ট্রাম্প-বাইডেন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

বাহারুল আলম : আমেরিকার ৪০০ বছরের গণতন্ত্রের ইতিহাসে করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে অনুষ্ঠেয় এবারের নির্বাচনের মতো টান টান উত্তেজনা নিকট অতীতে আর কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি। ১৬১৯ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপ থেকে আমেরিকায় আগত বসতি স্থাপনকারী কয়েকটি প্রধান গ্রুপের কয়েকজন প্রতিনিধি ভার্জিনিয়ার জেমস টাউনে প্রথম প্রতিনিধি আইনসভার অধিবেশন ডাকেন। আমরা বর্তমানে আমেরিকায় যে গণতন্ত্র দেখি, সেটা সেই সভার ধারাবাহিকতারই ফলশ্রুতি বলে মনে করা হয়।
গত ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত আমেরিকার দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলÑ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির ব্যাক টু ব্যাক জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ থেকে ২০ আগস্ট উইন্সকনসিনের মিলওয়াফিতে আয়োজন করা হয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কনভেনশন। কনভেনশনে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট পদে ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মিশ্রবর্ণের (কৃষ্ণাঙ্গা/ভারতীয়) সিনেটর কামালা হ্যারিসকে পার্টির টিকেট দেয়া হয়। এটা সবারই জানা যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমর্থনের মূলভিত্তি হলো কৃষ্ণাঙ্গ ও সংখ্যালঘু ভোটার।
তথ্য মতে, আমেরিকায় কমবেশি প্রায় দেড় কোটি ভারতীয় বাস করেন। স্পষ্টত কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় ভোটারদের নিরঙ্কুশ সমর্থন যাতে বাইডেন পান, সে লক্ষ্যেই কামালা হ্যারিসকে বেছে নেয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। যদিও কামালা হ্যারিস ভারতীয়-আমেরিকানের চেয়ে নিজেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ হিসাবে পরিচয় দিতে অধিক ভালোবাসেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক ও চলমান ভারত-চীন বিবাদের প্রেক্ষাপটে বহু ভারতীয় যে বাইডেনের থেকে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে পেতে বেশি নিরাপদ বোধ করবেন, সেটা অনেকটা হলফ করেই বলা যায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কর্মী-সমর্থকদের উদ্দীপ্ত তথা ফায়ার আপ করার জন্য কামালা হ্যারিসকে বেছে নেয়া হয়েছে বলে মনে করেন। কারণ তাদের মতে, বাইডেন পার্টির, বিশেষ করে বার্নি স্যান্ডার্স সমর্থকদের মধ্যে, আশানুরূপ মোমেন্টাস তথা উদ্দীপনা সৃষ্টিতে সফল হননি। পলিসি-প্রোগ্রামের দিক দিয়ে বাইডেন-হ্যারিস মেডিফেয়ার ফর অল প্রায় ১১ মিলিয়ন অবৈধ ইমিগ্র্যান্টকে নাগরিকত্ব প্রদান, ওপেন বর্ডার, নারীদের গর্ভপাতের অধিকার প্রদান (প্রো চয়েস), বন্দুক নিয়ন্ত্রণ ও মারিজুয়ানা বা গাঁজা সেবনকে বৈধকরণের পক্ষপাতি। বাইডেন ডিফান্ডিং পুলিশ ইস্যুতে পুরোপুরি একমত না হলেও পুলিশের বাজেটের একটা বড় অংশ জনকল্যাণমূলক অন্য কোন খাতে ব্যয়ের পক্ষপাতি। তারা মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ ও পরিবেশের ক্ষতি হয় বিধায় ভূগর্ভস্থ তেল/গ্যাস (ফসিল ফুয়েল) উত্তোলনের (ফ্র্যকিং) ঘোর বিরোধী। এক কথায় নীতি-আদর্শের দিক দিয়ে তারা বাম উদারপন্থী ও সমাজতন্ত্রী মনোভাবাপন্ন, যে কারণে তারা পার্টিতে সানফ্রান্সিসকো ডেমোক্র্যাট হিসাবে পরিচিত। সানফ্রান্সিসকো থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসওম্যান স্পিকার ন্যান্সি পোলোসিকে এই গ্রুপের নেতা হিসাবে মনে করা হয়।
গত ২৪ থেকে ২৭ আগস্ট নর্থ ক্যারোলাইনার শার্লোটে অনুষ্ঠিত হয় রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কনভেনশন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিদিন কনভেনশনের জন্য বক্তব্য দেন। শেষদিনে তিনি হোয়াইট হাউসের মাঠ থেকে পার্টির মনোনয়ন গ্রহণের ভাষণ দেন। চিরাচরিত কনভেনশনে যে ধরনের আনন্দ-উল্লাস দেখা যায়, এবারের কোনো কনভেনশনে কেভিডের কারণে কনভেশনে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি না থাকায় তার কোনো কিছুই লক্ষ্য করা যায়নি। তবে রিপাবলিকান দলের কনভেনশনে সারা দেশ থেকে কমবেশি প্রায় ৪০০ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়।
কনভেনশনে সমর্থকদের উল্লাস, হর্ষবর্ধণ, বেলুন উড়ানো ইত্যাদি কোন কিছুর বালাই ছিলো না। এক কথায়Ñ এবারের উভয় কনভেনশনই ছিলো আনকনভেনশনাল কনভেনশন! নির্ধারিত বক্তাদের বক্তব্য পূর্বে রেকর্ড করে টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। কনভেনশনে ট্রাম্পের ভাষণে কোভিড পরবর্তী সময়ে মার্কিন সমৃদ্ধিকে তুঙ্গে নিয়ে যাবার সংকল্প ব্যক্ত করা হয়, যাকে তিনি ‘দ্য গ্রেট আমেরিকান কাম ব্যাক’ নামে অভিহিত করেন।
অপরদিকে বাইডেন তার ভাষণে ট্রাম্পের ‘কথিত অপশাসনে অন্ধকারের বৃত্তে চলে যাওয়া দেশকে আলোতে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়’ ব্যক্ত করেন।
কোভিড পরিস্থিতি মোকাবেলা ও অন্যান্য ফ্রন্টে ট্রাম্পের কথিত নেতৃত্বের ব্যর্থতার পাশাপাশি অন্য একটি বিষয়কে সম্প্রতি আলোচনায় আসতে দেখা যায়। সেটি হলো ট্রাম্পের ব্যক্তি-চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তার একাধিক নিকটাত্মীয়ের মন্তব্যাদি। ট্রাম্পের ভাতিজি মেরি ট্রাম্প সম্প্রতি প্রকাশিত তার বইয়ে ট্রাম্পকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক একজন ব্যক্তি’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ঐ বই লিখতে গিয়ে তিনি ট্রাম্পের বড় বোন অবসরপ্রাপ্ত ফেডারেল জাজ মেরি অ্যান ট্রাম্প ব্যারির সঙ্গে যে আলাপচারিতা করেন, তা তিনি গোপনে টেপ করেন, যার কিছু অংশ সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে একজন ‘নিষ্ঠুর, মিথ্যুক ও নীতিবিবর্জিত ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেন। এমন কি পেনসেলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিখ্যাত হোয়াইটন বিজনেস স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রেও তিনি জালিয়াতি করে তার হয়ে অন্যকে দিয়ে পরীক্ষা দেয়ান বলে জানান। প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তিনি ‘একেবারেই অনুপুযুক্ত’ বলে তার বোন দাবি করেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ট্রাম্পের এককালীন ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যাটর্নি মাইকেল কোহেন ও হোয়াইট হাউসের সাবেক কমিউনিকেশন ডিরেক্টর অ্যান্থনী স্কারামুচি তাদের সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত বইয়েও ট্রাম্প সম্পর্কে অনুরূপ মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক অধিকাংশ জনমত জরিপে বাইডন জনসমর্থনের দিক থেকে এগিয়ে থাকায় ট্রাম্প বাইডেন-হ্যারিসের দিকে তার আক্রমণের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন। বহুদিন ধরে ট্রাম্প বাইডেনকে ‘স্লিপি জো’ ও ‘স্লো জো’ নামে সম্বোাধন করে থাকেন।
শোনা যায়, বাইডেন যখন সিনেটর ছিলেন, তখন সিনেটের অধিবেশন শেষে তিনি প্রতিদিন ওয়াশিংটন ডিসির ইউনিয়ন স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে ডেলাওয়ারের উইলমিংটনে নিজ বাড়িতে ফিরে যেতেন। ট্রেনে চেপে পত্রিকা খুলে পড়তে পড়তে তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং সারা পথ তিনি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতেন! এটা জেনে ট্রাম্প তাকে ‘স্লিপি জো’ নামে ডাকা শুরু করেন, আর কাজে-কর্মে বাইডেনের ধীরগতির কারণে তিনি তাকে ‘স্লো জো’ নামে ডাকেন।
বাইডেন আসন্ন নির্বাচনকে শিষ্টাচার, সম্মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের নির্বাচন, আর ট্রাম্প নির্বাচনকে সমাজতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের মধ্যে এক কঠিন লড়াইয়ের নির্বাচন হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। বাইডেন সব দেশে ব্যর্থ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, আর তিনি লড়ছেন মুক্ত অর্থনীতি ও ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য বলে ট্রাম্প ভোটারদের বোঝাবার চেষ্টা করছেন।
কোন পক্ষের বক্তব্য ভোটারদের বেশি নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে, সেটা জানার জন্য আমাদের আগামী ৩ নভেম্বর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, এবারের নির্বাচন বে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
-লেখক, কলামিস্ট, নিউইয়র্ক।