ট্রাম্প আমেরিকাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, তার হাতে আমেরিকার ভবিষ্যত কী- এসব প্রশ্ন এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই উড়াউড়ি করছে না, বহির্বিশ্বেও উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের নিজের বিরুদ্ধে যতো বেশি বিয়েবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের অভিযোগ উঠছে, তার প্রেসিডেন্সির অবস্থা যতো বেশি টালমাটাল হচ্ছে, ঘরে-বাইরে যখন তার বিরুদ্ধে অশান্তির হাওয়া বইছে, তার আচরণ যেন ততই অসংলগ্ন এবং আমেরিকার জন্য শনিরদশা সৃষ্টি করতে চলেছে।
সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তুলে যে নজিরবিহীন ভয়াবহ মিসাইল হামলা আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স যৌথভাবে চালাচ্ছে, তা নিয়ে অনেকেরই মন্তব্য- যৌন কেলেঙ্কারি নিয়ে নিজের নাজেহাল অবস্থা থেকে স্বস্তি পেতে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতেই নাকি সিরিয়ায় এই যৌথ মিসাইল আক্রমণ। যদিও সিরিয়ার দিক থেকে দাবি করা হচ্ছে রাশিয়ার সহায়তায় আমেরিকার অধিকাংশ মিসাইল হামলা আকাশেই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আসলে এই হামলা নিয়ে আরো কথা রয়েছে। এই হামলা সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনীর পক্ষে। এই বিদ্রোহীরা কারা এবং তারা কাদের সৃষ্টি? নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন এভাবেই অনেক সত্য নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মন্তব্য, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি করা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার যৌন কেলেঙ্কারির হাত থেকে পরিত্রাণ পাবেন বলে মনে করা যায় না। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আরো যে কতো সাপ বের হয়ে পড়ে, কে জানে? কোন সুন্দরী মেয়েই তার সংস্পর্শে এসে রক্ষা পেয়েছে বলে কেউ মনে করতে পারন না। এ দিকে মিডিয়া এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর সমর্থক, সহকর্মীরাও এখন তার নানা কেলেঙ্কারি-দুর্নীতির সন্ধান এবং তা প্রকাশ করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা মনে করছেন, নির্বাচনে রাশিয়া কানেকশন ট্রাম্পের জন্য যতটা না শঙ্কার, তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াবে তাঁর যৌন কেলেঙ্কারি। এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্সির জন্য তা কী পরিণতি বয়ে আনবে, তা বলা মুশকিল হলেও সে পরিণতি অন্তত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য খুব সুখকর হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো তাঁর অর্থবিত্ত, বা অন্য কোন শক্তির ব্যবহারে অনেকের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন; কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, ততই যেনো সব কিছুর উপর থেকে তাঁর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ছে। আজকের সময়ে এ প্রবাদ অনেকটাই সত্য বলে মেনে নেয়া হয় যে, ‘টাকা খরচ করলে বাঘের চোখ মেলে।’ কিন্তু অর্থ যে সব সময় সর্বত্র একই ফল দেবে, সেটা মনে করারও কারণ নেই। অর্থ অনেক সময় অনর্থেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সত্য ঢাকা দিয়ে মিথ্যাকে সত্য বলে প্রকাশের ক্ষেত্রে। সত্য নিজের শক্তিতেই মাথা তুলে দাঁড়ায়। সত্যের কাছে তাই অর্থের শক্তি শুধু নয়, অন্ধকারের সকল শক্তিই পরাভূত হয়।
আজ ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয় এবং তৎপরবর্তী আমেরিকার অভ্যন্তরীণ এবং বিশ্ব পরিস্থিতি যার জন্য দায়ী ট্রাম্পের নৈতিক এবং আদর্শিক স্খলন, সেদিকে তাকিয়ে এ কথা বলা খুব অপ্রাসঙ্গিক এবং অসঙ্গত মনে হবে না যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যারা পপুলার ভোটে বিপুল ব্যবধানে হেরেও ইলেক্টোরাল ভোটে জয়ী হয়ে নির্বাচিত হন, তারাই আমেরিকার জন্য এবং বিশ্ববাসীর জন্যও বিপর্যয় ঘটিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়র এবং প্রেসিডন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাম্প্রতিক সময়ে এই দুইজনের ক্ষেত্রেই একই পরিণতি লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়রের নৈতিক স্খলন নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও নাইন ইলেভেন পরবর্তী আফগানিস্তান-ইরাকে মিত্র বাহিনীর অভিযানে বুশের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। এবং সে কারণে আমেরিকার জনগণ এবং বিশ্ববাসীকে যে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবেলা করতে হয়েছে, ট্রাম্পের আমলেও এবার আমেরিকাসহ বিশ্ববাসীকে অনুরূপ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০১৬ সালের নভেম্বরে পপুলার ভোটে হেরেও ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইলেক্টোরাল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন থেকেই শুধু আমেরিকানরা নয়, বিশ্বের সব মানুষ ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়’এর মতো প্রমাদ গুণতে শুরু করে। তখন থেকেই সবাই যেন একটা অমঙ্গল বার্তা পেয়ে যায় বুশ জুনিয়রের আমলের অঘটনের মতো। তার প্রথম সূচনা হয় ২০১৭ এর ১৯ জানুয়ারি শপথ নিয়ে প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব পালন শুরু করতে না করতেই সকলের আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে দেখা যায়। ১ বছর ৩ মাসেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মকা- এমনভাবে দেখা যায় যে, সকলের মনেই প্রশ্ন ধাক্কা মারতে শুরু করে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকা এবং একই সঙ্গে বিশ্বকে আসলে কোথায় নিয়ে যেতে চান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু করেছিলেন সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করে তাদের আমেরিকা ভ্রমণ নিষেধ কওে দেন। এরপর তার নির্বাহী আদেশের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। মুসলিম ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী কার্যক্রম বিদ্বেষে রূপ নিতে শুরু করে। আদালতের রায়েও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিবৃত্ত করা যায় না। আদালতের রায়ে যত নিষেধাজ্ঞা আসে, তত তিনি নির্বাহী আদেশ জারি করতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাচনী অঙ্গিকারের বাইরেও এমন কিছু কথাবার্তা বলতে থাকেন এবং এমন কিছু সিদ্ধান্তও নিতে থাকেন, যাতে কেবল অবৈধ অভিবাসীই নয়, বৈধভাবে এ দেশে বাস করছেন, গ্রিনকার্ড আছে, এ দেশের নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট রয়েছে এমন মানুষজনও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং সে আতঙ্ক ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তার ক্ষমতাবলে কখন কী করে বসেন সেই আতঙ্কে আমেরিকাজুড়েই একটা অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী মেক্সিকোর সীমান্ত দিয়ে মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে সেখানে প্রাচীর তুলতে চান। কিন্তু সে প্রাচীর নির্মাণের জন্য অর্থ যোগাতে হবে মেক্সিকোর। অসঙ্গতিরও একটা সীমা থাকে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেই শুধু সন্দেহ-অবিশ্বাসের একটা জায়গা তৈরি করছেন না, আমেরিকার অভ্যন্তরেও বিভিন্ন স্টেট, বিশেষ করে যেসব স্টেট ‘ইমিগ্র্যান্ট অভয়ারণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ দেখাতে শুরু করে।
আমেরিকার প্রশাসনকে বিশ্বের সেরা প্রশাসন মনে করা হয়। আমেরিকার যে শক্তি, রাষ্ট্র পরিচালনার যে দক্ষতা, বিশ্বের সবাই জানে তার কৃতিত্ব মূলতঃ আমেরিকার প্রশাসনের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই প্রশাসনকে নিয়েও টানাহ্যাঁচড়া শুরু করেছেন। সিআইএ, এফবিআই থেকে শুরু করে ফরেন সেক্রেটারি, ডিফেন্স সেক্রেটারি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা, তাঁর মিডিয়া টিমের মধ্যে কখন যে কাকে বিদায় করে দেন, আর কাকে নিয়োগ দেন, তা নিয়েও সার্বক্ষণিক একটা অস্থিরতা। আসলে তিনি যে কাকে বিশ্বাস করেন, কাকে অবিশ্বাস করেন, কারও পক্ষেই সে নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। এ রকম পরিবেশের মধ্যে কারো পক্ষেই দক্ষতা, মেধা, প্রজ্ঞার প্রকাশ সম্ভব হতে পারে না। হচ্ছে বলেও অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন না।
এ রকম এক পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ পাচ্ছে নারী সম্পর্কিত নানা অভিযোগ। আসলে কত নারীর সঙ্গে যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। অর্থ দিয়ে এতদিন অনেকের মুখ বন্ধ রাখা সম্ভব হলেও সব দিকে অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় এখন অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছে। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অধিকাংশ মিডিয়াকেও খেপিয়ে তোলার কারণে- তারাও অনেক গোপন খবর তুলে আনছে। এক সময় মনে করা হতো আমেরিকা ওপেন সোসাইটির দেশ হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অনেক কিছু সহজে মেনে নেয়া হলেও, যারা দেশ চালাবেন, যারা জনপ্রতিনিধি তাদের নৈতিক এবং চারিত্রিক কোন স্খলন মেনে নেয়া হয় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নারী সংক্রান্ত যে রকম অভিযোগ উঠছে একটার পর একটা এবং তারপরও তাঁর কথাবার্তা, কর্মকা-ে কোন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না, তাতে আমেরিকার সেই প্রচলিত ধারণা আর টিকবে বলে মনে হয় না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন- এ প্রশ্নের উত্তর কারও জানা না থাকলেও এ ধারণা অনেকেই পোষণ করে যে, তিনি যদি তাঁর নারী কেলেঙ্কারী থেকে মানুষের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য সিরিয়ায় মিসাইল হামলা শুরু করে থাকেন এবং আরো কোথাও যুদ্ধ বাঁধানোর পরিকল্পনা থাকে- তাতেও তিনি শেষ বিচারে উদ্ধার পাবেন মনে করার কোন কারণ নেই। মিসাইল দিয়ে সিরিয়া ধ্বংস করে দিতে পারেন- ইরাকের মতো, যুদ্ধ বাঁধিয়ে মানুষ মারতে পারেন। তাতে তার অপরাধই বাড়বে। একটা অন্যায় দিয়ে আরেকটা অন্যায় ঢাকা দেয়া যায় না। হয়তো অনেকের ভাগ্য বদলাবে যুদ্ধের কারণে, অনেকের ভাগ্যও পুড়বে কিন্তু।
মনে রাখা দরকার যে, এই আমেরিকাতেও গৃহহীন, কর্মহীন, খাদ্যহীন মানুষ আছে। সেই সঙ্গে আছে মানবিকতায়, শান্তি ও সভ্যতায় বিশ্বাসী মানুষ। সেই গৃহহীন, খাদ্যহীন সাধারণ মানুষের গায়ে যেমন সকল সংকটের আঁচ লাগে, তেমনি মানবিক মানুষের অনুভবে টোকা দিয়ে তাদেরকেও বিদ্রোহী করে তোলে। সেই সব মানুষকে অতীতের সব যুদ্ধ, অন্যায়-অবিচারে বিরুদ্ধ সোচ্চার হতে দেখা গেছে।
তাই অন্যায় দিয়ে অন্যায় ঢাকার চেষ্টা না করে প্রেসিডেন্ট যদি তার সঠিক কর্তব্য পালনে ব্রতী হন, তবেই আমেরিকার মঙ্গল হবে। আমেরিকা সঠিক পথে চলতে থাকলে, আমেরিকা কোথায় চলেছে- সে প্রশ্নও মানুষের মন থেকে দূর হবে।