জামায়াতকে বাদ দেয়ার পক্ষে তারেক!

নিজস্ব প্রতিনিধি : বিএনপির প্রধান মিত্র ও সহযোগী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে দলে ও জোটে টানাপোড়েন চলছে। বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নামার পরিকল্পনা করছে। এই আন্দোলনে জামায়াতকে শরিক না করার দাবি এসেছে বিএনপির অনেক নেতার পক্ষ থেকে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও বিএনপির সাথে তাদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পক্ষে নয়। জামায়াতকে বাদ দিয়ে কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
বিএনপির একাধিক নেতৃস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় করোনাভাইরাস মহামারি রোধে সরকারের ব্যর্থতা, বিপুলসংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও প্রাণহানির ঘটনা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী, ওষুধসহ বিভিন্ন জরুরি দ্রবাদি ক্রয়ে ও সেবাদানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা এবং মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের প্রতিবাদে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচি দেওয়া ও সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাতে সম্পৃক্ত হওয়া এবং সমমনা অন্যান্য সব দল, সংগঠনকে সাথে নেওয়ার বিষয়ে মতৈক্য হয়। কর্মসূচি দেওয়ার সময় স্থির করা হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করেই ঈদের পর প্রথম পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেওয়া হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অপসারণ বা তার পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেও অপসারণ করতে হবে।
করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের সংক্রমিত ও প্রাণহানির ঘটনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনাহীনতা সুস্পষ্টভাবেই ধরা পড়েছে। পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও তারা আগে থাকতেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা, এমনকি প্রাথমিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তাদের লাগামহীন দুর্নীতিও উদ্্ঘাটিত হয়েছে। বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার দায় কে নেবে?
সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট কর্মসূচি দেওয়ার সাহস করেনি, তীব্র প্রতিবাদ করে বক্তব্য, বিবৃতিও দেয়নি। এখনো তারা নমনীয় ভাষায় বক্তব্য রাখছে। কারণ দায়বদ্ধতা! খালেদা জিয়ার প্যারোল মুক্তি দীর্ঘায়িত করা এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয় রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকল নেতার বিরুদ্ধে মামলা থাকায় এবং অনেকে জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার ভয়ে ঘরোয়া বক্তৃতা, বিবৃতিতেও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছেন না। সরকারের সমালোচনাও করছেন হিসাব-নিকাশ করে।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, আগামী দিনে দলটি কর্মসূচি দিলেও তা হবে সহনীয় পর্যায়ের। বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলের মেয়াদ বৃদ্ধি ও বিদেশে যাওয়ার অনুমতি লাভের সাথে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কযুক্ত হবে বলেই জানা যায়। অর্থাৎ এমন কোনো কর্মকাণ্ড চালানো হবে না, বক্তব্যও রাখা হবে না, যাতে উল্লিখিত ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় বা কোনো রকম বাধা সৃষ্টি হয়।
এদিকে জামায়াতকে নিয়ে রাজপথে কোনো কর্মসূচি দেওয়ার বিপক্ষে মত প্রকাশ করেন স্থায়ী কমিটির অর্ধেকের বেশি সদস্য। গত ১৮ জুলাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য এ প্রতিনিধিকে বলেন, জামায়াতকে নিয়ে একটা ভয় কাজ করছে বিএনপির নেতাদের মধ্যে। বিষয়টি শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকেও দুর্ভাবনায় রেখেছে। অতীতে জামায়াত যে জ্বালাও-পোড়াও, অগ্নিসন্ত্রাস, নিরীহ মানুষকে হত্যা, বিষয়-সম্পদ ধ্বংসের রাজনীতি করেছে, তারা দায় নিতে হয়েছে বিএনপিকে। বিএনপির নেতাকর্মীরা এ-সংক্রান্ত মামলার আসামি। জামায়াতকে নিয়ে পুনরায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি মাঠে নামলে অতীতের অগ্নিসন্ত্রাস, বোমাবাজি, মানুষ হত্যার রাজনীতি যে তারা করবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। বিএনপির কোনো কোনো নেতা মনে করেন, দুই ধারায় বিভক্ত বর্তমান জামায়াত নেতৃত্বের একটি অংশ এখনো ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে বিশ্বাসী। তারা আবার নবরূপে পুরোনো খেলায় সক্রিয় হতে পারে। এসব নেতা মনে করেন, জামায়াতের একটি অংশের নেতাকর্মীদের দিয়ে সরকারি মহল হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে উৎসাহিত করতে পারে। উদ্দেশ্য বিএনপির ওপর এসবের দায় চাপিয়ে দলটিকে অধিকতর বিপজ্জনক অবস্থায় নিপতিত করা। দণ্ডিত আসামি হিসেবে তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান, বেগম খালেদা জিয়ার বন্দিত্বের জীবন, নেতাকর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের মামলায় কাতর অবস্থা বিএনপিকে প্রচণ্ড দুর্বল করে রেখেছে। সরকারবিরোধী জোটগত আন্দোলনের নামে অতীতের মতো কেউ ধ্বংসাত্মক, হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালালে তা রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা জামায়াতের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন এবং তাদেরকে জোটগত আন্দোলন থেকে কীভাবে দূরে রাখা যায়, তা ভাবতে পরামর্শ দেন। কোনো কোনো নেতা জামায়াতকে ২০ দলীয় জোট থেকে সরাসরি দূরে রাখা, তাদেরকে জোটমুক্ত করার পক্ষে মত রাখেন। সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা রয়েছে এবং সরকারের সাথে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই তারা কাজ করছে বলেই বিএনপির নেতারা মনে করেন।
ভার্চুয়াল বৈঠকে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান জামায়াতবিরোধী অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক শক্তির মনোভাব বিবেচনায় নিতে বলেন। তবে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত ও মনোভাবের বাইরে কিছু করা যাবে না বলেও জানান তারেক রহমান। জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতকে ২০ দলীয় জোট থেকে বের করে দেওয়া বা তাদের সাথে জোট ও বিএনপির সম্পর্কচ্ছেদ করার বিপক্ষে। বিএনপির একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতার মতে, সরকারের সাথে জামায়াত সম্পর্ক রেখে চললেও এটা তাদের নিতান্তই কৌশল বলে খালেদা জিয়া মনে করেন। তবে দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যের জামায়াতবিরোধী মনোভাবকেও তিনি হালকা করে দেখছেন না। কৌশল হিসেবেই জামায়াতকে যতটা সম্ভব দূরে রেখে চলার পক্ষে তিনি। তবে জোট থেকে তাদের বের করে দেওয়া বা বের হয়ে যেতে বাধ্য করার মতো অবস্থা যাতে সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতেও বলেছেন বলে খালেদা জিয়ার সাথে যোগাযোগ রয়েছে এমন একজন নেতা ও পেশাজীবী জানিয়েছেন।