো ছিলনা।

রাষ্ট্রীয় সংবিধান মত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তার বাইরে নয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন বেগম খালেদা জিয়া বিগত দিনে তাকে এবং তার পরিবারকে অন্যায়ভাবে ছয় বছর জেল খাটিয়েছেন, মানসিক নির্যাতন করেছেন, কষ্ট দিয়েছেন,তার বিরুদ্ধে এগারটি মামলা দায়ের করেছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়া এখন মামলার ভয় করতেছেন কেন? তিনি দুর্নীতি করেছেন তাকেতো জেলে যেতে হবে, যদি রায় তার বিপক্ষে যায়। জেল থেকে আমিও নির্বাচন করেছি, জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত করেছিল। তিনিও সেখান থেকে নির্বাচন করবেন।

৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া অলিখিত প্রথা অনুসরণ করে তার মামলার রায়ের তিনদিন পূর্বে হযরত শাহজালাল ও শাহপরাণের মাজার জিয়ারতে সিলেটে সফর করেন। সেখানে রাজনৈতিক সভা ও দলীয় নেতৃবৃন্দ সাথে বৈঠক ব্যতীত নির্বাচনী প্রচার শুরু করে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারাভিযান হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শুরু করা অলিখিত এক প্রথা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। রাজনীতিবিদদের রাজনীতির খেলায় এখন মাজার জিয়ারত ও অন্তর্ভুক্ত ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে, সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন, মন মাসিকতাকে জয় করার কৌশলকে নির্বাচনী কাজে লাগানো হচ্ছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকাতে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। শহর,বন্দর, হাটবাজার, গ্রাম গঞ্জে নির্বাচনী খোশগল্পে মানুষ মেতে উঠেছে চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে একই আলোচনা কে কোন আসনে নির্বাচনী যুদ্ধে লড়াই করবেন। মানুষ এখন আর সস্তা বুলিতে বিশ্বাস করেনা, মানুষ কাজে বিশ্বাসী। কার কোমরে কতটুকুন জোর আছে নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নকাজ দেখে মানুষ বিচার বিবেচনা করবে। মানুষ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসেছেন, না জোয়ারের তোড়ে ডুবে মরেছেন, এটাই এখন বিবেচিত বিষয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এলাকার উন্নয়নের জন্য অনেক বিষয় উল্লেখ থাকে। প্রার্থী ওয়াদাবদ্ধ হন। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে উল্লেখিত প্রতিশ্রুতিগুলো বেমালুম ভুলে যাওয়া বাংলাদেশে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের টিকিটির নাগাল পাওয়া যায়না। তখন তাদের সাথের সাক্ষাতের জন্য রীতিমত এপয়েন্টমেণ্ট করতে হয়। তখন তাদের সম্মান তাদের সামাজিক মার্যদা একলাফে গগনচুম্বী হয়ে যায়, তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। আর সাধারণ ভোটার আর নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে সামাজিক মানমর্যাদার ব্যবধান আকাশপাতাল হয়ে যায়। এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তী বাস্তব চিত্র। আদৌ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না এই নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় কানাঘুষা চলতেছে। এখনো দেশের মানুষ দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে,তার রেশ এখনো কাটেনি। দেশের প্রধান বৃহত্তম দলের নেত্রী

বেগম খালেদাজিয়ার মামলার রায় নিয়ে মানুষ আতংকিত ছিল। যদি রায় নেত্রীর বিপক্ষে যায় তাহলে রায়কে কেন্দ্র করে নিশ্চয় লংকা কান্ড ঘটে যাবে, দেশ অচল হয়ে যাবে, রাজনৈতিক সংকট দেখা দিবে। মানুষ নিত্যদিনের অবস্থার সঙ্কটের মুখোমুখি হবে। কারণ বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারকে বারবার হুমকি ধমকি দেওয়া হচ্ছে।

বেগম খালেদা জিয়া সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন, হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সরকার নানান ফন্দিফিকির করছে। বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করে সরকার একতরফাভাবে দু হাজার চৌদ্দ সালের পাঁচই ফেব্রুয়ারির কায়দায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাঁয়তারা করছে। বেগম খালেদা জিয়াকে মামলায় ফাঁসানো হলে দেশ অচল করে দেওয়া হবে। হ্যাঁ মানুষও তা বিশ্বাস করে। কারণ বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা অনেক তুঙ্গে, একটি বৃহত্তর দলের প্রধান তিনি, যাকে ছাড়া বিএনপি নামক দলের কথা চিন্তাই করা যায়না। তার জনপ্রিয়তা শহর ছেড়ে একেবারে গ্রাম গঞ্জে আনাচেকানাচে তৃনমূল পর্যায়ে বিদ্যমান। তার একটু কিছু হলে তার দলের ভাবধারার মানুষের হৃদয়ে অবশ্যই আঘাত লাগবে, তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর হবে।

রায়ের পূর্বে বেগম জিয়া জরুরি ভিত্তিতে নির্বাহী কিমিটির সভা ডেকে রায়কে সামনে রেখে তিনি দলের দিকনির্দেশনা দেন এবং তাদের গঠনতন্ত্রে ৭ নম্ভর ধারার ঘ’ অনুচ্ছেদ বাতিল করেন। কারণ সেই ধারায় ঘ’ অনুচ্ছেদে বলা ছিল কোন দুর্নীতিপরায়ণ, সাজাপ্রাপ্ত, কুখ্যাত ব্যক্তি সব পর্যায়ের কমিটির সদস্য হতে পারবেন না, এমন কি সংসদ সদস্য পদে অযোগ্য হবেন। বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরেতে ঐ ধারায় সিনিয়র সহসভাপতি তারেক রহমান অযোগ্য বিবেচিত হবেন বিধায় দলের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। তিনি নির্বাহী সভায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেন।

নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে দেশের পরিস্থিতি যাতে অস্থিতিশীল না হয়, কোন অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে তজ্জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দেশের মানুষ রায় শুনার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। নেত্রীর আদৌ সাজা হবে, না খালাস পাবেন সেই চিন্তায় বিএনপির রাজনৈতিক কর্মীরা দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত ছিলেন। রায়ের দিন দেশের অবস্থা থমথমে ছিল। বিএনপির চেয়ারপার্সন ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদক ককর্তৃক জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্টের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার রায় নির্ধারিত ৮ ফেব্রুয়ারি মহামান্য আধালতের বিচারপতি ডঃ আখতারুজ্জামান বেগম খালেদা জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেন।

বয়সের দিক বিবেচনা করে অসুস্থতাজনিত কারণ ও বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে দশ বছরের স্থলে পাঁচ বছরের সাজার রায় ঘোষণা করেন। সেদিন বিএনপির কিছু নেতাকর্মীরা আবেগপ্রবণ হয়ে অশ্রুজলে সিক্ত হতে দেখা গেছে। বেগম খালেদ জিয়া কারাজীবনের কিছুদিন পূর্বে একমাস পূর্ণ হল এখনো জামিন হয় নি।

রায় শুনানির দিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তেমন কিছু ঘটেনি। যাহোক, নির্বাচনের পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক চলছে। সংশয় এখনো রয়ে গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার সরকারের দিকে অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করছে। তাদের অভিযোগ বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সরকার প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে মামলা দিয়ে নাজেহাল করছে। মামলার বিষয়ে খালেদা জিয়ার হাত নেই তিনি নির্দোষ! আসলে কি তাই ? বেগম খালেদাজিয়ার বিরুদ্ধে কি সরকার মামলা করেছে? না দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করেছে? মামলার নথিতে সরকার বাদি না দুদক বাদি?

মামলার বিবরণে জানা যায়, তথাকথিত ওয়ান ইলেভেনের মইন উদ্দিন ও ফখর উদ্দিন সরকারের আমলে দুদক কর্তৃক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ কেলেঙ্কারিতে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। সেই দুর্নীতির মামলার রায় দীর্ঘ আট বছর শুনানির পর মহামান্য আদালত রায় ঘোষণা করে। মহামান্য আদালতের এই মামলার রায়কে বিএনপি অবহেলা করে রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নির্বাচনী আইনের উপর নির্ভও করছে।

যেহেতু এটা কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়, তাহলে সরকারে করণীয় কিছু আছে কি ? বেগম খালেদা ব্যতীত বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলে সরকার সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের দিকেই হাঁটবেই, তাহলে আবার পরবর্তী নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে বিএনপির দলীয় ঐক্য অটুট থাকবে না তাদের মধ্যে অনৈক্য দেখা দিতে পারে।বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যত সংকটাপন্ন হতে পারে।

দেশের মানুষ আশা করে সকল আইনি জটিলতা অতিক্রম করে ছোটবড় সকল দলের অংশগ্রণের মধ্যদিয়ে একটি সুন্দর অবাধ নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।
ব্রঙ্কস, নিউইয়র্ক।