জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ভবন চান সবাই, তবে…

ঠিকানা রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রে বৃহত্তর সিলেটবাসীর প্রাণের সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব একটা ভবন হোক, এটা সবার চাওয়া। কিন্তু সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অবৈধ উপায়ে ভবন কেনার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না সংগঠনের বড় একটি অংশ। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বাহাস চলছে। কিন্তু সমাধানের পথ মিলছে না। ফলে ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাশীল এই সংগঠনের সুনাম ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
নিউইয়র্কের এস্টোরিয়ার ব্যস্ততম লোকেশনে ‘জালালাবাদ ভবন’ কেনেন ময়নুল হক চৌধুরী হেলাল, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান শেফাজ এবং কোষাধ্যক্ষ মইনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সদ্য বিদায়ী কমিটি। মইনুল ইসলাম বর্তমানে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। নির্বাচনে তিনি ১০০ দিনের মধ্যে ভবন কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের একদিন আগেই ভবন কেনার কথা ঘোষণা করে বিদায়ী কমিটি। এ নিয়ে নবনির্বাচিত কার্যকরী কমিটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহ্যবাহী একটি সংগঠনে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধ পন্থায় ভবন কেনার অভিযোগ আনেন নবনির্বাচিত সভাপতি বদরুল খানসহ কার্যকরী কমিটির বড় একটি অংশ। বিশেষ করে উপদেষ্টা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত নামে সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলামের বাড়ি কেনার বিষয়টি কেউই মেনে নিতে পারছেন না।
গত কয়েক মাস ধরে চলা বিতর্কের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলামের আরো কিছু কর্মকাণ্ড উপদেষ্টা পরিষদ ও কার্যকরী কমিটির নজরে এসেছে। বিশেষ করে সংগঠনের ব্যাংক হিসাব লেনদেনে বড় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। কিন্তু সব কিছুকে অবজ্ঞা করে সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলাম তড়িঘড়ি করে গত ৮ জানুয়ারি রোববার ‘জালালাবাদ ভবন’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। কার্যকরী কমিটির একাংশ ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন সভাপতি বদরুল খানসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। এরপর থেকে ‘জালালাবাদ ভবন’ নিয়ে কার্যত সিলেটবাসীর মধ্যে চরম অনৈক্য ও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। প্রবাসে সিলেটবাসী মানেই দলমত নির্বিশেষে ঐক্য। কিন্তু জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঐক্যকে বিনষ্ট করছে।
বর্তমানে মইনুল ইসলামের ‘প্রচেষ্টা’র পক্ষে অনেকে মতামত তুলে ধরে বলছেন, যেভাবেই হোক না কেন ভবন কেনার মধ্য দিয়ে জালালাবাদবাসীর দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এটা সবাইকে মেনে নেওয়া উচিত। জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান এক বিবৃতিতে নিউইয়র্কে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের জন্য কেনা বাড়িকে অবিলম্বে স্বীকৃতি ও স্বাগত জানানোর জন্য সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আসুন, নিজস্ব ভবনে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করি।’
মাহবুবুর রহমান বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করেন, ‘আমি ত্রিশ বছর আগে জালালাবাদের সভাপতি ছিলাম। আমার পরে এক ডজনেরও বেশী কমিটি দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা নির্বাচনী অঙ্গীকারে, সভা-সমাবেশে নানাভাবে আশ্বাস দিয়েছি, কেউ কেউ প্রচেষ্টাও নিয়েছি নিজস্ব ভবনের। কিন্তু পারিনি।’
সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলামের প্রসঙ্গ টেনে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মইনুল ইসলাম ভবনের মালিকানা ও রেসপন্সিবিলিটি জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। তা গ্রহণে অ্যাসোসিয়েশন এখনই পদক্ষেপ নেবেন এবং ভবনে জালালাবাদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন।’
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সমঝোতার জন্য চাপ দিন। এতে কমিউনিটির মঙ্গল। বর্তমান সভাপতি বদরুল খান একজন ত্যাগী সাহসী নেতা। আশা করবো, সমঝোতার পথে তিনি সবার আগে থাকবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন।’ তিনি বলেন, ‘জালালাবাদের ঐক্য সম্প্রীতিকে বাইরের মানুষ সম্মান করে, শ্রদ্ধা জানায়, কোন কোন ক্ষেত্রে সমীহও করে। এই সম্মান নষ্ট হতে দেয়া যায় না।’
সিলেটের কৃতি সন্তান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ভবন কেনা প্রসঙ্গে সৃষ্ট সঙ্কট প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘কথায় কথা বাড়বেই। তখন যোজন দূর হবে দূরত্ব। যারা সংগঠন করেন তারা নিজেদের সময় দিয়ে আমাদের জন্য কাজ করেন। যে কোনো সময় ভুল হতেই পারে বা অন্যের মনের মত কোনো কাজ না-ই হতে পারে। কিন্তু না জেনে বা আন্দাজ করে কোন কথা বললে আল্লাহও নারাজ হবেন। তাদের ভেতর কোনো দুঃখ থাকলে তাকে সম্মান করে কথা বলা দরকার। নেতৃত্বকে যোগ্য সম্মান না দিলে আমাদের বিভাজনের জন্য বিপদে পড়বো। অহেতুক মন্তব্য না করে সমাধানের জন্য প্রাইভেট আলোচনা করা দরকার। সবাই নেতৃত্বের বোঝা নেন না। যারা নেন, তারা যেন কমপক্ষে সম্মানটুকু পান।’
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সমাধান কিন্তু নিজেরাই করতে পারবেন। কারণ তারা সবাই আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আমাদের সম্মানিত। অন্যরা এর মধ্যে ঢুকলে তাদেরকে ছোট করা হবে। শুধু উৎসাহ দিতে হবে যেন নিজেরা একসাথে বসে একটি সমঝোতা করা। সন্ধীতে হার-জিতের কিছু নাই। কিছুদিন পর সবাই ভুলে যাবেন, কিন্তু তিক্ততা বাড়বে। আর এত দিন যারা প্রাণ দিয়ে কাজ করলেন তারা মর্মাহত হবেন, যেটা হবে আমাদের সম্মিলিত পরাজয় আর অন্যায়।
তিনি বলেন, ‘সংগঠন অথবা একটি ভবন থেকে নিজেদের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক আমার কাছে বেশী দামী। আমরা সুন্দর একটি বড় পরিবারের মত। সেটিতে চিড় ধরলে আর কোন উৎসাহ থাকে না।’
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সৃষ্ট সঙ্কট প্রসঙ্গে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে বর্তমান সভাপতি বদরুল খান বলেন, আমরা কেউই বাড়ির বিরোধিতা করছি না। তবে অসাংগঠনিকভাবে বাড়ি কেনা হয়েছে। এখানে অনিয়ম হয়েছে। বাড়ি কেনার খবরটিও জেনেছি নতুন কমিটির অভিষেকের পরে। তিনি বলেন, কাউকে হেয় করার জন্য নয়, জালালাবাদ একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন, আমরা চাই সবার মতামতের ভিত্তিতে সবকিছু হোক। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদ, কার্যকরী কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত নামে কেন বাড়ি কিনতে হবে?
এই সঙ্কটের সমাধান কী জানতে চাইলে বদরুল খান বলেন, গত ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার অনুষ্ঠিত কার্যকরী পরিষদের সভা থেকে সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলামকে শোকজ করা হয়েছে। তাকে ১৪ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বদরুল খান আরো জানান, ১৬ জানুয়ারি সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে আমরা একটি সভা ডেকেছিলাম। কিন্তু অনিবার্য কারণে সভাটি হয়নি। আগামী ২২ জানুয়ারি রোববার পুনরায় সভা আহ্বান করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সমাধানের পথ খুঁজছি। যেটা গঠনতান্ত্রিক ও আইনসিদ্ধ, আমরা সেই পথেই এগোচ্ছি। সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে হতে হবে, জানান বদরুল খান।