ঠিকানার প্রকাশনা অব্যাহত থাকুক

আহবাব চৌধুরী খোকন : বহির্বিশ্বের পাঠকনন্দিত বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ঠিকানা তার প্রকাশনার ৩০ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে-এ সংবাদটি গোটা বিশ্বের সকল প্রবাসীর জন্য কতটা আনন্দের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৯০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে এই সংবাদপত্রটি নিউ ইয়র্কপ্রবাসী বিশিষ্ট কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট, রাজনীতিবিদ এবং এ প্রবাসের নন্দিত ও সফল ব্যক্তিত্ব, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক জনাব এম এম শাহীনের সুসম্পাদনা এবং উদ্যোগে যাত্রা শুরু করেছিল। তারপর এক এক করে গোটা উত্তর আমেরিকার সকল প্রবাসীর মন জয় করে গত ৩০ বছর যাবৎ সমান জনপ্রিয়তা ও মান ধরে রেখে যেভাবে তার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে, এটি একটি সংবাদপত্রের জন্য কম কৃতিত্বের নয়।

সাপ্তাহিক ঠিকানাকে নিয়ে কিছু বলতে হলে সর্বাগ্রে যে নামটি আসে তিনি হচ্ছেন এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার জনাব এম এম শাহীন। জনাব এম এম শাহীন এবং ঠিকানা একে অপরের পরিপূরক। জনাব শাহীন আমার প্রিয় ব্যক্তিদের অন্যতম। তার সাথে আমার পরিচয় যেমন সুদূর বাংলাদেশ থেকে, তেমনি ঠিকানা পত্রিকা আমার প্রথম পড়া এবং দেখার সুযোগ হয়েছিল ঠিকানা প্রকাশের পর পরই দেশে থাকাকালেই।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে এম এম শাহীন যখন এই প্রবাসের মায়া ছেড়ে দেশসেবার ব্রত নিয়ে স্থায়ীভাবে তার নিজ এলাকা কুলাউড়ায় পাড়ি জমান, তখন আমি সিলেট বিএনপির রাজনীতির বেশ সক্রিয় একজন কর্মী। সিলেট জেলা বিএনপির সাংস্কৃতিক ও আপ্যায়ন সম্পাদক এবং একই সাথে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। কুলাউড়া কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে কুলাউড়ায় আমার তখন নিত্য আসা-যাওয়া ছিল। সেই সময় থেকে তার সাথে আমার পরিচয় এবং সখ্য। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল ভদ্রলোক প্রতিশ্রুতিশীল। সে সময় তার সাহস, দেশপ্রেম, কর্মস্পৃহা, মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট এবং স্মার্টনেস দেখে সত্যিই আমি অভিভ‚ত হয়েছিলাম। সে সময় তিনি উপজেলাব্যাপী লং মার্চ, ঠিকানা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য আবাসন নির্মাণসহ অনেক নতুন নতুন কার্যক্রম গ্রহণ করে গোটা বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। একসময় ঘটনাচক্রে আমিও সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত ছিলাম। আমি প্রথমে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সিলেট সংবাদ এবং পরে সাপ্তাহিক সিলেট বাণী (বর্তমানে দৈনিক) এবং দৈনিক দিনকাল পত্রিকায় মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতাম। তখন পত্রিকায় নিউজ লেখার পাশাপাশি পত্রিকা সংগ্রহ করা আমার একধরনের নেশা ছিল। এই সময় নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি আমার নজরে আসে।

পত্রিকার আকার, গেটআপ, মেকআপ (চকচকে ছাপা) দেখে তখন থেকেই মনে হয়েছিল, পত্রিকাটির মধ্যে প্রচুর নতুনত্ব আছে। কারণ, তখন দেশে ট্যাবলয়েড সাইজের পত্রিকা খুব একটা দেখা যেত না। যদিও পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর সম্পাদনায় দৈনিক মানবজমিন নামে একটি পত্রিকা ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, যার প্রকাশনা এখনো অব্যাহত আছে। পরে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত আমার ভাইদের মাধ্যমে আমি নিয়মিত ঠিকানা সংগ্রহ করতাম। এই পত্রিকাটি পেলে মনে হতো যেন এক সপ্তাহ খুব ভালো করে কাটানো যাবে। পত্রিকাটিতে যেমন ছিল বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের সমাহার, তেমন ছিল গুণীজনদের লেখা অনেক তথ্যবহুল, কলাম, ফিচার ও প্রবন্ধ; যা পড়ে সারা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে সম্যক ধারণা পাওয়া যেত।

কালের পরিক্রমায় ঠিকানা এখন আর সাধারণ কোনো সংবাদপত্র নয়, পরিণত হয়েছে একটি বিশাল গ্রুপ অব প্রতিষ্ঠানে। ঠিকানার সহযোগী পত্রিকা হিসেবে সমান্তরালে দেশ থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আরেকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মানব ঠিকানা’। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যেমনি কমিউনিটির মুখপত্র হিসেবে ঠিকানা কাজ করেছে, তেমনি দেশের সাথে প্রবাসের সেতুবন্ধ রচনায় পালন করেছে অগ্রণী ভ‚মিকা। ঠিকানা যে সময়টিতে যাত্রা শুরু করেছিল, একই সময়ে বহির্বিশ্বে আরো কয়েকটি পত্রিকা বের হতো। তাদের অন্যতম হচ্ছে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা এবং কানাডা থেকে সাপ্তাহিক দেশে-বিদেশে। কিন্তু প্রতিক‚ল পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়ে সাপ্তাহিক সুরমা এবং দেশে-বিদেশের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলেও ঠিকানা আছে সেই আগের মতোই। ভাবতে অবাক লাগে, এই পত্রিকাটি যখন নিউ ইয়র্ক থেকে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল, তখন প্রযুক্তি যেমন এখনকার মতো উন্নত ছিল না, তেমনি ছিল না উন্মুক্ত আকাশ।

এখন মুক্ত সংস্কৃতির প্রভাবে গোটা পৃথিবী পরিণত হয়েছে একটি অঞ্চলে। মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে চোখের সামনে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন সমান্তরালে কাজ করে যাচ্ছে গণমাধ্যম হিসেবে। কিন্তু যে যুগে ঠিকানা যাত্রা করেছিল, তখন এত অবারিত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ফলে দেশের খবর জানার জন্য সারা সপ্তাহ প্রবাসীরা অপেক্ষায় থাকত একটি সংবাদপত্রের এবং এই অভাব পূরণে এগিয়ে এসেছিল ঠিকানা। এই প্রবাসে এই সংবাদপত্র শিল্প কতটা ঝুঁকিপূর্ণ কেবল এ শিল্পের সাথে যারা সম্পৃক্ত আছেন, কেবল তারাই বলতে পারবেন। দেশে না হয় সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় কিন্তু এখানে কেবল ব্যক্তিগত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখা সহজসাধ্য নয়। তবু শাহীন সাহেবের মতো ত্যাগী ব্যক্তি যারা প্রবাসের এই ব্যস্ত ও ব্যয়বহুল জীবনে নিজের ক্ষতি সাধন করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশ সাধনে এই শিল্পে সময় দিচ্ছেন, তারা সত্যিকার অর্থেই একেকজন দেশপ্রেমিক। দেশের প্রতি তাদের এই ত্যাগ ও ভালোবাসা খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে এখন অনেক পত্রিকা বের হলেও মানসম্পন্ন পত্রিকার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই সবগুলো পত্রিকার মধ্যে নির্ভরতা ও বস্তুনিষ্ঠতার দিক থেকে ঠিকানা বরাবরের মতো এখনো এক নম্বর পত্রিকা হিসেবে পাঠকের মন জয় করে আছে। ফলে অনেক পাঠকই অপেক্ষায় থাকেন কবে ঠিকানা বের হচ্ছে এ জন্য। একঝাঁক নিবেদিত পেশাজীবী ও চৌকস সংবাদকর্মী হচ্ছেন এই পত্রিকার প্রাণ। তারা সততা, আস্থা ও বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালনে সদা জাগ্রত। পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে আছেন এই কমিউনিটির সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জনাব এম এম শাহীন। আছেন প্রধান সম্পাদক মুহম্মদ ফজলুর রহমান, যিনি একজন পুরোদস্তুর ভদ্রলোক।

নির্বাহী সম্পাদক জাবেদ খসরু, বার্তা সম্পাদক মিজানুর রহমান ও সহযোগী সম্পাদক শামসুল হক। পত্রিকাটির সার্বিক দায়িত্বে আছেন আমার একসময়ের সহপাঠী মঞ্জুর হোসেন। তারা প্রত্যেকেই পেশায়, সততায় এবং কর্তব্যনিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিশীল। সাপ্তাহিক ঠিকানার উনত্রিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি এই পত্রিকার অব্যাহত প্রকাশনা কামনা করি। সাপ্তাহিক ঠিকানা বেঁচে থাকুক অনন্তকাল আমাদের বাংলা সংস্কৃতি ও আগামী প্রজন্মের ঠিকানা হয়ে।

সংগঠক ও কলামিস্ট, নিউ ইয়র্ক।