জীবন কেবল বস্তুমুখী ভাবনা নয়

মাহমুদা রেজা চৌধুরী

বস্তু কি, সবাই জানি। দেখা যায়, ধরা যায়, পাওয়া যায়। এটা নিয়ে বলার কিছু নেই। তবু এটা নিয়ে আমাদের সারা জীবনের নানা ভাবনা আমাদের ভাবায়, চালায়, আনন্দিত-উত্তেজিত বা কখন, কখন কষ্টও দেয়। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য এই বস্তুর বাইরেও অনেক কিছু আছে, যা দেখা যায় না। যার মুখি আমরা হই না, হতে চাই না। কেউ বলি, ভাই এইসব ভয় দেখানো, যা জানি না, দেখি না, তার প্রতি একটা ভয়ভীতি তৈরি করা।
ভয়টা মূলত এক ধরনের অজ্ঞানতা। আমরা যা ভাবি বা বিশ্বাস করি, সামান্য জ্ঞানের অহংকারে, সেটাও কি পুরোটা জানি? জানি না। যা জানি কিছুটা জানি। আর যা জানি না বা সামান্য জানি, এই দুইয়ের মধ্যেও আছে অজ্ঞানতা। অজ্ঞানতা কেবল না জানার সীমাবদ্ধতা নয়, জ্ঞানেরও সীমাবদ্ধতা।
সমাজে কম/বেশি সর্বত্রই আমরা প্রতিদিন লড়াই করছি বৈষয়িক কিছু পাওয়া, না পাওয়ার বস্তুমুখী চিন্তা, সংস্কৃতি এবং এর প্রভাব বলয়ে। কর্মদিবসটা শুরুই হয় নিজের সাথে নিজের এক রকম প্রতারণার মধ্য দিয়ে। সারাদিন এটাই চলতে থাকে প্রয়োজন এবং অপ্রয়োজনে। দিনে যত কিছুর সাথে যুক্ত হই, সব কিছুর সাথে। মোটাদাগে বলা যায়, নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যা বিশ্বাস করি, তা বলি না, করি না। আবার কোন কোন সময় যা করি, তা বলি না। এটাও এক ধরনের প্রতারণা, নিজের সাথে নিজের। ঘর থেকে শুরু করে বাইরেও ক্রমান্বয়ে আমরা আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তিসত্ত্বা দুটোকেই অসম্মান করি। দুটোর সাথেই প্রতারণা করি।।
ব্যক্তি হিসাবে যতক্ষণ আমার শিক্ষা, প্রজ্ঞা, মানবিকতা, সততাÑ ব্যাপারগুলোতে যা চোখে না দেখি এবং হাতে না ধরতে পারি, এর অন্যথায় বিশ্বাস না করব অন্য কিছু। ততক্ষণ কেবল বাহ্যিক সব কিছুকে পাওয়া বা দখলে রাখতে মন টানবেই। এর মধ্যে যদি দেই ১০ আনা, ফেরত নিই ১৬ আনা। বস্তুকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সীমিত ভাবনাÑ ‘নাথিং ইজ ফ্রি।’ এই ‘নাথিং ইজ ফ্রি’ সংস্কৃতি অসমতার এবং বিভক্তির। এখান থেকে কোন বড় মান এবং মাপের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না।
আমাদের স্বাধীনতা লাভের পর সমাজ এবং রাষ্ট্র শাসনে আমাদের মানসিক সংকীর্ণতা এবং প্রতিবন্ধকতার পরিবর্তন ঘটেনি। বস্তুগত সংস্কৃতির প্রতি বেশি ঝুঁকে যাবার কারণেও।
প্রতিবারই আমরা দল এবং শ্রেণিভুক্ত হয়ে দিয়েছি যতটুকু লুট এবং কেড়ে নিয়েছি এর বহুগুণ। কেড়ে নিয়েছি কী। নিজ নিজ শ্রেণিস্বার্থ। আর্থিক-সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে (অধিকাংশ সময়ই) সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল, দরিদ্র এবং পেছনে পড়ে থাকা মানুষের সম্পদ হরণ করেছি। চুরি এবং ডাকাতি করেছি।
এভাবে সমাজের অভ্যন্তরে এবং এর নানা শ্রেণি-বিভাগে বৈষম্য বেড়েছে এবং উন্নয়ন এবং ব্যক্তিগত আর্থিক সম্পত্তিও বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যা চেয়েছিলাম, সেটা অর্জন করতে পারিনি সমাজের ভাবাদর্শের পরিবর্তনের কারণে। এই ভাবাদর্শ নিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁর ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বইয়ে ভাবাদর্শের জাল নিবন্ধে লেখেন- ‘একটি বিশেষ নির্দিষ্ট সময়ে একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠী কর্তৃক অপর একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য বলই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রথমোক্ত শ্রেণি বা গোষ্ঠী কর্তৃক দ্বিতীয়ক্ত শ্রেণি বা গোষ্ঠীর সম্মতি লাভ করা। বল ও সম্মতির সম্মিলনেই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঘটনা সংঘটিত হয়।’
স্বাধীনতা-উত্তর থেকে এখন অবধি সমাজে এক শ্রেণি-গোষ্ঠী অপর শ্রেণি-গোষ্ঠীর উপর নিজেদের অতিরিক্ত আধিপত্য এবং সমর্থন লাভ করতে গিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রে বলতে গেলে ছোট-বড় সব ব্যাপারেই নিজেদের ভাবাদর্শকে রাতারাতি বদলে নিয়েছি। এতে সমাজ এবং রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা এবং চর্চাও এখন বদলে গেছে। এক সময় বলতাম এবং রাজপথে লড়াইও করেছি গণতন্ত্র চাই বলে। এই ভাবনা বদলে ফেলে বলছি- আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র। উন্নয়ন বলতে কেবল আর্থিক উন্নয়নকেই গুরুত্ব দিচ্ছি। এই আর্থিক উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে দুর্নীতি এবং সুশাসনকেও শশ্মানে বা কবরস্থানে নিয়েছি।
বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্থ ভাবাদর্শনের কারণে নিজের সাথে নিজে প্রতারণা করি। ব্যালট বাক্সের অসমতাকে একমাত্র সত্য এবং সঠিক বলে প্রচার করি। এটা সম্ভব হচ্ছে নিজেরা নিজেদের সাথে, পাশাপাশি অন্যের সাথে প্রতারণাতে দিনে দিনে সুদক্ষ হচ্ছি বলে।
সাধারণ মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছি। নিজেও স্বপ্ন দেখেছি। এখনও দেখি। বাস্তবতার সাথে সেই স্বপ্ন নানাদিক এবং নানা কারণেই মেলেনি। মিলছে না। সাধারণ মানুষ আশাহত হতে হতে এখন আর আশাই করে না। আমাদের সামগ্রিক জীবনবোধ এবং এর সত্ত্বায় যে ইহবাদ জোর প্রতিষ্ঠিত এখন। এর সাথে আছে বর্তমান জাগতিকতার নানান উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং বাহ্যিক সম্পদের প্রাচুর্যতা। এবং ঐ প্রাচুর্যতা অর্জনে নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক আগ্রহের টানাপোড়েন। যে কারণে ইচ্ছা করলেই এই বিচিত্র মায়ার জাল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারি না। যে পরিবর্তন ঘটলে কি হতে পারে, সেই বিষয়ে দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা এবং সততা অনেকটাই অজানা। তাই তেমন কোন পরিবর্তনকে চাচ্ছিও না। নিজেদের কমফোর্ট জোনকে অনশ্চিয়তায় দেখতে চাইনা।
এটা এক প্রকার বাস্তবতা। এই বাস্তবতাতে সমাজে দুর্বিনীতদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যারা রাষ্ট্র এবং সমাজ ও রাজনীতির সংস্কারে ‘মেটার’ করে। অর্থনীতিতেতো বটেই।
আশঙ্কা এবং শঙ্কা সেখানেই- আমাদের আগামী প্রজন্মও কি এই দুর্বিনীত আদর্শে যুক্ত হয়ে যাবে কিনা। জাতীয় সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা এবং এর ভালোমন্দ নিয়ে দেশের সিভিল বা সুশীল সমাজ বা শ্রেণি অনেক কথা বলেন। একটা বিষয় অবশ্য বলা দরকার, সিভিল সোসাইটির বাংলা কি ‘সুশীল সমাজ’ হয় কিনা। ‘সুশীল’ হতে হলে যে সততা এবং নৈতিকতা প্রয়োজন, সুশীল সমাজে সেটা আছে কি? ভাবার অবকাশ আছে। এখানেও প্রতারণা বিরাজ করছে। এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য এবং শঙ্কা হচ্ছে, বিগত কয়েক বছরে আমরা জাতীয় সব বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং ঐক্যকে ভেঙে ফেলেছি। প্রশাসন বলি বা বিচার বলি। জাতীয় স্বার্থ বলি বা তরুণ ও প্রবীণদেরও বিভিন্ন সংস্থা, সংঘ অথবা প্রতিষ্ঠান। কেবলই ভাঙছি, এগুলো কেবলই এখন সংকুচিত এবং দলীয় ঘরানার। এই কারণে আমরা কেউ এর দালাল, কেউবা ওর। আর্থিক এবং রাজনৈতিক চলমান বাস্তবতাতে বসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কোন আদর্শটির সুবাস্তবায়ন ঘটবে, তা ভাবলে কোন সু উত্তর বা সম্ভাবনা দেখিনা। অন্তত নিকট ভবিষ্যতের জন্য না।
কেবল বস্তুমুখী দেখা-ভাবনা-স্বপ্ন চাওয়া পাওয়া। এবং এর সংস্কৃতির চর্চা আমাদের প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক এবং প্রতারক যেন না করে। তার জন্য এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। তা না হলে চোরও পালাতে পারবো না, সাধুও রক্ষা পাবো না।
বিরাজমান আর্থসামাজিক উৎপাদন সম্পর্কের মৌল অবকাঠামোতে বসে আমরা পারবো না দুর্নীতি, প্রতারণা এবং অন্য বৈষম্য থেকে মুক্ত হতে। তবে একটা ন্যূনতম জবাবদিহিতার কৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে শিখলে বুঝতে পারবো কোন সময়ই চিরস্থায়ী না। সমাজে প্রত্যেকে আমরা সময় নামের এক ট্রেনের যাত্রী। যার যার স্টেশন চলে আসলে অন্যকে রেখে চলে যাই। ক্ষণস্থায়ী এই যাত্রাপথে এইটুকু যেন মনে রাখি- জীবনে সব বস্তু ও পদার্থ আমি ছুঁয়ে যেতে পারি না। আর ছুঁতে পারলেও সেটা রেখেই চলে যাই না ফেরার দেশে। তাই জীবনে যেন একাই সুখী বা সবই আমার চাই এটাও না ভাবি। এবং সেই চাহিদা পূরণে হিংস্র এবং বন্য না হই।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক।
১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।