ট্রাম্প-উন আসন্ন বৈঠক: দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে চান ট্রাম্প

ঠিকানা ডেস্ক : প্রথম বৈঠক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় বৈঠকে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে মনোযোগী হয়েছেন। তাঁর বিশেষ আগ্রহের কারণেই বৈঠকের আগেই একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং একটি শান্তিচুক্তির ঘোষণা। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সেনা কমিয়ে নেওয়া হতে পারে এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।

উনের সঙ্গে গত বছর জুন মাসে সিঙ্গাপুরে ট্রাম্পের ঐতিহাসিক করমর্দনের পর ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে। এসব বৈঠকে পিয়ংইয়ংকে তাদের পরমাণু প্রকল্পে বাস্তবভিত্তিক ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দেয় ওয়াশিংটন। নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি নিয়ে চরম একগুঁয়েমিরও পরিচয় দেন। এবারের বৈঠকটি হবে আগামী মাসের শেষ দিকে। সম্ভবত ভিয়েতনামে।

তবে বৈঠকের অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্পের ওপর। এর আগেরবারের বৈঠকটিকে অনেকেই প্রতীকী হিসেবে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্প এই বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার ওপর নজর রাখছেন। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়াই কিমের প্রাথমিক লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি সফল হলে আকস্মিকভাবে তিনি পরমাণু প্রকল্প বন্ধও করে দিতে পারেন। বংশপরম্পরায় এই প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন উন। এমনকি দুর্ভিক্ষের সময়ও এর কাজ বন্ধ হয়নি।

সিউলের কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রেই ল্যাংকভ বলেন, দেশে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট তৈরির জন্য নিষেধাজ্ঞাগুলো আরোপ করা হয়নি। তবে এগুলোর জন্য যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ পিয়ংইয়ংয়ে লেখাপড়া করা এই অধ্যাপক আরো বলেন, ‘দেশে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য দক্ষিণ কোরিয়াকে অবশ্যই তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ করে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মুদ্রার মূল্যের যে পার্থক্য তা কমিয়ে আনতে হবে।’

এর আগের দফা বৈঠকের সময় পিয়ংইয়ং কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির লক্ষ্যে একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি করার আহ্বান জানায়। ১৯৫০-৫৩ পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধ একটি অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে ইতি টানা হয়। তাদের মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি নেই।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক ভিক্টর চা বলেন, শান্তির ঘোষণা প্রতীকী মাত্র। আমি মনে করি না এ ব্যাপারে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে। বৈরিতামুক্ত চুক্তি চাইতে পারে উত্তর কোরিয়া। আর এর নিদর্শন হিসেবে তারা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি তুলতেই পারে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অবশ্য জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া পরমাণু প্রকল্প না ছাড়া পর্যন্ত তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না। উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপ করা বহু নিষেধাজ্ঞাই দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি বা দুর্নীতিগ্রস্ত আইনের কারণে আরোপ করা, যা তুলে নিতে কংগ্রেসের স্বীকৃতির প্রয়োজন হবে এবং সেই স্বীকৃতি কংগ্রেস সহজে দেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে চা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করতে পারে। তা ছাড়া জাতিসংঘের সঙ্গেও কাজ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে উত্তর কোরিয়ায় তাদের চলমান প্রকল্পগুলো ফের চালু করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেও অবশ্য মানবিক ত্রাণ প্রদানের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু পরীক্ষা বন্ধ করার আহŸান জানিয়েছেন। উত্তর কোরিয়া সেই আহŸানে সাড়াও দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের মোট হিসাব জানতে আগ্রহী। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই হিসাব যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে চায় না পিয়ংইয়ং। বরং মেয়াদোত্তীর্ণ পরমাণু পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দিয়ে সক্ষমতা ধরে রাখাই তাদের লক্ষ্য।

বৈঠক এবার কেন ভিয়েতনামে

ফেব্রুয়ারির কোন এক দিনে দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। এরই মধ্যে উন তাঁর সভাসদদের ভালোভাবে এই শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম বলেছে, বৈঠকের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন দেশটির নেতা। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ওয়াশিংটনে দেখা করেন পিয়ংইয়ংয়ের প্রতিনিধি কিম ইয়ং চোল। বৈঠক শেষে দুই পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছিল, ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ দুই নেতার বৈঠক হতে পারে। তবে সিঙ্গাপুরের সেই প্রথম বৈঠকের পর দ্বিতীয় বৈঠকটি ঠিক কবে ও কোথায় হবে তা জানানো হয়নি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে। একারণে বৈঠকের সম্ভাব্য ভেন্যু ও তারিখ জানতে একরকম অভিযানে নামে বিশ্বের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলো। তারা হাড়ির খবর বের করে আনতে সক্ষমও হয়েছেন।

পশ্চিমা অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বলছেন, ট্রাম্প-কিম সম্মেলনের পরবর্তী ভেন্যু হবে ভিয়েতনাম। যদিও এই খবর প্রকাশের পর দেশটি বলেছে, কোন পক্ষ থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় তারা। এরপর আবার জানানো হয়, ট্রাম্প-কিম সম্মেলন আয়োজনে পুরোপুরি প্রস্তুত ভিয়েতনাম। ধারণা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় বৈঠকে কিম আরো পরিষ্কার পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন। যার মধ্যে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম, এমন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বয়কট করা। বিনিময়ে পিয়ংইয়ং চায় জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চিঠি চালাচালি হচ্ছে বলে জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ।