টাঙ্গাইলবাসী খুশি ৮ নারী ইউএনও পেয়ে

বাল্যবিয়ে বন্ধ করাসহ এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি : জিনাত জাহান
প্রতিটি ইউনিয়নের রাস্তা-ঘাট সংস্কার ও উন্নয়নে কাজ করছি। এর পাশাপাশি বাল্যবিয়ে বন্ধ, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নিয়েছি বললেন টাঙ্গাইল সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিনাত জাহান।
এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করে তিনি আলোচিত হয়েছেন। জিনাত জাহান প্রশাসনের ২৭তম বিসিএস ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। তার বাবা কাজী মো. কুদ্দুস পেশায় একজন আইনজীবী। পৈতৃক বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলা সদরে। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজ। তার স্বামী আসাদুজ্জামান মিয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তা। দায়িত্ব পালনকালে কোনো বাধার সম্মুখীন হন কিনা জানতে চাইলে জিনাত জাহান বলেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গেলে সমস্যা থাকবেই, বাধা আসবেই। মনোবল ও এলাকার মানুষের সহযোগিতায় বাধা কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। একজন নারী হয়ে জন্ম নেয়ায় গর্ববোধ করি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, টাঙ্গাইল সদর
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিয়েছি : ইসরাত সাদমীন
প্রশাসনের ২৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হন ইসরাত সাদমীন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মির্জাপুরে যোগদান করেন। উপজেলায় শিক্ষার হার বাড়াতে ও বাল্যবিয়ে বন্ধে কাজ করছেন তিনি। শুধু পাস নয়, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ইউএনও ইসরাত সাদমীনের পরামর্শে উপজেলা শিক্ষা অফিস সমাপনী পরীক্ষার্থীদের ডাটাবেজ তৈরি করেছে। এই ডাটাবেজে উপজেলার প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীর নাম, রোল নাম্বারসহ অভিভাবকের নাম ও মোবাইল নাম্বার রয়েছে।
ইসরাত সাদমীন এ প্রসঙ্গে বলেন, এই তথ্য ভাণ্ডার থেকে সময় সুযোগ মতো আমি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ফোন করে কথা বলি। তাদের লেখাপড়ার খোঁজখবর নিই।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় ইসরাত সাদমীন টাঙ্গাইল জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফোন করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের খোঁজখবর নেয়া ও পরামর্শ দেয়ায় অভিভাবক-শিক্ষার্থীরাও খুশি। তার বাবা এসএম নুরুল হুদা একজন মুক্তিযোদ্ধা। মা সরকারি কর্মকর্তা। বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা সদরে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি মেজ। সম্প্রতি তিনি উপজেলার বংশা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে সমালোচনায় আসেন। এরপর থেকে তার নামের আগে উপজেলাবাসী ‘লেডি ফাটাকেস্ট’ নামটি যোগ করেন।
এ বিষয়ে ইসরাত সাদমীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী হয়ে যদি পুরো বাংলাদেশ চালাতে পারেন। তাহলে আমি কেন একটি উপজেলা সামলাতে পারব না। এই সমাজে নারীদের এগিয়ে এসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। ছেলেদের চেয়ে নারীরাও কোনো অংশে কম নয়। সবার সহযোগিতা পেলে একজন নারী দেশের সাফল্যে ভূমিকা রাখতে পারেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মির্জাপুর

নারীরা আরও এগিয়ে যাবে : আসমা শাহীন
প্রশাসনের ২৭তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা শাহীন। তার বাবা এবিএম সালেহ ঢাকার উত্তরার বাংলাদেশ বিমানের সাবেক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। স্বামী সেনাবাহিনী কর্মকর্তা।
আসমা শাহীনের মতে, তার একটাই চ্যালেঞ্জ, পুরুষের চেয়ে নারীরা একধাপ এগিয়ে যেতে পারেন সে লক্ষ্যে কাজ করা। কোনো বাল্যবিয়ে বন্ধ বা মাদক নির্মূলে রাত দুটা-তিনটার সময়ও ঘটনাস্থলে হাজির হন তিনি। এভাবে অনেক বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন। এসব করতে গিয়ে সমাজের গুটিকয়েক মানুষ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
আসমা শাহীন উপজেলার শিক্ষা ক্ষেত্রে নকলমুক্ত পরিবেশ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের কয়েকজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে সচেতন করতে বাল্যবিয়ে বন্ধ, শিক্ষা ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা এবং মাদক নির্মূলে উঠান বৈঠক, বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরামর্শ প্রদান করেন।
এ বিষয়ে আসমা শাহীন বলেন, আমি কখনও নিজেকে নারী মনে করি না। একজন পুরুষ যদি কর্মক্ষেত্রে দিন-রাত কাজ করতে পারেন, তাহলে আমি কেন পারব না। এই সমাজের উন্নয়নের জন্য নারীদের খুব প্রয়োজন। তাই পুরুষের পাশাপাশি সব নারী যাতে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হন এই লক্ষ্যে কাজ করছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নাগরপুর

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নতির জন্য কাজ করছি : মৌসুমী সরকার রাখী
পাবনা জেলার ভাংগুড়া উপজেলা সদরের মৌসুমী সরকার রাখী প্রশাসনের ২৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হন। সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেন চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি।
বাবা স্কুল শিক্ষক এবং মা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনিই বড়। তার স্বামী মিল্ক ভিটার একজন প্রকৌশলী। কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধার সন্মুখীন হতে হয়নি তাকে।
কিভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এ প্রসঙ্গে মৌসুমী সরকার রাখী বলেন, সখীপুর উপজেলা পাহাড়ি এলাকা। এখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস। তাদের জন্য প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ইউএনওর মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিভিন্ন বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া উপজেলায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ঝরে পড়া শিশুদের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে উপজেলা পরিষদ থেকে। পাশাপাশি সারাদিন যেসব ছেলেমেয়ে স্কুলে থাকে তাদের উৎসাহিত করতে তাদের মধ্যে টিফিন বক্স ও প্রাকপ্রাথমিক শিশুদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হবে আগামী মাস থেকে। যাতে ওইসব ছেলে-মেয়ে ও শিশুরা স্কুলে যেতে ও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সখীপুর

এলাকায় ইভটিজিং চিরতরে বন্ধে কাজ করছি : আরিফা সিদ্দিকা
আরিফা সিদ্দিকা প্রশাসনের ৩০তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হন। চলতি বছরের ৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ধনবাড়ীতে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধ ও সমাজ থেকে ইভটিজিং দূর করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। আর এসব কাজে সবাই তাকে সহযোগিতা করছেন। পাশাপাশি তিনি উপজেলার শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আরিফা সিদ্দিকা বলেন, আমি নিজেকে একজন নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেই দেখি। তাই মাদক নির্মূল, বাল্যবিয়ে বন্ধ ও ইভটিজিং প্রতিরোধে পুলিশের সহায়তায় ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমি একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছি।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মেয়ে আরিফা সিদ্দিকী দুই বোনের মধ্যে বড়। বাবা মো. শামছুল আলম ভুইয়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ধনবাড়ী

শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হলেই মানুষ উন্নত হবে : শামছুন নাহান স্বপ্না
উপজেলা নির্বাহী হওয়ার পেছনে আমার বাবার অবদান বেশি। আমার বাবা জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন বললেন প্রশাসনের ৩০তম বিসিএসে উত্তীর্ণ শামছুন নাহান স্বপ্না। শিক্ষার হার বৃদ্ধি, বাল্যবিয়ে বন্ধ ও মাদক নির্মূলকে লক্ষ্য করেই তিনি ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন। এই তিনটি কাজের মধ্যে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষার হার বৃদ্ধি করাকে। কারণ শিক্ষার উন্নতি হলে মানুষ উন্নত হবে। আর এতে সমাজ উন্নত হবে। তিনি সুযোগ পেলেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান। তাদের খোঁজখবর নেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বাসাইল

পেশাজীবীদের সমস্যা ও মাদক নির্মূলে কাজ করছি : দিলরুবা শারমিন
চাকরিজীবী মেয়েরা একজন নারী ইউএনও এর কাছে নিঃসঙ্কোচে তাদের সমস্যা তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু একজন ছেলে ইউএনও এর কাছে তারা তা পারেন না। এ কারণে আমিও তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলি। তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি বললেন প্রশাসনের ২৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা শারমিন।
দায়িত্ব পালন কালে কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয় এ প্রসঙ্গে গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা শারমিন বলেন, অনেক সময় বাল্যবিয়ে হচ্ছে বা মাদক নির্মূলে অভিযানের জন্য গভীর রাতেও আমাকে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় ঘটনাস্থলে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে হেঁটেই যেতে হয়। তবুও আমার কোনো ভয় করে না। কারণ এটা আমার দায়িত্ব। আর এ দায়িত্ব পালন করতে সবাই আমাকে সহযোগিতা করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, গোপালপুর উপজেলা

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি : শাহীনা আক্তার
কালিহাতী উপজেলায় বড় সমস্যা বাল্যবিয়ে। এ কারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা। পাশাপাশি এই উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এটিও বন্ধে কাজ করছি। গত এক মাসে পাঁচটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। কয়েকটি স্থানে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করেছি। তবে এই বালু উত্তোলন করতে কিছুটা বাধার সন্মুখীন হলেও পরবর্তীতে নিজস্ব কৌশলে তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি বললেন প্রশাসনের ২৭তম বিসিএস ক্যাডারে উত্তীর্ণ শাহীনা আক্তার।
শাহীনা আক্তারের বাড়ি ময়মনসিংহের সদর উপজেলায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কালিহাতী