জ্যামাইকা বাংলাদেশিদের জন্য একটি আদর্শ স্থান

এস এম মোজাম্মেল হক :

মানুষ সামাজিক জীব বলেই সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে বাসস্থান একটি অন্যতম অধিকার। বসবাসের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী বাসগৃহের ব্যবস্থা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। গ্রামে বসবাসের জন্য বংশপরম্পরায় ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় সবারই নিজস্ব বাসগৃহের ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও শহরাঞ্চলে সবার পক্ষে নিজস্ব বাসগৃহে বসবাস সম্ভব নয়। বিশেষ করে, দারিদ্র্যপীড়িত দেশসমূহে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে গড় আয়, তাতে শহরে নিজস্ব বাড়ি থাকা স্বপ্নের ব্যাপার। অধিকন্তু অনেকের পক্ষে ভাড়া জুগিয়ে মানসম্পন্ন বাড়িতে বসবাস করাও কষ্টের ব্যাপার। যে কারণে দরিদ্র দেশসমূহে শহরে যেমন বস্তির প্রাধান্য দেখা যায়, তেমনি তাতে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসেরও কমতি নেই। পক্ষান্তরে উন্নত দেশসমূহে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় এবং পরিবারের একাধিক সদস্যের কর্মের কারণে পারিবারিক খরচ মিটিয়ে অন্তত তিন-চার বছরের উদ্বৃত্ত কিছু অর্থের দ্বারা বাড়ি ক্রয়ের ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ব্যাংক লোনের মাধ্যমে সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দের জায়গায় বাড়ি ক্রয় করা খুব বেশি কষ্টের ব্যাপার নয়।

বাড়ি ক্রয়ের জন্য ক্রেতার কিছু অগ্রাধিকার বিবেচনা করা খুব জরুরি। অগ্রাধিকারের বিবেচ্য বিষয়সমূহ যথাক্রমে নিজস্ব ভাষার প্রাধান্য, নিকটবর্তী ধর্মীয় উপাসনালয়, গ্রোসারি স্টোর, ভালো স্কুল, যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা, পোস্ট অফিস, পাবলিক লাইব্রেরি ইত্যাদির সহজলভ্যতা অন্যতম। নিউইয়র্ক শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকজনের বসবাস রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী লোকজনের আধিক্য জ্যাকসন হাইটসে সর্বাধিক। আড্ডাপ্রিয় হওয়ার ফলে বাংলা ভাষাভাষী লোকেরা একই এলাকায় বসবাসকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যে কারণে জ্যাকসন হাইটস এবং আশপাশের এলাকায় অসংখ্য বাংলা ভাষাভাষী লোকের অবস্থান আর সে কারণে ওই এলাকায় ক্রয়ের জন্য বাসাবাড়ির যেমন সংকট, তেমনি দামও আকাশচুম্বী। সংগত কারণেই বাড়ি ক্রয়ে আগ্রহী লোকজন অন্যান্য বাংলাভাষী এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে বাড়ি কেনায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় জ্যামাইকা অগ্রাধিকার তালিকায় প্রাধান্য পাচ্ছে। এখানে প্রতিযোগিতামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পছন্দের বাড়ি যেমন রয়েছে, তেমনি আড্ডাবাজদের জন্যও রয়েছে প্রচুর সুযোগ। বলতে দ্বিধা নেই, জ্যামাইকার হিলসাইড অ্যাভিনিউতে প্রতিদিনকার আড্ডা দেখলে ঢাকার কোনো সড়ক বলেই মনে হবে। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি বাঙালি গ্রোসারি স্টোর, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, নাইনটি নাইন সেন্টের দোকান। তা ছাড়া যখন-তখন যেকোনো স্থানে গমনের জন্য রয়েছে সাবওয়ে ও বাসের ব্যবস্থা। এ ছাড়া রয়েছে কুইন্সের সর্ববৃহৎ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি, বাস টার্মিনাল, মোটর ভেহিকল অফিস, সাব-পোস্ট অফিস, উন্নতমানের একাধিক স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। যে কারণে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এলাকাটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বাংলাদেশিদের আগ্রহের কারণে জ্যামাইকা ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ জ্যামাইকা, হলিস, হলিসউড, কুইন্স ভিলেজ, সেন্ট এলবানস, পারসন্স, সাটফিন, ব্রায়ারউড ও আশপাশের এলাকাতেও অসংখ্য বাংলাদেশির বসবাস রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিবার এলাকায় যুক্ত হচ্ছে। আশার কথা, এখানকার মূলধারায়ও ক্রমশ বাংলাদেশিদের অবদান স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এখানে মূলধারার রাজনীতিতেও বাংলাদেশি আমেরিকানদের দৃঢ় অবস্থান পরিলক্ষিত হবে, সন্দেহ নেই।

আমেরিকার অন্যান্য স্টেটে নিজস্ব প্রাইভেট গাড়ি ব্যতীত চলাচল কষ্টসাধ্য হলেও নিউইয়র্কের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ, এখানে পাঁচটি বরোর প্রতিটিতেই সাবওয়েসহ পাবলিক পরিবহনের ব্যবস্থা থাকায় নিজস্ব প্রাইভেট কার বা ড্রাইভিং জানা না থাকলেও চলাচলে তেমন অসুবিধা হয় না। তা ছাড়া এখানে প্রয়োজনীয় সবকিছু অতি নিকটবর্তী হওয়ার ফলে হাঁটাপথেই সবকিছুর সমাধান সম্ভব। যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ করে, গন্তব্যের প্রায় প্রতিটি রুটেই ১০-১২ মিনিটের ব্যবধানে পাবলিক পরিবহন পাওয়া সম্ভব। ফলে কোথাও পৌঁছার ক্ষেত্রে অহেতুক সময় নষ্টের শঙ্কা খুবই কম। তা ছাড়া অতি জরুরি ক্ষেত্রে উবার বা রেন্ট-এ-কার অতি সহজলভ্য। শিক্ষার জন্য রয়েছে প্রতিটি মহল্লায় স্কুলের ব্যবস্থা। ডাক্তার, ফার্মেসি, হাসপাতাল, ব্যাংক, বিমা ইত্যাদি সবকিছুই নাগালের মধ্যে। বিনোদনের জন্য রয়েছে ঘন ঘন পার্কের ব্যবস্থা। বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর জন্য রয়েছে সুইমিংপুল। এখানে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের লোকদের পাশাপাশি মিলেমিশে বসবাস সৌহার্দ্যরে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নিজ কমিউনিটির লোকজন একে অন্যের প্রয়োজনে সবাই খুবই আন্তরিক, তবে দেশীয় রাজনীতির কুপ্রভাব এখানেও বিদ্যমান।
জ্যামাইকা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা শুধু নিজস্ব বাড়ির মালিকদের জন্যই বসবাসের উত্তম জায়গা, তা নয় বরং যারা ভাড়া বাড়িতে থাকতে চান, তাদের জন্যও এটি উত্তম জায়গা। ভাড়াটিয়াদের জন্য বাড়তি সুবিধা এই যে যেকোনো সময় বাসা বদল করে পছন্দের জায়গা বেছে নেওয়ার সুযোগ ও স্বাধীনতা রয়েছে। নিউইয়র্কে নতুন আসা লোকজনের জন্য এলাকাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শহর হলেও এখানে সড়ক ও গাছগাছালির আধিক্য অনেকটা গ্রাম্য পরিবেশের মতো। তাই যারা নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এলাকাটি খুবই আকর্ষণীয়। বয়স্ক লোকদের বাজার করা ও ইবাদত-বন্দেগির জন্যও এলাকাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, খুব অল্প দূরত্বে হোটেল, রেস্তোরাঁ, গ্রোসারি ও মসজিদ বিদ্যমান। যারা আড্ডা দিতে পছন্দ করেন, কয়েক কদম হেঁটে হিলসাইডে এলেই আড্ডা দেওয়ার মতো যথেষ্ট লোকসমাগমে গা ভাসিয়ে দিতে ও আড্ডায় শামিল হতে মোটেই অসুবিধার কিছু নেই, বরং নতুনদের বরণ করে নিতে পুরানোরা সদা উদ্্গ্রীব। কিছুদিন বসবাসের পরে এলাকাটিকে মোটেই নতুন জায়গা বলে মনে হবে না বরং এলাকাটির প্রতি এমন ভালোবাসা তৈরি হবে, কোনো কারণে এলাকাটি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হবে। প্রয়োজনীয় সবকিছু অতি সহজলভ্য হওয়ার ফলে বসবাসের জন্য এলাকাটি অত্যন্ত পছন্দসই।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক। কুইন্স ভিলেজ, নিউইয়র্ক।