টাইম টু রিয়ালাইজ

রশীদ জামীল : ‘করোনা একটি ভাইরাস। প্রতিরোধ করতে অ্যান্টিভাইরাস দরকার। দোয়া-দরুদের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া যাবে-বিজ্ঞানের এই যুগে এমন অন্ধবিশ্বাসে বিশ্বাস করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।’ ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের শুরুতে মাথামোটা কিছু লোক এভাবেই বলাবলি করছিল। একজন ডাক্তারের গল্প বলি। ডাক্তারের দেখা হলো এক হুজুরের সাথে।
ডাক্তার : স্লামালিকুম হুজুর। কেমন আছেন?
হুজুর : ওয়া আলাইকুম সালাম। জি, আলহামদুলিল্লাহ।
ডাক্তার : হুজুর, একটা প্রশ্ন ছিল।
হুজুর : জি বলেন।
ডাক্তার : যেকোনো কাজের পেছনে কারণ থাকে, যেটাকে আমরা কার্যকারণ বলি। মানুষের স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ব্যাপারে এই সূত্রটি ফলো করা হয়।
হুজুর : এসব কথা আমাকে বলছেন কেন?
ডাক্তার : কারণ আছে। বলছি। আগে কথাটা শেষ করি?
হুজুর : আচ্ছা করেন।
ডাক্তার : কারো শরীরে বাহ্যিক পচন ধরলে সেটাকে সেপটিক বলা হয়। আমরা তখন অ্যান্টি-সেপটিক প্রেসক্রাইব করি। কারো পেটব্যথা করছে। আমাদের কাছে এলে আমরা ব্যথানাশক ট্যাবলেট সাজেস্ট করি। অ্যান্টিবায়োটিক দিই। ওষুধ শরীরে যায়। যে কারণে ব্যথা হচ্ছে, ওষুধ সেটার সাথে যুদ্ধ করে। ভাইরাস কিল করে। ব্যথা কমে। ব্যথা কমার যুক্তি আছে। আছে না?
হুজুর : আছে।
ডাক্তার : একুশ শতকে এসে অযৌক্তিক কিছু করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। অন্তত কোনো শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষের জন্য তো অবশ্যই না। ঠিক কি না বলেন?
হুজুর : বুঝলাম না, এসব কথা আমাকে বলার কারণ কী? আমি তো ডাক্তার নই। এসব শুনে আমি কী করব? আপনি কিছু একটা প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন। এত ভূমিকা দিচ্ছেন কেন?
ডাক্তার : কারণ আছে। প্রশ্নটি করার জন্য ভূমিকাটা দরকার ছিল। এবার মূল পয়েন্টে আসি। আমাদের কাছে পেটব্যথা নিয়ে মানুষ আসে, আপনাদের কাছেও যায়। আমরা ট্যাবলেট দিই, আপনারা ফুঁ দেন। আমাদের ট্যাবলেট শরীরের ভেতরে গিয়ে কাজ করে। আপনাদের ফুঁ বাতাসে মিশে যায়। ব্যথা করছে পেটের ভেতর, আর আপনারা ফুঁ দিচ্ছেন চামড়ার উপরে, মিশে যাচ্ছে বাতাসে। এই ফুঁতে পেটের ভেতরের ব্যথা কমার কোনো যুক্তি আছে?
হুজুর বললেন, এসব ব্যাপার তুই কী বুঝবিরে শু…র বাচ্চা! ভ্যাবাচেকা খেয়ে উঠলেন ডাক্তার। এত বড় একজন আলেম এভাবে তাকে সরাসরি গালি দিতে পারেন-এটা তিনি কল্পনাও করেননি। রাগে কাঁপতে লাগলেন তিনি। চেহারা লাল হয়ে গেল তার। কোনো রকমে নিজেকে সংযত করে বললেন, আমি আপনাকে বড় একজন আলেম বলেই জানতাম। শ্রদ্ধা করতাম। আপনার কাছ থেকে এমনটি আশা করিনি।
হুজুরের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বললেন, সমস্যা কী? আমি আবার কী করলাম?
-‘কী করলাম’ মানে? আমাকে গালি দিয়ে আবার বলছেন কী করলাম!
হুজুর বললেন, আমি একটা কথার কথা বললাম। তাতেই আপনার চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যাবে কেন? আপনি রাগে কাঁপতে শুরু করলেন কেন?
ডাক্তার বললেন, আপনি আমাকে গালি দেবেন আর আমি রাগ করব না? সেটি আমাকে প্রভাবিত করবে না?
হুজুর হাসছেন। ডাক্তারের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। তিনি কড়া করে কিছু একটা বলতে যাবেন-তার আগেই হুজুর বললেন, সরি ডাক্তার সাব। আপনাকে ইনসাল্ট করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আপনার যেমন প্রশ্নটি করার জন্য ভূমিকার দরকার ছিল, আমাকেও জবাব দেওয়ার জন্য একটা ভূমিকা দাঁড় করাতে হয়েছে। সরি ফর দ্যাট।
ডাক্তার কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছেন।
হুজুর বলে যাচ্ছেন,
আপনার যুক্তি ছিল, মানুষ পেটব্যথা নিয়ে হুজুরদের কাছে এলে হুজুররা চামড়ার বাইরে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দেন, যে ফুঁ বাতাসে মিশে যায়। এই ফুঁয়ের কারণে রোগীর অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। আমি আপনাকে একটা গালি দিয়েছি। গালিটি আপনার শরীরে প্রবেশ করেনি। বাতাসের সাথে মিশে গেছে। এখন আমার মুখ নিঃসৃত একটি বাক্যের যদি এত প্রভাব হতে পারে, আপনার চেহারার রং পাল্টে দিতে পারে, আপনার শরীরে কম্পন সৃষ্টি করতে পারে আর এটা যদি আপনার যুক্তিতে ধরে, তাহলে আল্লাহর কালাম পড়ে ফুঁ দিলে সেটা বাতাসে মিশে গেলেও অন্যের শরীরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে-এটা কেন যুক্তিতে ধরে না?
ডাক্তার লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে ফেললেন।
এবার তাঁর যুক্তিতে ধরেছে।
‘করোনাভাইরাসে যখন বিশ্ব আতঙ্কিত, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা যখন অ্যান্টিভাইরাস আবিষ্কারের জন্য পেরেশান, তখন মোল্লারা আছে দোয়া-দরুদ নিয়ে। এই দোয়া পড়লে করোনা থেকে বাঁচা যাবে, ওই দোয়া পড়লে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। যত্ত সব কুসংস্কার…’ কিছু মানুষকে এভাবেই বকওয়াস করে যায়। এদের সাথে ওই হুজুরকে একবার দেখা করাতে পারলে ভালো হতো!
কার্যকারণকে কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু কারণগুলো যে সব সময় দৃশ্যমান হবে-এ কথাই-বা কে বলল? মাঝেমধ্যে এমন অনেক রোগী পাওয়া যায়, পৃথিবীর বড় বড় ডাক্তাররাও রোগ খুঁজে পান না, অথচ মানুষটি অসুস্থ। এর অর্থ লোকটির রোগের পেছনে কারণ আছে। কারণটি অদৃশ্য। সুতরাং ব্যবস্থাপত্রও যদি অদৃশ্যের আবরণে জড়ানো থাকে, সেটা যুক্তিতে ধরে না কেন?
আপনি অবিশ্বাসী হলে সেটা আপনার ব্যাপার। যদি বিশ্বাসী হন, যদি নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত না হন এবং আপনার প্রগতি এবং আধুনিকতার কলারে দাগ না লেগে যায়, তাহলে মনে রাখা দরকার অসুস্থ হলে কোনো ওষুধের ক্ষমতা নেই অসুখ সারানোর। যদি থাকত, তাহলে হসপিটাল থেকে কেউ লাশ হয়ে ফিরত না।
তবু মানুষ অসুস্থ হলে হসপিটালে যায় কেন?
তবু আমরা অসুস্থ হলে ওষুধ খাই কেন?
কারণ, পৃথিবীটা একটা নিজস্ব গতিপথে চলে। কাজের পেছনে যেমন কারণ থাকে, তেমনি থাকে উপসর্গ। উপসর্গ যখন উৎপাতের পর্যায়ে চলে যায়, তখন সেগুলোকে দমন করতে মেডিসিন লাগে। আমরা মেডিসিন ব্যবহার করি। আবার যেহেতু মেডিসিন সেবন করলে রোগ সারবেই, সেই গ্যারান্টিও নেই, এ জন্য আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করি। অসুস্থ হলে আল্লাহর ওপর ভরসা করা ওয়াজিব আর ওষুধ সেবন করা সুন্নত। ভালো মুসলমান ফরজের পাশাপাশি সুন্নতের ওপরও আমল করে।
পৃথিবীটা সুস্থ হোক। ফিরে পাক গতি। প্রীতির বাহুতে জড়িয়ে যাক তার সকল সন্তান। করোনা কাউকে ছাড় দেয়নি। জানিয়ে দিয়েছে মানুষে মানুষে পার্থক্য নেই। এটাই হোক নতুন পৃথিবীর জন্য শিক্ষা।

  • রশীদ জামীল : কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক
    ব্রঙ্কস, নিউইয়র্ক।