ট্রাম্প নিজেও ডুববে জাতিকেও ডোবাবে

এম. এস. হক : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন পুরোপুরি শাটডাউন কার্যকর না করায় আমেরিকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া প্রথম দফা সংক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই দ্বিতীয় দফা সংক্রমণে প্রশাসনসহ সর্বত্র বেসামাল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। ১৩ জুলাই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক এবং ইউএস সায়েন্টিফিকের প্রধান মুখপাত্র ড. অ্যান্থনি ফাউচি এসব কথা বলেছেন।
মূলত সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) পরিচালক ড. রবার্ট রেডফিল্ডের সাথে কোনো ধরনের সলাপরামর্শ ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউস একের পর এক স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নেন। ফলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের দূরত্ব বাড়ছে এবং পুরো আমেরিকাই করোনাভাইরাসের এপিক সেন্টারে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার মোট জনসংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার ৪ শতাংশ হলেও করোনায় মোট আক্রান্ত এবং মৃতদের ২৫ শতাংশই আমেরিকান।
করোনা সংক্রমণ প্রতিহতের মোক্ষম হাতিয়ার মাস্ক পরিধান এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বিষয়ক নির্বাহী আদেশ না দিয়েও ট্রাম্প করোনা সংক্রমণে উসকানি দিয়েছেন বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অভিযোগ। যদিও ওয়াল্টার রিড মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শনকালে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে মাস্ক পরিধান করেন। এ নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ তাকে কটাক্ষও করে।
এদিকে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ড. ফাউচির সাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি এবং প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন বক্তব্যের বিরোধিতা করেন ফাউচি। এতে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধে, প্রশাসন ড. ফাউচির অর্জনকে খাটো করে দেখছে। কেউ কেউ ড. ফাউচিকে বরখাস্ত করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। অবশেষে ১৩ জুলাই রাতে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তার সঙ্গে ফাউচির চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।
আবার ৯৯ শতাংশ করোনা কেস ক্ষতিকর নয়-ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিশনার ড. স্টিফেন হাহনের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
কংগ্রেসের কাছে মিথ্যা বলা এবং বিচারে বাধাদানসহ বিভিন্ন অপরাধে ৪০ মাসের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ট্রাম্পের অ্যাসোসিয়েট রজার স্টোনের শাস্তি কমিয়ে কয়েক দিন করার ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে নজিরবিহীন ঐতিহাসিক অপরাধ বলে দাবি করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর মিট রমনি।
ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিস মেরি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টকে নিখুঁত ভয়ানক লোক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ওয়াস্ট প্রেসিডেন্ট : সাধারণত কোনো প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের অনুমোদনের হার ৪৫ শতাংশের কম এবং অননুমোদনের হার ৫২ শতাংশের বেশি হলে তাকে আমেরিকার ইতিহাসে ওয়াস্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। আমেরিকার পঞ্চদশ প্রেসিডেন্ট জেমস বুচানন (১৮৫৭-১৮৬১), সিনিয়র বুশ প্রমুখ আমেরিকার ইতিহাসে ওয়াস্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকেন। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের অনুমোদন কখনো ৪০ শতাংশের বেশি এবং অননুমোদনের হার ৫৫ শতাংশের নিচে নেমে আসেনি। সর্বশেষ গ্যালপ জরিপে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের অনুমোদনের হার ৩৮ শতাংশ এবং অননুমোদনের হার ৫৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ইতিহাসবিদেরা ট্রাম্পকে ওয়াস্ট প্রেসিডেন্টের অন্তর্ভুক্ত করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে চাপ : ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসবে না, সেসব প্রতিষ্ঠানের ফেডারেল বরাদ্দ বাতিল করা হবে। ট্রাম্পের ওই হুমকি মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বরাদ্দের ৯০ শতাংশ প্রদান করে স্টেট এবং স্থানীয় সরকার। আর ফেডারেল সরকারের ১০ শতাংশ বরাদ্দই ব্যয় হয় জাতীয় পর্যায়ে সমস্যাগ্রস্ত, নিম্ন আয়ের এবং বিশেষ শিক্ষার ছাত্রছাত্রীদের পেছনে।
ড. রেডফিল্ডের বক্তব্য : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে সিডিসির পরিচালক ড. রেডফিল্ড বলেন, এটি হবে সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আবার সিডিসির গাইডলাইনকে অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এক টুইট বার্তায় প্রেসিডেন্ট বলেন, বস্তুত অনেক বিদ্যালয়ের পক্ষে এসব দুরূহ ও ব্যয়বহুল নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। আর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেছেন, আগামী সপ্তাহে সিডিসি বিদ্যালয় পুনঃখোলার বিষয়ে গাইডলাইন দেবে।
প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে গুড মর্নিং আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. রেডফিল্ড বলেন, আমাদের গাইডলাইন অপরিবর্তনীয়। তবে যেসব কমিউনিটি দ্বাদশ গ্রেড পর্যন্ত পুনঃখোলার চেষ্টা করছে, সেসব কমিউনিটিকে ভিত্তিমূলক সাহায্য হিসেবে অতিরিক্ত কিছু রেফারেন্স ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হবে। এটি আদি গাইডলাইনের সংশোধন নয়; বরং আমাদের প্রদত্ত গাইডলাইন বাস্তবায়নে স্কুলগুলোকে সক্ষম করে তুলতে সাহায্যের জন্য কিছু অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহ করা। তিনি আরও বলেন, গাইডলাইনগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত এবং ব্যয়বহুল বলে অনেকে যে অভিযোগ করছেন, তা সঠিক নয়। কীভাবে গাইডলাইনগুলোকে একত্রে প্রয়োগ করা যাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এর সার্থকতা।
ড. রেডফিল্ড বলেন, নিরাপত্তার সাথে বিদ্যালয়গুলো পুনঃখোলার ব্যাপারে কীভাবে গাইডলাইনগুলোর সর্বোত্তম প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে সিডিসি স্থানীয় জুরিসডিকশনের সাথে কাজ করবে। ড. রেডফিল্ড আরও বলেন, বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখার কাজে জনগণ গাইডলাইন এবং উদ্বেগকে ব্যবহার করলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত হবেন। তিনি বলেন, পাবলিক হেলথ উদ্যোগের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে এখন বিদ্যালয় নিরাপত্তার সাথে পুনঃখোলা উচিত।
পেন্সের নরম সুর : ১৪ জুলাই সকালে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেন, বিদ্যালয়গুলো খোলা না খোলার সিদ্ধান্ত প্রদান করবে স্টেট এবং স্থানীয় সরকার।
ট্রাম্পের মায়ামি-ড্যাড সফর : একদিনে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ হাজার লোক নতুনভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ফ্লোরিডায়। আর ফ্লোরিডায় মায়ামি-ড্যাডের বাসিন্দাদের পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশ করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০ জুলাই শুক্রবার মায়ামি-ড্যাড সফর করেন। ট্রাম্প ডরালের ইউএস সাউদার্ন কমান্ডের এনহেন্সড কাউন্টার টেররিজম অপারেশনস ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। তিনি ইউএস সাউদার্ন কমান্ডের এনহেন্সড কাউন্টারটেররিজম অপারেশনের ওপর মন্তব্য করেন। এরপর ইগলেসিয়া ডোরাল জেসাজ ওয়ারশিপ সেন্টারে ভেনিজুয়েলার জনগণের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য রাউন্ড টেবিলে অংশ নেন। অবশেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হিলসবরো বিচের ফান্ড রেইজারে যোগ দেন। যাহোক, করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়ার জন্য জাতিকে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হচ্ছে।