টাকা দিয়ে সুখ কেনা

জান্নাতুল ফেরদৌসী মেহমুদ :

আমেরিকায় আমাদের অফিসে আমার এক কলিগ প্রায়ই বলত, ‘আমাদের জীবনের চাহিদা আর কী? দুই বেলা দুটো খেতে পেলেই হয়।’ অথচ সে এবং তার স্ত্রী দুজনই আইটি সেক্টরে জব করছে প্রায় ২০ বছরের বেশি। স্টক মার্কেটে অনেক শেয়ার আছে। তারা মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল একটা বাড়িতে থাকে এবং লেটেস্ট মডেলের অভিজাত সব গাড়ি তাদের। দুই মেয়ের ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার জন্য যত টাকা লাগবে, সেটা অনেক আগেই সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমা করে রেখে দেওয়া আছে। তাদের বিলিয়ন ডলারের লাইফ ইন্স্যুরেন্স আছে। এসবই করেছে যেন কোনো কারণে যদি হঠাৎ সে মারা যায়, তখন তার পরিবারের কোনো অসুবিধা না হয়। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও একদিন সে আমাকে বলল, তার স্ত্রী যে কোম্পানিতে জব করে, সেখানে বাজেটের অভাবে কর্মী ছাঁটাই করছে। তার বউয়ের হয়তো চাকরিটা চলে যেতে পারে। এ জন্য তারা দুজনই বেশ চিন্তিত। আমি মনে মনে ভাবলাম, তার স্ত্রীর ২০ বছরের উপরে আইটি সেক্টরে এক্সপেরিয়েন্স আছে, তার একটা চাকরি চলে গেলেও সে কিছুদিনের মধ্যে আরেকটা চাকরি পেয়ে যাবে। তা ছাড়া আমার কলিগ যে কোম্পানিতে আছে, সেখানেও সে পার্মানেন্ট একটা পজিশনে আছে। ওর চাকরি যাওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। সে ক্ষেত্রে তার স্ত্রী যদি চাকরি না করে ঘরে বসে বসে খায়, তাহলেও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়! আসলে ওদের যে পরিমাণ এসেট এবং ইনভেস্টমেন্ট আছে, ওরা দুজনে চাকরি না করে যদি ঘরে বসে বসে খায়, ওদের বাকি জীবনটা চলে যাবে। তার পরও ওদের চিন্তার শেষ নেই! অথচ এই লোকটাই প্রায় কথায় কথায় বলে, আমাদের জীবনের চাহিদা আর কী, দুই বেলা দুটো খেতে পেলেই হয়। তো ব্যাপারটা হচ্ছে, কথার কথা হিসেবে আমরা অনেক কথাই বলতে পারি, যেটা বাস্তবে মোটেও সত্য নয়।
আমি প্রায় সময় অনেককে বলতে শুনি, টাকা দিয়ে সুখ কিনতে পারা যায় না। কিন্তু কথাটা যাদের কাছে টাকা আছে শুধু তাদের মুখেই মানায়। এটা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ আসল কথা হচ্ছে, যদি কারো পেটে ক্ষুধা থাকে, মানে কেউ যদি অনাহারে থাকে, তখন তার প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে ক্ষুধা নিবারণ করা। ঠিক সেই মুহূর্তে খাবার খেতে পারলেই কিন্তু সে সুখী হবে। ঠিক তেমনি কারো যদি মাথার উপর ছাদ না থাকে, ছাদের ব্যবস্থা হওয়া পর্যন্ত সেটাই তার প্রথম প্রায়োরিটি থাকবে। সে ক্ষেত্রে তার বাসস্থানের নিশ্চিত ব্যবস্থা হলে তখনই সে সুখী হতে পারবে।

আমাদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো, যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। প্রথমে এই চাহিদাগুলো সব পূরণ করতে সক্ষম হওয়ার পর বিনোদনের কথা মাথায় আসবে। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোনো চিন্তা মাথায় আসবেই না।

সুখটা হচ্ছে আপেক্ষিক। কেউ খুব অল্পতেই সুখী হয়, আবার কেউ কাউকে পুরো দুনিয়া দিলেও সুখী করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু মানুষ কনফিউশনে ভুগতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তারা আসলে কী চায় এবং কীভাবে সুখী হবে, সেটা তারা নিজেরাও জানে না। এ ধরনের কেউ যদি আপনার নিত্যসঙ্গী হয়, তাহলেই সেরেছে।

এবার আমাদের চাহিদা/প্রয়োজন এবং ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা নিয়ে একটু বলি। আমাদের দৈনন্দিন মৌলিক যে চাহিদাগুলো আছে, সেগুলো সবকিছু যদি আমরা ফুলফিল করতে সক্ষম হই, তাহলে বুঝতে হবে আমরা পৃথিবীতে ধনীদের মধ্যে একজন। কিন্তু আমাদের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা-চাওয়ার তো শেষ নেই। আমাদের যদি একটা বাড়ি থাকে, আমাদের আরেকটা বড় বিলাসবহুল বাড়ি লাগবে। আমাদের যদি একটা গাড়ি থাকে, আমাদের আরও লেটেস্ট মডেলের অভিজাত গাড়ি লাগবে। শুধু স্মার্টফোন হলে হবে না, আমাদের লেটেস্ট আইফোন চাই। আমাদের আইপ্যাড চাই। আমাদের বিগ স্ক্রিন স্যামসাং-৮৫ ক্লাস ৭ সিরিজ এলইডি স্মার্ট টিভি চাই। আমাদের চাহিদার পরিমাণ দিন দিন তুঙ্গে উঠেছে। আমাদের সাদামাটা জীবনযাপন একেবারে ভালো লাগে না। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও আমাদের মন ভালো থাকে না। বিনোদনের জন্য টিভিতে শতাধিক চ্যানেল আছে। সেটা ছাড়াও নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, ইউটিউব, টিকটকÑআরো কত কী। এত এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও আমাদের মন ভালো থাকে না।

‘আজকে আমার মন ভালো নেই’Ñএটা এখন বেশ একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, একদিন একটা হোমলেস সেন্টারে ভিজিট করুন। সেখানে গিয়ে তাদের জীবনযাপন কিছুক্ষণ অবজার্ভ করে আসুন। সেই শেল্টারগুলো কিন্তু শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয়। যেখানে দুবেলা খাবার আর মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়া হয়, তাদের ভালো কোনো পোশাক নেই। তখন নিজের দিকে তাকালে দেখবেন, আমাদের কত সুন্দর পোশাক আছে, আমাদের পায়ে জুতা-মোজা আছে, হাতে একটা দামি ঘড়ি আছে, একটা স্মার্টফোন আছে, তখন কিন্তু নিজেকে অনেক সুখী মনে হবে।

ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। এক দেশে এক রাজা ছিল। আচ্ছা, আমাদের ছোটবেলার সব গল্প এক দেশে এক রাজা ছিল দিয়ে শুরু হতো কেন? ব্যাপারটা ভীষণ মজা, তাই না। যা-ই হোক, সেই রাজা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার এসে দেখে বললেন, রাজাকে সুস্থ হতে হলে একজন সুখী মানুষের জামা তাকে পরতে হবে।

রাজার আদেশে সিপাহিরা সবাই বেরিয়ে পড়ল রাজার জন্য সুখী মানুষের জামা খোঁজার উদ্দেশ্যে। সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে সবাই হতাশ। কোথাও কোনো সুখী মানুষের জামা পাওয়া যায়নি।
তারপর একদিন সারা রাজ্যে খোঁজ করেও কোনো সুখী মানুষের জামা না পেয়ে হতাশ সিপাহিরা পরে এক জঙ্গলের একজন সুখী কাঠুরিয়ার খোঁজ পেলেন। সেই সুখী কাঠুরিয়ার কাছে গিয়ে জানতে পারা গেল, তিনি দিনে কাঠ কাটেন, সন্ধ্যায় সেগুলো বাজারে বিক্রি করেন। তিনি দিনের জন্য খাবার কিনে খেয়ে তারপর রাতে দিব্যি ঘুমান, তার কোনো চিন্তা নেই। তিনি অনেক সুখী। কিন্তু তার কোনো জামা নেই।

গল্পটা পড়ার পর আপনাদের অনেকের মনের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর হয়তো পেয়ে যাবেন। যে রাজা একটা রাজ্যের রাজত্ব করতেন, কিন্তু সুখী ছিলেন না। অথচ সেই রাজ্যের একজন খেটে খাওয়া দিনমজুর দিব্যি সুখে ছিলেন, যদিও তার গায়ে পরার একটা জামা পর্যন্ত ছিল না।

এই মর্মে আমার এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি। বেশ কয়েক বছর আগে আমি আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে একটা প্রজেক্ট জব করতাম। যেহেতু মেরিল্যান্ডে বসবাস করি, তাই প্রতিদিন সকালে মেরিল্যান্ড থেকে আমাকে ট্রেনে করে যেতে হতো। ট্রেন আসার ১০-১৫ মিনিট আগে স্টেশনে গিয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতাম। সেই স্টেশনের ওয়েটিং রুমে যাত্রীদের বসার জন্য বেশ কিছু কাঠের বেঞ্চ ছিল। স্ন্যাক্সের জন্য ভেন্ডিং মেশিন ছিল, আবার টিকিট কেনার জন্য অটোমেটেড বুথ ছিল। আমি প্রায়ই লক্ষ করতাম, যাত্রীরা বেশির ভাগ সময় কেউ পেপার পড়ত, কেউ বই পড়ত, কেউ আইপ্যাডে কিছু করত। অনেকে আবার তাদের স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকত। যথারীতি একদিন আমি স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সেদিন একটি দৃশ্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সেই স্টেশনের কাঠের বেঞ্চে একজন লোক দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। লোকটির পোশাক-আশাক দেখে বুঝতে পারলাম, সে একজন দিনমজুর, যার বেতন একেবারে বেসিক। বেশ কিছুক্ষণ আমি লোকটাকে অবজার্ভ করলাম। সে অনেক গভীর ঘুমে আছে। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, আমি যে অফিসে জব করি, সেই অফিস শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, সেখানে সারা দিন বসে বসে কম্পিউটারে জব করি। আমার বাসায় টেম্পার পেডিক ম্যাট্রেসে শুই। তার পরও আমার প্রায়ই ঘুমের সমস্যা হয়। অথচ ওই লোকটা ন্যূনতম একটা জীবনযাপন করে বেশ দিব্যি ঘুমাচ্ছে।

সবশেষে এটাই বলব, সুখটা হচ্ছে আপেক্ষিক। নিজে যদি নিজেকে সুখী মনে করা যায়, তাহলেই মানুষ সুখী হতে পারে। এ জন্য সেভাবে নিজেকে গঠন করতে হয়। আমাদের যে সোশ্যাল প্রেশার থাকে, সেটাকে বর্জন করতে হবে। অমুকের এটা আছে, আমারও সেটা থাকতে হবে। এ ধরনের চিন্তাধারা না করে আমার কী প্রয়োজন, সেটাতে আমাকে তুষ্ট থাকতে হবে। কারণ অমুকের যা আছে, সেটা আমার প্রয়োজন না-ও থাকতে পারে।

আর হ্যাঁ, টাকার প্রয়োজন আমাদের সবার আছে। কারণ, আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে টাকা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। টাকা দিয়েই আমরা খাবার কিনে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করছি। টাকা দিয়ে আমরা মাথা গোঁজার ঠাঁই করছি। টাকা দিয়েই আমরা কাপড়চোপড় কিনতে পারছি, পড়াশোনা করতে পারছি, নিজেদের চিকিৎসা করে সুস্থ থাকতে পারছি। কিন্তু আমাদের জীবনে ভালো থাকার জন্য কী পরিমাণ টাকার দরকার, সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা অর্জন করতে গিয়ে আমরা যদি রাতের ঘুমটাই হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেই টাকা কি আদৌ আমাদের সুখ দিতে পারে?