টাইম মেশিনে ‘ঠিকানা’র ঠিকানায় — আব্দুল মালেক

 

টাইম মেশিন নামে ১৮৯৫ সালে এইচ জি ওয়েলসের প্রকাশিত হয়েছিল একটি কল্পবিজ্ঞান কথাসাহিত্য। ওয়েলসের এই বইটিতে ছিল একটি আশ্চর্য মোটরগাড়িতে করে জীবনের ফরোয়ার্ড ব্যাকওয়ার্ড যাত্রা। একজন অপারেটর গাড়িরূপী টাইম মেশিনে ইচ্ছা অনুসারে ভ্রমণ করতে পারতেন কখনো জীবনের ফরোয়ার্ড কখনো বা ব্যাকওয়ার্ডকে বেছে নিয়ে।
চলতি বছরের ঠিকানা পত্রিকার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি লেখা দেওয়ার অনুরোধ পেয়ে আমি প্রকৃতপক্ষেই ওয়েলসের টাইম মেশিনের অপারেটর হয়ে অজান্তেই যাত্রা শুরু করলাম পেছনের দিকেÑঠিকানার বর্ণবহুল দিনগুলোতে। আসলে মুছে যাওয়া অতীত প্রতিটি মানুষকেই সুযোগ পেলে পিছু ডাকে।
ডাচ বণিকেরা একদা নিউইয়র্কে হাডসন নদীর পাড় ঘেঁষে তৈরি করেছিল যে বসতি, সেটাই পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছিল ড্রিমল্যান্ড, আমেরিকার এক বৈচিত্র্যময় বাগান। স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশায় পৃথিবীর নানা দেশের মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এ নগরে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করে বলে কথিত আছে সিটি নেভার ¯িøপ। বাংলাদেশ থেকে চাকরির বদান্যতায় এমন নির্ঘুম স্বপ্নময় শহরটিতে আশির দশকে ভ্রমণের সুযোগ মিলেছিল একবার। কে জানত ইমিগ্র্যান্ট হয়ে জনতার ভিড়ে মিলেমিশে আমিও একদিন ঘর বাঁধব ডাচ বণিকের শহরে। নব্বই দশকের প্রথমার্ধ তখন, বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষ সপরিবারে প্রথমবারের মতো বৈধ ইমিগ্র্যান্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়ছেন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে, বিশেষত এই নিউইয়র্ক নগরে। ইতিমধ্যে জার্মানি থেকে বড়সড় একদল তরুণ ভাগ্যান্বেষণে এসেছেন মূলত এখানেই।
ফ১্যাশন হিসেবে নিউজ মিডিয়াকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলাম কৈশোর অতিক্রমের বয়স থেকে। সে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স শেষে ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম জার্নালিজমের মাস্টার্সে। ছাত্র অবস্থাতেই আমার সাংবাদিকতার শুরু আর তাই প্রবাসে এসে বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে দেখে বুকের মধ্যে সেখানে কাজ করার বাসনা প্রবাসেও ডাক দেবে তাতে আশ্চর্যের কী আছে। শুরুতে জীবিকার প্রয়োজনে এখানে-সেখানে নানা রকম টুকিটাকি কাজকর্মের মাঝে অবশেষে কয়েকটি মাসের মাথায় ‘আমার দেশ’ নামে নিউইয়র্কের চতুর্থ বাংলা পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করল এবং আমি কাজ করার সুযোগ পেলাম সেখানে।
পুরনো বাঙালি অভিবাসীরা অবগত আছেন যে প্রবীণ সাংবাদিক মহম্মদ উল্লাহ সাহেবের সম্পাদনায় প্রবাসের প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘প্রবাসী’র পর দ্বিতীয় পত্রিকা হিসেবে কমিউনিটিতে আবিভর্‚ত হয়েছিল মালিক ও সম্পাদক এম এম শাহীনের ‘ঠিকানা’। তবে আমি যখন এ শহরে আসি, তখন ইতিমধ্যে বাজারে এসেছে কৌশিক আহমেদের সম্পাদনায় ‘বাঙালী’ নামের তৃতীয় সাপ্তাহিক।
দেশে থাকতে মিডিয়া জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলেও নিউইয়র্ক বাংলা পত্রিকার জগৎ সম্পর্কে তেমন অবগত ছিলাম না। কিন্তু ভিন্ন ভাষাভাষী এ শহরে বসবাস করতে এসে প্রতি সপ্তাহে বাংলা খবরের কাগজ প্রকাশিত হচ্ছে দেখে আমি অভিভ‚ত প্রায়। এর মধ্যে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করল একটি সাপ্তাহিকীÑনাম ‘ঠিকানা’। জানা গেল, সাংবাদিকতা জগতের বাইরের একজন মানুষ হয়েও বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে প্রকাশ করছেন জার্মানি থেকে প্রত্যাগত শাহীন নামের ভাগ্যান্বেষী ও ব্যবসাসফল একজন তরুণ।
সেই অতীতে একরকম অকল্পনীয় ছিল আজকের এই নিউজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিপ্লবের যুগটি। তারপরও কীভাবে এই নিউইয়র্ক থেকে বাংলা সাপ্তাহিকগুলো প্রকাশিত হতো, সেটা আজকের মানুষদের কাছে হতে পারে কৌতুককরভাবে অবাক হওয়ার ব্যাপার। ঢাকা থেকে টেলিফোন ও ফ্যাক্সের ও ডাকের মাধ্যমে ছিটকে ছিটকে আসত খবরাখবর। আর দেশ থেকে কেউ একটি সংবাদপত্র হাতে করে আনলে সেটি হতো সোনায় সোহাগা। পরবর্তী সময়ে যখন আমি ঠিকানায়, সে সময় অবশ্য বাংলাদেশ থেকে নাজমুল হক হেলাল এবং কয়সর আহমেদ বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত পত্রিকা আনতে লাগলেন বাজারে। যা-ই হোক, নানা সূত্রে নানা খবর ও ছবি মিলিয়ে সাদা-কালো যে সাপ্তাহিক প্রকাশিত হতো, তা প্রবাসী সমাজের মানুষ গোগ্রাসে পাঠ করতেন। সে সময় ঘরে ঘরে টিভি আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে পত্রিকা পাঠ ছিল কল্পনার বাইরে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করি নতুন শতাব্দীতে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কাগজ’ পত্রিকাটি ছিল কমিউনিটির প্রথম ফোর কালার বর্ণাঢ্য পত্রিকা।
‘আমার দেশ’ পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে আমি লড়াকু প্রবাসীদের জীবনসংগ্রামভিত্তিক একটি কলাম লিখতাম প্রতি সপ্তাহে। মাঝেমধ্যে কমিউনিটির অনুষ্ঠানে দেখা হলে এই কলামটি নিয়ে সপ্রশংস উক্তি করতেন ঠিকানার মালিক ও সম্পাদক শাহীন সাহেব। সেই সঙ্গে স্বভাবসিদ্ধ বিনয়ের সঙ্গে বলতেন ঠিকানা পত্রিকায় যোগদান করার জন্য। তবে সেটি আমার পক্ষ থেকে সিরিয়াসলি নেওয়া হয়নি। কিন্তু ‘আমার দেশ’ নিদারুণ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হওয়ার সময় এক রাতে যখন বাসায় ফোন এল তার কাছ থেকে আমি সানন্দে রাজি হয়েছিলাম। এম এম শাহীন ভ‚মিকা হিসেবে বলেছিলেন যে তিনি শিগগিরই বাংলাদেশে যেতে মনস্থির করেছেন আর যাওয়ার আগে তিনি আমার হাতে তুলে দিয়ে যেতে চান তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাটির দায়িত্ব। এর হপ্তা দুই পর থেকে ‘ঠিকানাই’ হলো আমার কর্মের ‘ঠিকানা’।
যোগদানের সময়কালে সেখানে আমি যাদের সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম, তারা হলেন শাহীন সাহেবের মেজো ভাই সাঈদ-উর-রব, মাহাব-উর রহমান, আবু তাহের, দাউদ ভুঁইয়া ও নিয়াজ মাখদুম। যখন ঢাকার পত্রিকায় দেখেছিলাম তৎকালে অক্ষর কম্পোজের কাজটি করা হতো হাতে। কিন্তু নব্বইয়ের শুরুতে নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকায় শুরু হয়েছিল বাংলা ফন্ট ব্যবহার করে কম্পিউটারে টাইপ ও কম্পোজের কাজ। যদিও পিসিতে বাংলা ব্যবহার আরো অনেক পরের কথা আর ইন্টারনেটের ব্যবহার করে এক-একটি বোতাম টিপে সমস্ত দুনিয়ার সুলুকসন্ধান ও কাজকর্ম সাধারণ্যের দুনিয়ায় অপ্রচলিত। আমার ঠিকানায় যোগদানের সময় দাউদ ভ‚ঁইয়া নামে যে তরুণ দক্ষ হাতে তখন মেকআপের কাজ করতেন, কিছুদিনের মধ্যে কে জানে কেন তিনি হঠাৎ করে বিদায় নিলেন কাজ থেকে। কিন্তু সামনে যে আরো বড় বিপদ আসছে আর তাতে যে আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে পত্রিকার মাথায়, কে জানত। আমার প্রায় সকল পুরোনো সহকর্মী সাংবাদিক যেমন মাহবুব ভাই, আবু তাহের, নিয়াজ মাখদুম একই দিনে ও একই সঙ্গে বিদায় গ্রহণ করলেন। সেই সব দিনগুলোতে কেবল টাইপিং ছাড়া বাদবাকি জুতো সেলাই থেকে চÐী পাঠের যাবতীয় দায়িত্ব নিতে হলো এই বান্দাকেই। বাঙালি কমিউনিটি তখন আজকের মতো এত বিরাট হয়নি এবং চাইলেই পত্রিকার কাজে দক্ষ লোক মিলত না। গেটআপ, মেকআপ থেকে শুরু করে রিপোর্টিং করা, লেখা নির্বাচন, নানা ধরনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, প্রæফ দেখা সর্বোপরি পত্রিকা সম্পাদনের কাজগুলো সেই দুর্দিনে একাকী কীভাবে করেছি, সেটা আজও বিস্ময়। কিছুদিন পরে বিদায়ী সহকর্মীরা অবশ্য যৌথভাবে একটা নতুন সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করলেন ‘বাংলা পত্রিকা’।
যোগদানের প্রথম থেকেই কর্তৃপক্ষসহ আমার আপ্রাণ প্রচেষ্টা ছিল দল, মত, ধর্ম ও পেশানির্বিশেষে কমিউনিটির সকল মানুষের সঙ্গে ‘ঠিকানা’কে একটি যোগসূত্রের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার। টাইম মেশিনে সওয়ার হয়ে পেছনে ফিরে গিয়ে আজও দেখতে পাই, দেশ থেকে যারা আমেরিকা ভ্রমণে আসতেন, তাদের জন্য একটি ছোটখাটো তীর্থকেন্দ্র ছিল এই পত্রিকা। দেশের, প্রবাসের প্রায় সব দলের রাজনীতিক, গায়ক-গায়িকা, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রের মানুষÑসবারই মিলনস্থল ছিল লং আইল্যান্ড সিটির ঠিকানা অফিসটি।
পত্রিকাটি যদিও প্রকাশিত হতো নিউইয়র্ক থেকে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী সব বাংলা ভাষাভাষী অধ্যুষিত বসতিগুলোর খবর তাতে গুরুত্ব পেত সমভাবে। বিভিন্ন স্থান থেকে যেসব প্রতিনিধি সরাসরি আমাদের পত্রিকায় খবর পাঠাতেন তাদের সঙ্গে যেন একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সে সময়। আটলান্টার লিয়াকত হোসেন আবু, বোস্টনের নাহিদ নজরুল, ফ্লোরিডার জুনায়েদ আক্তার, ওয়াশিংটনের হারুন চৌধুরী, লস অ্যাঞ্জেলেসের শঙ্কু আইচ, ডেট্রয়েটের শাহেদ সাহেবÑএ রকম আরো বহু নাম হৃদয়ের মণিকোঠায় দ্যুতিময় হয়ে আছে। বাইরের স্টেট থেকে প্রচুর লেখক-লেখিকাও এই পত্রিকায় লিখতেন। কারো কারো কাছে রীতিমতো তাগিদ দিয়ে চেয়ে নেওয়াও হতো লেখা। আমার এই লেখনীটি যখন শেষের দিকে, কথা হচ্ছিল প্রবাস ও দেশের একজন স্বনামখ্যাত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। হঠাৎ হাসতে হাসতে তিনি বললেন, আপনি প্রতি সপ্তাহে যেভাবে আমাকে তাড়া লাগাতেন, তাতে না লিখে আমার উপায় ছিল না। এখন তাড়া নেই বলে লেখাও হয় না।
পরবর্তীকালে ঠিকানায় আমার যেসব সহকর্মী যোগ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন আনিসুল কবির জাসির, মোহাম্মদ শামসুল হক, মঞ্জুর হোসেন, মাহফুজুর রহমান, খালেদ উর রব, মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, মনোয়ার হোসেন, মরহুম আতাউর রহমান প্রমুখ। এদের মধ্যে কেউ কেউ আমার আগে কিংবা পরে বিদায় নিয়েছেন। কম্পিউটার সেকশনে ছিল একদল দক্ষ তরুণ-তরুণীÑদিলীপ বাবু, আবিদ রেজা, জাহাঙ্গীর, মাহবুব হোসেন, রুপা ও পরশ নামে কন্যাসম দুটি মেয়ে, তাহমিনা রব এবং সাজু সাহেব ও রেহানা রব। তাদের সবার সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আজকে তাদের কাছে জানাই কৃতজ্ঞতা। প্রাথমিক অবস্থায় ঢাকা থেকে খবর পাঠাতেন মতিউর রহমান চৌধুরী এবং ঠিকানা ঢাকা অফিস হওয়ার পর দায়িত্ব নিলেন জাবেদ খসরু। এই দুজনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল অতুলনীয়।
ঠিকানায় কাজ করার সময় এসেছিল আমার জীবনের এক স্মরণীয় দিন, সে কথা এবার বলি। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ভারতীয় উপমহাদেশে ত্রিদেশীয় সফরের সময় হোয়াইট হাউস প্রেস টিমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্যটি হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এই গোপনীয় খবরটি গোপন রাখার সুবাদে ঘটনাটির এক বছর আগে আমি ব্যক্তিগতভাবে জেনেছিলাম সে সময়ের ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত, বর্তমানে প্রয়াত শিহাবুদ্দীন সাহেবের কাছ থেকে। সংবাদটি চ‚ড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই পত্রিকার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা শুরু করেছিলাম হোয়াইট হাউসের সঙ্গে। এরই ফল হিসেবে আমেরিকার সমগ্র বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে বিশ্বের সুপার পাওয়ার আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কেবল ‘ঠিকানা’র পক্ষ থেকে এন্ডরু এয়ারপোর্ট বেজ থেকে উপমহাদেশের পানে উড়েছিলাম আমি ও সাঈদ-উর-রব সাহেব। সেই সফর অভিজ্ঞতার গল্প তো আজকের স্বল্প পরিসরে বলার অবকাশ নেই।
ঠিকানায় অবস্থানকালে আরো কিছু পরম পাওয়ার ব্যাপারটি ঘটেছিল আমার। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ ও সেতার বাদক পÐিত রবিশঙ্করের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণ। সেটি এমন এক স্নেহের পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি তার একান্ত গোপন টেলিফোন নম্বরটি পর্যন্ত আমার কাছে দিয়ে রেখেছিলেন। বাংলাদেশকে বড় ভালোবাসতেন তিনি। সাক্ষাৎকারের সময় আমি যখন প্রশ্ন রেখেছিলামÑপাশ্চাত্যের বিটলস, পপ এই সমস্ত গানের মাঝে আপনি বজায় রেখেছেন আপন সত্তা! কিন্তু আগামীর ধুমধাড়াক্কা গানের দিনে ক্লাসিক্যাল গান কি শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হবে?
রেস্টুরেন্টে নানা প্রদেশের ভারতীয়, চায়নিজ, স্প্যানিশ নানা স্বাদের খাবার ছাড়াও বাজারে লভ্য আরো কত রকম রান্না করা ফুড খাই আমরা। কিন্তু তারপরও কি সেগুলো মা-মাসিদের রান্না করা খাবারের তুল্য হয়েছে, না সেই রান্না আমরা ভুলতে পেরেছি? সেটা যেমন কোনো দিন হবে না, তেমনি হারিয়ে যাবে না শাস্ত্রীয় সঙ্গীতও।
এমনি অসাধারণ জবাবটি তিনি দিয়েছিলেন। তিনি এ মাসটি ফেব্রæয়ারি মাস এবং একুশে ফেব্রæয়ারি ঠিকানার প্রতিষ্ঠা দিবস। এই ফেব্রæয়ারিতে বইমেলার রাজা হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করে আজকের লেখাটা শেষ করতে চাই। আর একটি ঐতিহাসিক কথনের সাক্ষাৎকার আজ আবার ভাগাভাগি করে নিতে চাই, যখন অতুলনীয় জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ চলে গেছেন জীবননদীর ওপারে। প্রথিতযশা অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আমার কাছে এক সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ যেসব চটি বই লেখে, সেগুলোকে উপন্যাস না বলে অপন্যাশ বলাই ভালো।’ সেই সূত্র ধরে পরবর্তী সময়ে হুমায়ূনের সঙ্গে আলাপচারিতায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম প্রফেসর সিদ্দিকীর মন্তব্যটি। তখন বেশ ক্রোধ প্রকাশ করে তিনি যা বলেছিলেন, ‘তিনি বোধ করি আমার লেখা পড়েন না। পৃষ্ঠাসংখ্যা কম হলেই যদি সেটি অপন্যাশ হয়, তবে বিশ্বখ্যাত নভেল ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ও একই ক্যাটাগরিতে পড়বে নিশ্চয়।’
ভারতের আকাদমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালি প্রথিতযশা সাহিত্যিক সে সময়টাতে যেমন কমিউনিটির সঙ্গে তেমনি ঠিকানা পরিবারের সঙ্গে আত্মার বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলেন। ঠিকানার উদ্যোগে আয়োজিত এমন কোনো সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো না, যেখানে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি না আসতেন। আমাকেই হুমায়ূন প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘সে-ই এককভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে ইদানীংকার বাংলা সাহিত্যকে। এই যুগটাতে তার আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত বাঙালি হয়ে উঠেছিল বইবিমুখ। বই কেনার জন্য তার স্টলে ক্রেতাদের সুদীর্ঘ লাইন বলে দেয়, পাঠক আবার ফিরে পেয়েছে বইপড়ার অভ্যাস।’
সাবেক সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।