ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন-বিরোধী কান্না সত্ত্বেও আমেরিকা এখনো ইমিগ্র্যান্টবান্ধব


ঠিকানা রিপোর্ট : দেয়াল দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইমিগ্রেশন ঠেকানোর ব্যবস্থার জন্য কান্নকাটি করলেও বস্তুত আমেরিকানরা অনেক বেশি অভিবাসীবান্ধব। আর সে কারণেই স্বদেশ থেকে হিজরত করতে চাওয়া অধিকাংশ লোক এখনও সর্বপ্রথম আমেরিকাকেই বেছে নেয়। আমেরিকা এখনও বিশ্বের সব লোকের জন্য প্রথম পছন্দের দেশ। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি লোক আসতে চায় প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রে।
গ্যাল আপ জরিপ সূত্রে ইকনোমিস্ট পত্রিকায় বরাত দিয়ে এক চার্টে বলা হয় আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্ট ১৫ কোটি, কানাডায় ৫ কোটিরও কম। জার্মানিতে ৪ কোটির মতো, ফ্রান্সে ৪ কোটির কম। অস্ট্রেলিয়ায় ফ্রান্সের সমান। ব্রিটেনে সাড়ে তিন কোটির মতো, সৌদি আরবে তারও কম, স্পেনে তিন কোটির মতো, জাপানে ২.৫ কোটির মতো, ইতালিতে ২.২৫ কোটির মতো, সুইজারল্যান্ডে ২.৪ কোটির মতো, ইউকেতে ২.৩ কোটির মতো, সিঙ্গাপুরে ২.২ কোটির মতো, চীনেও সিঙ্গাপুরের সমান, নিউজিল্যান্ডে ২.২ কোটির মতো, রাশিয়ার ২.১ কোটির মতো, নেদারল্যান্ডস ও সাউথ আফ্রিকায় ২ কোটির মতো, ব্রাজিলে ১.৯ কোটির মতো।
অন্যদিকে আনুপাতিক হারে বেশি ইমিগ্র্যান্ট নিচ্ছে আইসল্যান্ড, ৮.২ শতাংশ। তারপর নিউজিল্যান্ড ৮.২ শতাংশ, রোয়ান্ডার অবস্থান তারও কম। কানাডা ও সিয়েরালিওন তার কম, মালির অবস্থান সিরেয়া লিওনের কাছাকাছি ৮ শতাংশের কিছু বেশি। অস্ট্রেলিয়া প্রায় ৮ শতাংশ, সুইডেন ৭.৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রও প্রায় সুইডেনের সমান, নাইজেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পরে। তারপর আয়ারল্যান্ড, বুরকিনা ফাসো, নরওয়ে, আইভরিকোস্টে ওবেনীন এসব ৭.৭ শতাংশ গ্রহণ করে। লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ড, বাংলাদেশ, স্পেন এসব দেশ ৭.৫ এর কাছাকাছি আর চাদ গ্রহণ করে ৭.৩ শতাংশ।
গত ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর সেফ, অর্ডারলি অ্যান্ড রেগুলার মাইগ্রেশন রিপোর্ট গ্রহণ করে। ৩৪ পৃষ্ঠার এই রিপোর্ট যদিও সদস্যদের ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, কিন্তু রিপোর্টে ইমিগ্র্যান্টদের মানবিকতার সাথে আচরণ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে তথ্য সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। এবং তাদের সমাজে স্বাগত জানানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বছর পূর্বে এই কমপ্যাক্ট নিয়ে দর কষাকষি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা করে জাতিসংঘে তার রাষ্ট্রদূত সেই সময়ের নেকি হেলি বলেছিলেন, আমেরিকান ইমিগ্রেশন নীতি অবশ্যই একমাত্র আমেরিকান ও আমেরিকানরাই একাকী তৈরি করবেন। জুলাই পর্যন্ত যখন কম্প্যাক্ট এর চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হয়, আমেরিকা ১৯৩ সদস্যের মধ্যে একমাত্র দেশ যারা তা বর্জন করেছে। তারপর থেকে অন্যান্য সরকার ট্রাম্পের নেতৃত্ব অনুসরণ করে। মরক্কোতে গত ১০ ডিসেম্বর সম্মেলনে এ নিয়ে অনুপস্থিত ছিল কয়েকটি ধনী দেশ যার মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড ও ইসরায়েল। তারপর কয়েকটি ইস্ট ইউরোপীয় দেশ যেমন, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিকান ও বুলগেরিয়া অনুপস্থিত ছিল।
তাদের অনুপস্থিতি অনেকটা লজ্জাজনক। কারণ তারা কঠোর দেয়াল নিয়ে স্বদেশে ব্যস্ত। কমপ্যাক্ট অবশ্য সবচেয়ে ভালো কিছু না, আর এই কমপ্যাক্ট অনেকটা দ্ব্যর্থবোধক। তারা কীভাবে অনেক ইস্যু নিয়ে একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক করতে চায়? ইমিগ্রেশনকে স্থানীয়দের কাছে সুখকর করার কোনো মেন্যু দেয়নি বা কোনো মৌলিক সমাধান দেয়নি। (যেমন ইমিগ্রেশনদের আয়ের ওপর অতিরিক্ত কর যা অনেকেই অধিক ইমিগ্রেশন দেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে- এদের মধ্যে ইকনোমিস্ট পত্রিকাও রয়েছে।) কিন্তু তা কতিপয় ভালো সংবেদনশীল পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে সকল ইমিগ্র্যান্টের কোন প্রকার বৈধ পরিচয়পত্র আনতে হবে। তাদের এন্ট্রি রিকোয়ারমেন্ট হিসেবে পরিচয়পত্র থাকতে হবে। তাদের দক্ষতা কী তা জানতে হবে। সম্ভব হলে তাদের ডিটেনশন সেন্টারের বাইরে রাখতে হবে। সর্বোপরি কমপ্যাক্টে বলা হয় যে, সরকারসমূহের সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে সীমান্তে তাদের নিয়ন্ত্রণ উন্নত করা আর সে জন্য একত্রে কাজ করা।
এরমধ্যে আশ্চর্য হচ্ছে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মাইগ্র্যান্টদের যেভাবে হেনস্তা করে গ্লোবালিজম বা ভূবনায়নকে কটাক্ষ করে তাকে এই রিপোর্টে আমেরিকার মাইগ্র্যান্ট সম্পর্কে তার বক্তব্যকে নিন্দা করা হয়নি। গ্যালাপ জরিপে দেখা যায়, ১৫৮ মিলিয়ন লোক সুযোগ পেলে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বাস করতে চাইবে। আর যারা আমেরিকাকে তাদের প্রথম পছন্দের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছে তাদের সংখ্যা ২০১০ থেকে একই রকম রয়ে গেছে।
অধিকন্তু আমেরিকানরা বিদেশিদের কাছে সব সময় বন্ধুত্বপূর্ণ রয়েছে। এই বছর গ্যালাপ রিপোর্ট করেছে যে, রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৭৫ শতাংশ চিন্তা করে যে, ইমিগ্রেশন আমেরিকার জন্য ভালো। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৬ শতাংশ। আমেরিকায় দেখা গেছে মানুষ বিদেশিদের সাথে একসাথে থাকতে চায়। আর এদিক থেকে আমেরিকার স্থান নবমে। বর্তমান প্রশাসন সম্ভবত বুঝবে না। কিন্তু যদি মাইগ্র্যান্ট একসেপট্যান্স চলতে থাকে তখন ভবিষ্যতে আমেরিকার কোন প্রেসিডেন্ট তা সই করবে।