জয়তু শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে সুস্বাগতম

বিশেষ ক্রোড়পত্রের প্রচ্ছদ

আবু সাঈদ রতন

জাতি সংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার তিনি সাধারণ পরিষদে ষোড়শ ভাষণ দেবেন। প্রতিবারের মতো এই অধিবেশনে তিনি বাংলায় ভাষণ দিবেন এবং বিশ্বের সা¤প্রতিক কিছু সমস্যা এবং চলমান সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা যায়। এর মধ্যে জলবায়ু, টেকসই উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং শরণার্থী ইস্যুতেও কথা বলবেন। তার এই দৃঢ় চিত্তের পথচলার নেপথ্যে রয়েছে সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস। সময়ের পরিক্রমায় তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে সততা ও ভালো কিছু করার মনোবৃত্তি।
শেখ হাসিনার দৃঢ়তার মূলমন্ত্র হলো বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি একদিকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত এবং অন্যদিকে বৈরী রাষ্ট্র চীনকেও সমানতালে ম্যানেজ করে রাখতে পেরেছেন যা অতীতে কোনো সময় সম্ভব ছিল না। তিনি জাপান ও রাশিয়াকে যেমন বন্ধু রাষ্ট্র বানিয়ে রাখতে পেরেছেন ঠিক তেমনি আমেরিকাকেও আস্থায় রেখে তার দীর্ঘ সময়ের একটানা শাসন ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবকেও তিনি আস্থায় নিয়ে এসেছেন।
এভাবেই তাঁর ব্যক্তিগত কারিশমা দিয়ে এবং সুদৃঢ় প্রসারী চিন্তা দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পেরেছেন। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নতি আজ পুরো বিশ্ব দরবারে উদাহরণ হিসেবে পরিগনিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর ভিতও মজবুত হচ্ছে।
গত দশ বছর অর্থনীতিতে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি হয়েছে। যার কারণে পৃথিবীর অর্থনীতির আঙিনায় এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে । বিশ্বব্যাংক ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ পৃথিবীর অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমাদের অর্থনীতির উন্নয়নের বিষয়ে উচ্ছ¡সিত প্রশংসা করে চলেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি বলেছেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের চমৎকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক খাতে, বিশেষ করে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে চমৎকার উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে আমরা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

‘বিশ্বের শীর্ষ স্বল্পোন্নত দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে গত ২৮ আগস্ট দ্য স্পেক্টেটর ইনডেক্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, গত দশ বছরে সারা বিশ্বের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১৮৮%। পৃথিবীর প্রথম সারির অন্যান্য দেশের যেমন চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭৭% আর ভারতের ১১৭%, ব্রাজিলের ৯৭%, ইন্দোনেশিয়ার ৯০%। অন্যদের অবস্থান আরও অনেক পিছিয়ে।’
এ ছাড়া এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক অতি স¤প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী আমাদের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি হবে ৮% যা হবে এশিয়া মহাদেশের সব দেশের উপরে।’
‘অতি স¤প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি তথ্য উপাত্তের উপরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকনোমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ ৪১তম অর্থনীতির দেশ থেকে ২০২৩ সালে ৩৬তম অবস্থানে যাবে, আর ২০২৮ সালে অবস্থান হবে ২৭তম এবং ২০৩৩ হবে ২৪তম অর্থনীতির উন্নতির দেশ। সেই সময় আমাদের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির আকার হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার।’
অনুরূপভাবে স¤প্রতি স্ট্যান্ডার্ড চ্যাটার্ড ব্যাংক বৈশ্বিক প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেবিড ম্যাগ তার গবেষণা তথ্য এবং আইএমএফ’র তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করে দেখেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে ভারতের চেয়ে বেশি। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ৫ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। আর তখন ভারতের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ৫ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার।’
সরকারপ্রধান হিসেবে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার ও শ্রীলঙ্কার চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের বিখ্যাত শীর্ষ নারী শাসকের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী হিসেবে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা ও বিশ্বে পরিচিতির দিক বিবেচনায় এ তালিকা করা হয়েছে। উইকিলিকসের সা¤প্রতিক এক জরিপের বরাত দিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় বার্তা সংস্থা ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। টানা তৃতীয়বারসহ চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্রথম মেয়াদে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ জয় পায় তার দল আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদে ১৫ বছরেরও বেশি সময় পার করে ফেলেছেন তিনি।
পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশের মানুষ অসহায় জীবন যাপন করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৯৬ সালে আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তখন কিছু কাজ করেছি, যা মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। এরপর আট বছর পর আবার ক্ষমতায় আসার পর এক দশকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এডিবির রিপোর্ট অনুযায়ী, আমরা এখন বিশ্বের ১৩তম অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম। বিশ্বে আমরা ৩০তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছি। মাত্র ১০ বছরে এই অর্জনগুলো করতে পেরেছি; কারণ আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের কল্যাণে কাজ করেছি।’
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৬ সালে মাত্র ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। ক্ষমতা ছাড়ার সময় ৩৩০০ মেগাওয়াট রেখে এলেও আট বছর পর পুনরায় ক্ষমতায় এসে দেখলাম উৎপাদন বাড়েনি, বরং কমে গেছে। সেই ৩৩০০ মেগাওয়াট থেকে গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২২ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।
এভাবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন শেখ হাসিনাই। তিনি পথ দেখিয়েছেন ডিজিটাল বাংলার সা¤প্রতিক রূপরেখা। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল। সারা বিশ্বকে আস্থায় নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার এই পথচলা আমাদের ভরসাস্থান। তাঁর ৭৩তম জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। আর এই নিউইয়র্কে জানাচ্ছি স্বাগতম-সুসাগতম।
সম্পাদক ইউএস বাংলা নিউজ, নিউইয়র্ক।