জাপান চীন দক্ষিণ কোরিয়াসহ ১৫ দেশে রফতানি হয় কুঁচিয়া

মৌলভীবাজার : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর গ্রামের বাসিন্দা সিলভিয়া এরিক ও তার স্বামী বাপ্পি এরিক। তাদের বাড়ির সামনে ছোট্ট একখ- জমি। গত মে মাস থেকে তারা সেই জমিতে চৌবাচ্চা করে শুরু করেন কুঁচিয়া চাষ। এর ওপর দুই দিনের প্রশিক্ষণ নেন গত বছর নভেম্বরে। তারপর ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কুঁচিয়া চাষকে আরো সম্প্রসারণ করেন তারা। ১০ হাজার টাকার কুঁচিয়ার পোনা কেনেন। চাষের আনুষঙ্গিক খরচও আছে। ছয় মাস ঘুরতে না ঘুরতে সেই কুঁচিয়া তাদের অভাবেব জীবনে সচ্ছলতা এনেছে। এখন পর্যন্ত তারা ৪৫০ টাকা করে ২৫ কেজি কুঁচিয়া ১১ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। পরে ৫৪টি মুরগির বাচ্চা কেনেন। তিন মাস পরে ২১টি মুরগি ৩০০ টাকা করে বিক্রি করেন। এমন পরিবর্তন এসেছে কমলগঞ্জের ৮টি ইউনিয়নের অনেক পরিবারে। সম্প্রতি সরেজমিন এলাকা ঘুরে কেঁচো আর কুঁচিয়া চাষের এ সম্ভাবনার চিত্র দেখা যায়।
পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে সিড বাংলাদেশ মৌলভীবাজারে করছে ‘প্রাকৃতিক উপায়ে কুঁচিয়ার বংশবিস্তারের সুযোগ ও পরিবারভিত্তিক কুঁচিয়া খামার স্থাপনের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান’ শীর্ষক প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রকল্পের আওতায় পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) কুঁচিয়া চাষ সহজীকরণ ও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিড বাংলাদেশের মাধ্যমে। এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের শেষের দিকে উপজেলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দেয়া হচ্ছে কুঁচিয়া চাষের প্রশিক্ষণ, ঋণ ও অনুদান।
রাজেন্দ্র কুমার সিনহা আর কৃষ্ণা সিনহার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছে কুঁচিয়া চাষ। কুঁচিয়া চাষের আগে তার ১৩ শতক জমিই ছিল তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। এই জমির ফসলে চার সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে টনেটুনেও সংসার চলতো না। পরে রাজেন্দ্র কেঁচো ও কুঁচিয়া চাষ প্রশিক্ষণের কথা জানতে পেরে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চাষ শুরু করেন। রাজেন্দ্র কুমুর ঘরের দুয়ারে রাখা মোটরসাইকেল দেখিয়ে বলেন, কিছু দিন আগে হিড বাংলাদেশেকে ৫০ হাজার কেঁচো দিয়ে এটি পেয়েছি। প্রতিটি কেঁচো রাজেন্দ্র এখন এক টাকা করে বিক্রি করেন। গত দুই বছরে তিনি তিন লক্ষ টাকার কেঁচো বিক্রি করেছেন। কুঁচিয়া বিক্রি করেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার। বড় কুঁচিয়া (৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম) স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেন। হিড বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, কুঁচিয়ার ইল প্রজাতির কষ্টসহিষ্ণু মাছ, যা অধিক মজুদ ঘনত্বে চাষ করা যায়। একটি চৌবাচ্চায় একসঙ্গে ২০-৩০ কেজি কুঁচিয়ার পোনা চাষ করা হয়। কুঁচিয়ার খাবার হলো ব্যাঙ্গাচি পাতি চিংড়ি, জলাশয়ে পাওয়া স্থানীয় তেলিয়া, বিরকুনিসহ বিভিন্ন ছোট জাতের মাছের পোনা। এ ছাড়া আর কোনো খরচ নেই। কুঁচিয়া বড় হয় খুব দ্রুত। একেকটি কুঁচিয়ার ওজন সর্বোচ্চ ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
রাজেন্দ্রের বড় মেয়ে এবার জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি হয়েছেন। মেয়ে ছুটিতে বাড়িতে এলে বাবা-মা মেয়ে সবাই মিলে এই চাষের পেছনে পরিশ্রম করেন। মেয়ের পড়ার খরচও আসে কুঁচিয়া আর কেঁচো বিক্রি করে। দুই বছর আগে একটি রিং দিয়ে তিনি কেঁচো চাষ শুরু করেন। এখন তার চারটি রিং ও একটি প্লান্টে কেঁচো চাষ হচ্ছে। রাজেন্দ্রর সাফল্যে এলাকার অনেকে কুঁচিয়া চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। অনেকে তাদের বাড়ির সামনে নীল পলিথিনে ঘেরা বিশেষ চৌবাচ্চা তৈরি করে চাষ করছেন কুঁচিয়া।
পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ বলেন, স্থানীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি। কুঁচিয়া আমাদের জন্য বিশাল রফতানি বাজার ও সম্ভাবনা বয়ে আনতে পারে। সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) ড. মো. জসীম উদ্দিন বলেন, এখন প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত কুঁচিয়াই মূলত বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে।
পিকেএসএফ প্রাকৃতিক উপায়ে কুঁচিয়া চাষের পাশপাশি হ্যাচারিতে কুঁচিয়ার পোনা উৎপাদন ও বছরজুড়ে কুঁচিয়ার চাষ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করছে। ১২টি জেলার ১৯টি উপজেলায় কুঁচিয়া চাষ প্রকল্প সহযোগিতা করছি। হিড বালাদেশের নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, গত বছর ৫২ জনকে অনুদান ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, পাবনাসহ প্রায় ১০-১২টি জেলা থেকে প্রচুর পরিমাণে কুঁচিয়া বিদেশে রফতানি করা হয়। বাংলাদেশ থেকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, তাইওয়ানসহ ১৫টি দেশে কুঁচিয়া রফতানি হয়। বাংলাদেশ রফতানি ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে কুঁচিয়া রফতানি আয়ের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ। আর রফতানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭ গুণ।