ঠিকানা’র সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখের সম্পর্ক — মুনিয়া মাহমুদ

আমেরিকার মাটিতে প্রথম পা রেখেছি লস অ্যাঞ্জেলসে ১৯৯৫ সালের ১০ ফেব্রæয়ারি। পরিবারের সবচেয়ে ছোট বোন মেলীকে নিয়ে আমরা দুই বোন এখানে আসি আম্মাকে দেখার জন্য। তিনি তখন হাসপাতালে। ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। আমরা পাঁচ ভাইবোন তখন আম্মাকে ঘিরে থাকতাম। ডাক্তার, নার্সরা তখন বলত, তোমার মা অনেক ভাগ্যবতী যে তোমরা এতজন মায়ের পাশে রয়েছ। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, আম্মা টেম্পাতে (ফ্লোরিডা) মারা যাওয়ার সময় নার্স ছাড়া তাঁর পাশে কেউ ছিল না।
আমি ছোটবেলা থেকে খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন ও বইপড়–য়া। ঢাকার অফিসে সকালে প্রবেশের পর টেবিলে ৫-৬টা খবরের কাগজ ও এক মগ ধূমায়িত গরম চা থাকত। ঢাকার ইংরেজি পত্রিকা পড়তেও ভালো লাগত। আমেরিকায় প্রবেশের পর এ দেশের পত্রিকা পড়তে ভালো লাগে না। চারদিকে অনেক ইংরেজি ম্যাগাজিন, পত্রিকার ছড়াছড়ি কিন্তু ধরতে ইচ্ছা হয় না।
লস অ্যাঞ্জেলসে একদিন বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাংলা গ্রোসারিতে যাই। সেদিন প্রথম ঠিকানাকে দেখি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় লুফে নিই। বাসায় এসে কখন পড়ব এই চিন্তায় সারা পথ কাটে। বাসায় এসে ঠিকানা পড়ার সময় ভাইবোনরা বিভিন্ন পাতা নিয়ে পড়া শুরু করে। এর ফলে একটা ঠিকানা কয়েক ভাগ হয়ে যায়। যাক, আমার মনে শান্তি হয় যে অন্তত পড়ার জন্য একটা বাংলা পত্রিকা আমেরিকায় পেলাম।
আমার তখন মাত্র তিন মাস হয়েছে বিয়ে হয়েছে। আমি দুই সপ্তাহ কাটিয়ে দেশে ফিরে যাই। কারণ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি মাত্র দুই সপ্তাহের। লস অ্যাঞ্জেলস এয়ারপোর্টে আমাকে মেলী ও বড় ভাই নামিয়ে দিতে আসে। আমি কাস্টমস এরিয়া দিয়ে ঢোকার মুহূর্তে শেষবারের মতো পেছনে তাকাই। দেখি মেলী ছলছল চোখে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার তখন বুকের ভেতর কেমন জানি করে ওঠে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে পুরো পথ একা একা মনমরা হয়ে ঢাকায় নামি। কারণ যাওয়ার সময় মেলীর সঙ্গে অনেক আনন্দ করতে করতে আমেরিকায় গিয়েছি।
ঢাকায় এসে চাকরি ও নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সে সময় আমেরিকায় ফোন করা অনেক টাকার ব্যাপার। তাই আমি মেলীকে ফ্যাক্স করতাম। ও আমাকে ৩-৪ পাতার ফ্যাক্স করত। এভাবে চলত আমাদের কথোপকথন। আমি প্রেগন্যান্ট হওয়ার খবর শুনে মেলী জানায় বাচ্চার নাম ও দেবে। যা-ই হোক, আমাদের দিন ভালোই কাটছিল। কিছুদিন লস অ্যাঞ্জেলসে কাটিয়ে মেলী বড় বোনের বাসায় মায়ামিতে যায়। কাছেই ছিল বোনের স্বামীর কনভেনিয়েন্ট স্টোর। আমাকে ফ্যাক্সে জানায়, ওখানকার পূর্ণিমার চাঁদ বিশাল বড়। মায়ামিতে সবকিছু মিলিয়ে মেলীর দিনগুলো দারুণ আনন্দে কাটছিল।
১৯৯৫-এর ফেব্রæয়ারির ১০ থেকে এপ্রিলের ৩। মাত্র ১ মাস ২২ দিন মেলী আমেরিকায় জীবন্ত ছিল। এপ্রিলের ৩ তারিখে আমরা মেলীর পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করার সেই ভয়াবহ সংবাদটি শুনলাম। আমাদের পৃথিবী তখন দুভাগ হয়ে যায়। একভাগে মেলী আছে, আরেক ভাগে নাই।
আমাদের সবচেয়ে আদরের বোনকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। যা হোক, সংক্ষেপে এটাই জানাতে চাই আমার বোনের একজন সাইকোর হাতে মৃত্যু হয়েছে। যেমন ক্রসফায়ারে নিরীহ ব্যক্তি মারা যায়, সে রকম। মেলী ছিল ইনোসেন্ট ভিকটিম। মায়ামি ট্রিবিউন তাই লিখেছে, এত কম সময়ে কোনো প্রেমের সম্পর্ক হয় না। ছেলেটি সাইকো ছিল। মেলীর স্মৃতি নিয়ে একটা বই আমি লিখছি। সেখানে সবকিছু লেখা হবে। মেলীর নিথর দেহ ১০ এপ্রিল ঢাকায় আসে, তখন ৩ দিনের একটানা হরতাল চলছিল। তখন অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে সব কাজ করা হয়। মেলীকে বাবার কবরের ওপর বনানী গোরস্থানে দাফন করা হয়। হাসতে হাসতে যে পুতুলের মতো সুন্দর ২২ বছরের মেয়ে আমেরিকায় যায় আর আসে বাক্সবন্দী হয়ে, যত বছরই যাক না কেন, এটা আমার পক্ষে মনে হয় কখনোই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, ঠিকানার সঙ্গে মেলীর মৃত্যুর কী সম্পর্ক! আছে, সম্পর্ক আছে। ঠিকানার প্রথম পেজে ওপরের ডান দিকে মেলীর পাসপোর্ট ছবি দিয়ে হেডিং দেওয়া হয় : প্রেমের বলি।
তখন আমি ঢাকায় যখন ঠিকানা পত্রিকা হাতে পাই। প্রতিটি মৃত্যুর একটা সম্মান আছে। আমার বোনের মৃত্যুর সঙ্গে প্রেমের কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমার আদরের বোনের মৃত্যুর সময় কোনো অসম্মান হয়নি। সে সময় যে তাকে দেখেছে, বলেছে, একটা পরি ঘুমাচ্ছে।
সে সময় আমার ছোট ভাই নাকি সেই রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলেছিল। যা-ই হোক, অনেক বছর কেটে গেলেও আমি সেই ঠিকানার রিপোর্টের কথা এখনো ভুলিনি। তবে ঠিকানাতে মেলীকে নিয়ে আমার একটা কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতার নাম মাটির পুতুল : কয়েক লাইন ছিলÑএই পৃথিবী পাতলো সেদিন রক্তিম মৃত্যুফাঁদ/ তোমার বুকে আছড়ে পড়ে পূর্ণিমার চাঁদ/। রক্তলাল বন্যায় সেদিন ধরণী খান খান/ স্তব্ধ এ-ধরা, স্তব্ধ, স্তব্ধ পাখির কলতান।
মেলীর মৃত্যুর ১০ বছর পর ২০০৫ সালে আমরা ঢাকা ছেড়ে পাকাপাকিভাবে ফ্লোরিডায় বসবাস শুরু করি। আমার লেখালেখির অভ্যাস তো সেই ছোটবেলা থেকে। যদিও ঢাকায় থাকাকালীন চাকরি ও সংসারের ব্যস্ততায় তেমন লেখা হয়ে উঠত না। যা-ই হোক, আবার ঠিকানা পত্রিকা হাতে পেলাম। তখন মনের মধ্যে লেখালেখির ভাবনা উথলে ওঠে। তখন বাংলা টাইপ করতে পারতাম না, তাই হাতে লিখে একটা কবিতা পাঠালাম। কবিতার নাম : মাকে চিঠি। প্রথম দুই লাইন ছিল : রাতের আকাশ যেন তারার হাজারো বুটির চাদর/ মাগো তোমায় দেখি না যেন লক্ষ কোটি বছর।
টেম্পাতে তখন বাংলা গ্রোসারি ছিল মাত্র একটা। পরের সপ্তাহে ঠিকানা হাতে নিয়ে দেখি আমার কবিতা ছাপা হয়েছে। আম্মা মারা গিয়েছেন তখন মাত্র দুই বছর। মন মায়ের মৃত্যুর শোকে ভরপুর। একসঙ্গে যতগুলো ঠিকানা দোকানে ছিল, সবগুলো কিনে নিই। মনে হয় ১২টা ছিল। টেম্পার বন্ধুদের উপহার দিই। মন আনন্দে ভরে ওঠে। এর পর থেকে নিয়মিত লেখা পাঠাতে থাকি। তখন ঠিকানার কাউকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে ঠিকানার সঙ্গে মানসিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়।
২০০৭ সালে আমার স্বামী ইউনিসেফে কাজ নিয়ে নিউইয়র্কে আসে। আমি টেম্পাতে থেকে যাই, কারণ ছেলেদের স্কুল শেষ করতে হবে। একদিন ছেলের বাবা ফোনে বলে, নিউইয়র্কে প্রচুর ¯েœা পড়ছে। তখন টেম্পাতে অনেক গরম। তখন একটা বরফ ছড়া লিখে ঠিকানাতে পাঠাই। ছড়াটির কয়েক লাইন ছিল : ঝির ঝির ঝির ঝির তুষার নগর/ সাদা চাদর মুড়ে যেন নিউইয়র্ক শহর/ দূর দূর সীমাহীন সাদা সাদা ধুলো/ দুধ-সাদা বরফে ঢাকা মনের ধুলো/ আমি যেন নই আমি বরফের দাস/ বরফ হাসি, বরফ শ্বাস, বরফ মনের আশ।
আরেকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। নিউইয়র্ক থেকে ২০১২ সালের মে মাসে হুমায়ূন আহমেদ সপরিবারে দেশে যান। সে দিনটির কথা আমার মনে আছে। আমি সকাল থেকে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী শাওনের সঙ্গে শপিং করি এবং সবশেষে আমি ও শাওন হিলোসাইডে একটা বাংলা গ্রোসারিতে ঢুকি। মাদার্স ডে উপলক্ষে ঠিকানাতে আমার মাকে নিয়ে একটা লেখা প্রকাশ হওয়ার কথা। দোকান থেকে ঠিকানা তুলে পাতা খুলে দেখি ওটা প্রকাশিত হয়েছে। শপিং শেষে শাওন ও আমি ওদের বাসায় ঢুকে আমি ওপরতলায় যাই হুমায়ূন ভাইয়ের (সবাই ওনাকে স্যার বললেও আমি ভাই বলতাম) কাছ থেকে বিদায় নিতে। বিদায় নেওয়ার সময় ওনার হাতে ঠিকানা দিয়ে বললাম, আমার মাকে নিয়ে লেখা আছে। পড়বেন। তিনি ঠিকানা হাতে নিলেন। তখন ভাবিনি যে তিনি ঠিকানাকে যাত্রার সঙ্গী করবেন। অবশ্য ঠিকানা পত্রিকা তাঁর পছন্দের ছিল নিঃসন্দেহে। যা-ই হোক, তিনি এখানে থাকার সময় আমার টুকটাক লেখা পড়তেন। সেদিন আমি প্রচÐ ক্লান্ত থাকায় ওদের সঙ্গে এয়ারপোর্টে গেলাম না। এরপর ঠিকানা পত্রিকায় এয়ারপোর্টে তোলা হুমায়ূন আহমেদের লাল চেক শার্ট পরা এবং ঠিকানা পত্রিকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, এই ছবি দেখে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম।
ঠিকানা পত্রিকা ২৯ বছরে পদার্পণ করেছে, এটা খুবই আনন্দের বিষয়। কারণ এই নিউইয়র্কে কত পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এবং বিলুপ্তও হয়েছে। বটবৃক্ষের মতো আমেরিকার মাটির গভীরে ঢুকে একমাত্র ঠিকানা পত্রিকা গর্বভরে শির দৃঢ় করে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিকানা পত্রিকা আমাদের বাংলা সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। কারণ এর বুকজুড়ে লেখক, কবি ও প্রবাসী বাঙালিদের ঠাঁই রয়েছে এবং চিরদিন থাকবে। ঠিকানা পত্রিকা দীর্ঘজীবী হোক এবং যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক, এই কামনা করে আমার লেখার সমাপ্তি টানছি। সবাইকে ধন্যবাদ।
Ñনিউইয়র্ক।