ট্রাম্পের নয়া ঘোষণাও মামলায় হোঁচট খাচ্ছে

৩৮২০০০ স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্ট আবেদন পর্যালোচিত হবে

মঈনুদ্দীন নাসের: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন গত ১২ আগস্ট সোমবার এমন এক বিধান জারি করেছে, যা বাস্তবায়ন করা হলে আমেরিকায় বৈধ ইমিগ্র্যান্ট জনসংখ্যা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হবে। তবে এবারও তার এই বিধান মামলায় পড়ে হোঁচট খেতে চলেছে।
দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর পাবলিক চার্জ অর্থাৎ সরকারি-ভান্ডার নির্ভরতার বিধি যেভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ করেছে, তাতে ইমিগ্র্যান্টরা সরকারি সহায়তা, যেমন- মেডিকেইড, ভর্তুকি প্রদত্ত বাসস্থান এবং ফুডস্টাম্প যারা গ্রহণ করে, তাদের বৈধ স্ট্যাটাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। রিফিউজি বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা এ বিধির আওতা-বর্হিভূত বলে সিএনএন জানিয়েছে।
১২ আগস্ট সোমবারের ঘোষণা প্রশাসনের বৈধ ইমিগ্র্যান্ট নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস। আর তাতে ধনী ও শিক্ষিত ইমিগ্র্যান্টদের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করা হবে। এ বিধি বাস্তবায়ন করা হবে আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে। তবে ইতিমধ্যে ১৩টি স্টেট ও মিশিগানের অ্যাটর্নি জেনারেল ডানা নেসল জনগণের পক্ষ থেকে এ বিধির বিরুদ্ধে মামলা করে দিয়েছে। অপর ১৩টি রাজ্য হলো ওয়াশিংটন, ভার্জিনিয়া, কলরাডো, ডেলাওয়ার, ইলিনয়, ম্যারিল্যান্ড, ম্যাসাচুসেটস, মিনেসোটা, নেভাদা, নিউজার্সি, নিউ মেক্সিকো ও রোড আইল্যান্ড।
এ বিধি তাদের ওপর প্রয়োগ হবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে আসতে চায় বা যুক্তরাষ্ট্রে এসে থেকে যেতে চায়। যেমন যারা বৈধভাবে এ দেশে থাকতে চায়, তাদেরকে এ বিধান ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পাবলিক চার্জ বা সরকারি ভান্ডার থেকে সাহায্য নেওয়ার নিয়মকানুন ১৮৮২ সালের ইমিগ্রেশন আইন থেকে চালু রয়েছে। সে সময় ফেডারেল আইন প্রণেতারা চেয়েছিলেন, যাতে ইমিগ্র্যান্টরা নিজেদের ব্যয়ভার নিজেরা বহন করতে পারে। আর তারা যাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে। বর্তমানে চালু বিধি, যা ১৯৯৬ সালে করা হয়েছে, তাতে সংজ্ঞায়িত করা হয় যে, কেউ যদি প্রথমে সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, তার মানে সরকার অন্তত তাদের আয়ের অর্ধেক সরবরাহ করবে।
কিন্তু তাতে শুধু ক্যাশ বেনিফিট, যেমন অভাবী পরিবারের জন্য অস্থায়ী সহায়তা অথবা সোশ্যাল সিকিউরিটি থেকে সাপ্লিমেন্টাল সিকিউরিটি ইনকাম বা ভর্তুকি আয়, বেনিফিট, ফুড স্ট্যাম্প ও হাউজিং ভাউচার অন্তর্ভুক্ত। এসব যারা গ্রহণ করে তাদের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে জরুরি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স, দুর্যোগ রিলিফ, জাতীয় স্কুল লাঞ্চ কর্মসূচি, শিশুদের স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি এবং ফুড প্যান্ট্রিস ও বাস্তুহীনদের বাসস্থান অন্তর্ভুক্ত হয়নি বা এসব সুযোগ গ্রহণকারীদের ইমিগ্রেশন সুযোগবঞ্চিত করা হয়নি।
এ বিধির মধ্যে যেসব ইমিগ্র্যান্ট বিগত ৩৬ মাসের মধ্যে ১২ মাস সরকারি সুযোগের মধ্যে এক বা একাধিক সুযোগ নিয়েছে, তাদের ইমিগ্রেশন বেনিফিট বঞ্চিত করা হবে না। প্রত্যেক বেনিফিট পৃথকভাবে কাউন্ট করা হবে। অর্থাৎ দুটি বেনিফিট গ্রহণ করা হলে এক মাসে তা দুই মাস গ্রহণ করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
এই বিধান কত মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে- তার হিসাব-নিকাশ করা কঠিন। কারণ এ সুবিধা বা সুবিধা কর্তন বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তার মর্জির ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ যে কর্মকর্তা হিসাব করবে, কোনো ব্যক্তি আসলে পাবলিক চার্জ বা সরকারি ভান্ডার থেকে সাহায্য-সুবিধা নিয়েছে কি না।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অবশ্য অনুমান করেছে, কমবেশি ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ, যারা ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্ট বা সমন্বিত করতে চায়, তাদের আবেদন প্রভাবিত হবে। ইমিগ্রেশনের পক্ষ প্রচারকারীরা অবশ্য বলেন, মিলিয়ন মিলিয়ন লোক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইমিগ্রেশন অ্যাডভোকেসি গ্রুপ যুক্তি দেখিয়েছে, এই বিধি কংগ্রেসের ইচ্ছার পরিপন্থী। আর তা গরিব দেশ থেকে আগতদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে বেশি। এ আইন পরিবার বিচ্ছিন্ন করে রাখবে এবং তা বৈধ রেসিডেন্টকে সরকারি সাহায্য না নিতে বাধ্য করবে। আর তা আমেরিকার সিটিজেনদেরও প্রভাবিত করবে।
সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিসের প্রেসিডেন্ট রবার্ট গ্রিন স্টোটন বলেন, এ বিধি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্রী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। এ দেশ ইমিগ্র্যান্টদের জন্য আর সুযোগের দেশ নয়। আর এ দেশ চায় যেসব লোক তাদের পরিবারের সাথে যোগ দিতে চায়, তাদের বাইরে রাখতে। যারা কঠোর পরিশ্রম করতে চায় এবং অর্থনৈতিক সিঁড়ি পাড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে চায়, তাদের দমিয়ে রাখতে। আর সে জন্য তারা এক ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে বলেছে, তারা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে না এবং আমাদের জাতীয় ক্ষেত্রে অবদান রাখবে না। তবে ইমিগ্রেশন বিভাগ বলেছে, এ বেনিফিট নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার নাগরিক শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করবে না।
এ বিধিতে ব্যতিক্রম রয়েছে। এ ব্যতিক্রম সক্রিয় ডিউটিতে থাকা সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং তাদের স্ত্রী-সন্তান, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য মেডিকেইড এবং ২১ বছরের কম বয়সী লোক ও ইমার্জেন্সি মেডিকেল কেয়ারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সিএনএনের রিপোর্টে বলা হয়, এ বিধি অবশ্য রিফিউজি বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এটা ট্রাফিকিং ভিকটিম, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স ভিকটিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়।
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, নেটিভ আমেরিকানদের চেয়ে ইমিগ্র্যান্টরা অনেক কম সুবিধা নিয়ে থাকে।
২০১৪ সালের সেনসাস ব্যুরো ডাটায় দেখা গেছে, অনাগরিক ৬৩ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি কল্যাণ কর্মসূচি ব্যবহার করা হয়। আর নেটিভদের চাইতে অনাগরিক পরিবার খাদ্য কর্মসূচি বেশি ব্যবহার করে। নেটিভ-অনাগরিক অনুপাত এ ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ বনাম ২১ শতাংশ, মেডিকেইড ৫০ শতাংশ বনাম ২৩ শতাংশ।
নিউইয়র্ক সিটির বিধি নিয়ে বক্তব্য : নিউইয়র্ক সিটি কমিশনার বিটা মোস্টকি এক বিবৃতিতে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন পাবলিক চার্জ বিধি দিয়ে আবার ভয় দেখাতে চায়। তারা কর্মরত ইমিগ্র্যান্টদের উদ্বেগ বাড়াতে চায়, কিন্তু কমিশনার সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন, নিউইয়র্কাররা অকুতোভয় যোদ্ধা এবং সিটি আমাদের ক্ষমতার মধ্যে সবকিছু করবে।
যদি আপনাদের কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে ৩১১-এ অ্যাকশন এনওয়াইসি বা ৮০০-৩৫৪-০৩৬৫-এ কল করুন। তা ছাড়া ইমিগ্র্যান্টরা ৯১৭-৮৬২-০৫১৪ নম্বরেও যোগাযোগ করতে পারেন।