ট্রাম্পের অদৃশ্য ইমিগ্রেশন দেয়াল

মঈনুদ্দীন নাসের : দৃশ্যমান দেয়াল উত্তোলন করা না হলেও ট্রাম্প প্রশাসন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে ইমিগ্র্যান্টের বিরুদ্ধে অদৃশ্য দেয়াল রচনা করেছে। বিনা ইটের এ দেয়াল যেমন একদিকে অবৈধদের এদেশে আসাকে নির্মমভাবে কঠোর করেছে, তেমনি বৈধ অভিসানকেও ক্রমাগতভাবে সংকুচিত করেছে। পরিবার বিচ্ছিন্নকরণ ও রিফিউজি পলিসির পরিবর্তনের মাধ্যমে রিফিউজি গ্রহণ কমানোর নীতি ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি প্রচার হয়েছে। দীর্ঘদিনের ইমিগ্রেশন নীতিকে ঝালাই করা হয়েছে ইমিগ্র্যান্টদের নিরুৎসাহিত করার জন্য। আর এই নীতির মাধ্যমে যে সব ব্যবসা বা কৃষিখামার বিদেশি দক্ষ শ্রমিক বা কর্মীর ওপর নির্ভরশীল ছিল তাদেও কর্মী নিয়োগ করা যেমন কঠিন করেছে তেমনি বিদেশি লোকদের এদেশে জীবনধারণ ও কাজ চালানো দুরূহ করে তুলেছে।
কাজের স্থানে বিধি পালন
বিগত কয়েক মাসে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কাজের স্থানে হানা দেয়ার মাধ্যমে অবৈধ শ্রমিক ধরার তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এটর্নিরা, প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সন্দেহ করছে যে, নিয়োগ বৈধতা যাচাই বা আই-৯ বিধি প্রয়োগ করার কাজ হাতে নিয়েছে আইসিই। কিন্তু কার্যত তা চারগুণ বৃদ্ধি করেছে। আইসিই ৩৫১০ ওয়ার্কসাইট অনুসন্ধান করেছে আর তারমধ্যে অক্টোবর ২০১৭ থেকে মে ২০১৮ পর্যন্ত ২২৮১টি আই-৯ অডিট পরিচালনা করেছে। এই সংখ্যা পূর্ববর্তী অর্থ বছরের একই সময়ের চাইতে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি। আইসিইর ভবিষ্যতে ১৫,০০০ আই-৯ বা নিয়োগ বৈধতা যাচাইয়ের কাজ করার এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। আর এই নিয়োগ বৈধতা যাচাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগকারী মালিকদের বহু খরচার মধ্যে ঠেলে দেখা হয়েছে । কারণ প্রতিটি আই-৯ ভায়োলেশনের জন্য নিয়োগকর্তাদের ১৫০০ ডলার করে জরিমানা করা হয়। কৌশলগত ভায়োলেশন বা টেকনিক্যাল ভায়োলেশন, যেমন ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু কর্তৃপক্ষ যদি পেনসিলভানিয়া হয় তাহলে লিখতে হবে ‘পি-এ ডিএমভি’ নিউইর্য়ক হলে লিখতে হবে ‘এনওয়াই ডিএমভি’। কিন্তু এদস্থলে যদি ‘পেনসিলভানিয়া’ বা ‘নিউইয়র্ক’ লেখা হয় তাহলে ফাইন ধরা হবে।
দেখা গেছে, এপার্টমেন্ট নাম্বার উল্লেখ না করে ঘর খালি রাখার জন্য ফাইন করা হয়েছে। খালি ঘরে লিখতে হবে ‘এন-এ’। বিষয়গুলো সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু যখন শত শত ফরম আই-৯ হিসেব করা হয় তখন তা অনেক বেশি মনে হবে। সোশ্যাল সিকিউরিটি প্রশাসনও এখন বাধ্যবাধকতা বাড়াচ্ছে। ছয় বছর আগে পরিত্যক্ত বিধি আবার চালু করে এসএসএ রেকর্ডের সাথে ট্যাক্স ডকুমেন্ট না মিললে এমপ্লয়ারকে ইস্যু করা হচ্ছে ‘নো-ম্যাচ’ বা ‘মিল না পাওয়ার’ লেটার। যদি নিয়োগকর্তা ৬০ দিনের মধ্যে এ ভুল না শোধরায় তাদেরকে আইআরএস জরিমানা করতে পারে। আইআরএস সরকারের আরেক এজেন্সি বা মালিকদের কাজকে অর্থাৎ তাদের কর্মচারী ব্যবস্থাপনাকে কঠোরতর করছে। যখন তাদের ইচ্ছা হচ্ছে অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের ছেকে বের করা, সেখানে মিস ম্যাচ ‘মিল নেই’ চিঠি বস্তুত আমেরিকান সিটিজেনদের জন্য সমস্যা বেশি সৃষ্টি করছে। আর তারা যদি নাম পরিবর্তন করে অথবা প্রশাসনিক কোন ভুলের সম্মুখীন হয়। তাহলে নিয়ত তারা সমস্যায় পড়ছে।
ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া
এই গ্রীষ্মে ইউএস সিটিজেনশীপ ও ইমিগ্রেশন সার্ভিস (ইউএসসিআইএস) এক নতুন পলিসি জারি করেছে যে, তারা ইমিগ্রেশন বিষয়ক যে কোন আবেদন কোন এভিডেন্সের অনুরোধ না করে অথবা কোন প্রকার ইনটেন্ট টু ডিনাই বা ‘বাতিল করতে ইচ্ছুক’ এ ধরনের কোন চিঠি না দিয়ে সরাসরি বাতিল করে দিতে পারবে। ইতিপূর্বে ইউএসসিআইএস বা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ যাতে নিয়োগকর্তা বা ইমিগ্র্যান্টদের বড় ধরনের কোন ক্ষতি না হয় সে জন্য কোন ভুল হলে বা কোন রেকর্ড শুদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করত। যেখানে আগেও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের যে কোন মামলা সরাসরি বাতিলের ক্ষমতা ছিল তারা তা ব্যবহার করতো না। এই নতুন পলিসি সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা ও কোন ব্যক্তিকে সম্পূরক আবেদন বা সামান্য ভুলভ্রান্তি ঠিক করার সুযোগ দেবে না। আর এ ধরনের কোন আবেদন নাকচ হলে তাতে আবেদনকারী আমেরিকায় অবৈধ হয়ে যেতে পারে। তাতে যথাশিগগিরই তাকে বহিষ্কার করা হতে পারে। এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে আমেরিকায় নিয়ে আসতে পারবে না।
উপরোল্লিখিত নীতি ঘোষণার পূর্বেও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ব্যাপকভাবে এভিডেন্স দেয়ার অনুরোধও বাতিলের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছিল। এইচ ওয়ান বি ভিসার জন্য ওবামা প্রশাসনের শেষ ভাগে এভিডেন্সের অনুরোধ ছিল ১৭ শতাংশ। ২০১৭ সালের তৃতীয় কোয়ার্টারে তা ২৩ শতাংশে উন্নীত হয়। একই বছরের চতুর্থ কোয়ার্টারে তা ৬৯ শতাংশে উন্নীত হয় আর ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তা করা হয় ৭২ শতাংশে উন্নীত। এই ব্যাপক হারে সমন্বিতকরণ বাড়ালে হয়েছে নিয়োগকর্তারা যাতে বিদেশি শ্রমিকদের স্পন্সর করতে বোঝা মনে করেন। তাদের উদ্দেশ্য যাতে মালিকরা এইচ-ওয়ান বি ভিসাধারী শ্রমিকদের কথা ভুলে যায়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে তারা অনেক বেশি যোগ্য এবং সেখানে কোন আমেরিকান কর্মী তুলনাযোগ্য নয়।
গত ১ অক্টোবর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ একটি রিম্যুভাল প্রসিডিং শুরু করে যেখানে ‘নোটিশ টু এপিয়ার বা এনটিএ’ দেয়া হতো যখন কোন মামলা বাতিল করা হতো। ইউএসসি আইএস এই পলিসি প্রয়োগ করতে চেয়েছে ফ্রড, অপরাধ অথবা অবৈধ উপস্থিতির ক্ষেত্রে। কিন্তু বর্তমানে এজেন্সি সকল ক্ষেত্রে এনটিএ দিচ্ছে না। কিন্তু অনেক মামলায় তারা তা করেছে। এতে বিদেশি ন্যাশনাল শঙ্কিত হচ্ছে যে, তারা যেকোন সময় রিম্যুভাল প্রসিডিংয়ে পড়বে। বিদেশি ন্যাশনালরা, যখন রিম্যুভাল প্রসিডিং শুরু হয় তখন ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারে না। বরং তাদের ইমিগ্রান্ট কোর্টে উপস্থিত হতে হয়। এবং তাদের স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে অনুমতির প্রয়োজন হয়। আর তা এমনিতেই চাপে থাকা ইমিগ্রেশন কোর্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। আর এই ইমিগ্রেশন কোর্টে মামলার সংখ্যা এখন ১০ লাখের বেশি।
ইউএসসিআইএস এক নতুন রেগুলেশন প্রস্তাব করেছে যে, তা ব্যাপকভাবে পাবলিক চার্জে ফেলবে ইমিগ্র্যান্টদের। বর্তমানে ‘পাবলিক চার্জ’ বলতে যখন কোন ব্যক্তি তাদের আয়ের অর্ধেকেরও বেশি ক্যাশ আর সহায়তা হিসেবে পেয়ে থাকে তাকেই বলে থাকে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় যা এখনও পাকা হয়নি, এই সহায়তার মধ্যে মেডিকেইড, ফুডস্ট্যাম্প ও অন্যান্য বেনিফিটও ফেলবে। এই হিসেবে পাবলিক চার্জের একটি দিক। অন্যান্য বিষয়সমূহের মধ্যে রয়েছে, কোন ব্যক্তির বড় পরিবার আছে কিনা, তার কোন স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে কিনা বা কোন প্রাইভেট স্বাস্থ্য বীমা রয়েছে কিনা, বা তারা ১৮ বছরের কম বয়সী কিনা অথবা ৬৫ বছরের বেশি বয়সী কিনা। যদি তারা ‘পাবলিক চার্জে’ পড়ে (সরকারি অনুদান, দান নিয়ে থাকে বা সুবিধা পেয়ে থাকে) তাহলে তারা তারপরও ইমিগ্রেশন বেনিফিট পাবে। তবে তাদের ১০,০০০ ডলারের বন্ড দিতে হবে যদি ইমিগ্র্যান্ট সোশ্যাল সার্ভিস ব্যবহার করে থাকে।
এই বিধি অবশ্য প্রকাশিত গোপন তথ্যের চাইতে অনেক সহজ। আর তাতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি যদি আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী তার কোন সন্তানের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকে তাহলে সেই ব্যক্তিও জরিমানাভুক্ত হবেন। আর তাতে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে আমেরিকার সিটিজেন শিশুর জন্য প্রদত্ত কোন সুযোগ-সুবিধাও পরবর্তীতে ইমিগ্রেশনের ক্ষেত্রে ক্ষতি হতে পারে এই ভয়ে কোন ইমিগ্র্যান্ট তা গ্রহণ করবে না। যদিও এই সুযোগ আমেরিকার সিটিজেন শিশুর জন্য দেয়া।
কূটনীতিকদের সমকামী পার্টনার
বিদেশি ডিপ্লোম্যাটদের সমকামী পার্টনারদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর কোন ভিসা দেবে না। এই পলিসিতে বিদেশি কোন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত হবেন। যেমন সেক্স বা সমকামীদের বিয়ের প্রমাণ দিয়ে ‘স্পাউজেল’ ভিসায় আবেদন করতে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সালের মধ্যে প্রমাণ দাখিল করতে হবে স্টেট ডিপার্টমেন্টে। নতুবা তাদের আগামী বছর জানুয়ারির শেষ নাগাদ দেশত্যাগ করতে হবে।
বিশ্বে ২৫টি দেশ আছে যেখানে সমকামী বিয়ে স্বীকৃত ৭০টি দেশে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলে, এই ব্যবস্থা আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট যারা বিদেশে কাজ করে তাদের বেলায় যা, তাই করা হয়েছে। ‘এটা তুমি যা করছো আমিও তাই করবো নীতি।
এখন আইস, ইউএসসিআইএসও আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইমিগ্র্যান্টদের ক্ষেত্রে এক সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে। যা তেমন প্রকাশিত হয়নি, তবে ভেতরে ভেতরে অভিবাসীদের শির দাঁড়ায় তা ব্যথা শুরু করে দিয়েছে। তার ওপর রয়েছে, ট্রাভেল ব্যান, পরিবার পৃথকীকরণ, রিফিউজি কর্মসূচিতে রিফিউজি আনার সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো এবং অন্যান্য একই রকম পলিসি। আর দেখা যাচ্ছে এই প্রশাসন, দৃশ্যমান দেয়াল নির্মাণ তখনও শুরু না করলেও অদৃশ্য দেয়াল নির্মাণে এগিয়ে গেছে।
[এই লেখা মাইকেল জে মাডেরার লিখিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি]