শাহদত চৌধুরী

শাহাদত চৌধুরী বাংলাদেশের এক জীবন্ত কিংবদন্তী। বুদ্ধিজীবী সমাজ তাকে এক নামেই চেনেন। আম সমাজ জানে বিচিত্রার শাহদত চৌধুরী হিসেবে। তুখোড় সাংবাদিক, একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। প্রচলিত বৃত্ত ভেঙ্গে নবধারায় পেশাকে দিয়েছেন প্রভা, দেশপ্রেমের টানে মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে রণাঙ্গনে শত্রু নিধন করে এনেছেন স্বাধীনতা। ৭১ এ তিনি ছিলেন শত্রু শিবিরের ত্রাস। যোদ্ধার অস্ত্র ছেড়ে স্বাধীনতার পর কলম ধরে সাংবাদিকতা পেশায় এনেছেন নতুন স্রোত। হৃদয়ের এক প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধ, অন্য প্রান্তে পেশাকে ধারণ করে আজো শাহাদত চৌধুরী নবীণ। যে কোন আসরে তার উপস্থিতি মানে তিনিই সেই আসরের মধ্যমণি। যত সিরিয়াস বিষয়ই হোক তা তুলে ধরেন সরস গল্পের মত করে। অন্তর থেকে উৎসারিত জীবন কাহিনী তিনি গেঁথে দেন অন্যের অন্তরে। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকেই শাহাদত চৌধুরী লাভ করেছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার অবাধ অনুকূল পরিবেশ। বলা যায়, সেই পরিবেশেরই উজ্জ্বল ফসল আজকের পরিপূর্ণ শাহাদত চৌধুরী।
এই অকুতোভয় জীবনযোদ্ধা, ডাকসাইটে সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী সর্বশেষ যখন নিউইয়র্কে আসেন তখন ঠিকানার সঙ্গে প্রাণ উজাড় করে কথা বলেন প্রায় দু দিন ধরে। অনুরোধ করেছিলেন, সে সময় না, কোন এক অনুকূল সময়ে তা প্রকাশ করতে। ঐ সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, কৈশোর, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ছাড়াও বাংলাদেশের এমন কোন দিক নেই, যা তিনি স্পর্শ করেননি। রাজনীতি এবং পেশায় নিরপেক্ষতা, জনগণের পক্ষে কাজ করা, সময়ের সঠিক ব্যবহার, রণাঙ্গণ, শরণার্থী শিবির, ভাসানী-মুজিব-জিয়ার মূল্যায়ন, ভারতীয় বাহিনীর আচরণ, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতের রাজনীতি, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, প্রবাসীদের দেশের প্রতি অবদান তার ভাষায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন সরাসরি পর্দায় ছবি দেখছি।
জনাব চৌধুরী বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে। অসম্ভব সাহসী, প্রশ্নাতীত দেশপ্রেমিক ছিলেন শেখ মুজিব। যদিও তিনি মনে করেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশের জনক হলেও হতে পারেন, তবে বাঙালী জাতির পিতা নন কোনভাবেই। জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক মনে করেন, অবশ্য এই মুহূর্তে স্মরণ করতে পারেন না জিয়া সেই ঘোষণা শেখ মুজিবের পক্ষে দিয়েছিলেন কিনা। এক দলীয় শাসন সম্পর্কে বলেন, শেখ মনির পাল্লায় পড়েই তিনি এ কাজটি করেছিলেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিকে অতীতমুখী উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতির মাঠে খালেদা-হাসিনা থাকলেও সবকিছু চলছে জিয়া এবং শেখ মুজিবের নামেই। জামায়াত সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঘাড়ে বসে সুফল ভোগ করাই জামায়াতের বর্তমান চরিত্র। তিনি দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানের কথা অকুক্তচিত্তে স্মরণ করে বলেন, দেশের কল্যাণে প্রবাসীরাই এক নম্বর নায়ক।
এবার আমরা সবকথা হুবহু শাহাদত চৌধুরীর জবানীতেই শুনব। এ মাসেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবস। ঠিকানার পাঠকদের কাছে এই সময়কে সামনে রেখে তার কথা তুলে ধরার এমন উত্তম মুহূর্ত আর কী হতে পারে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ঠিকানা সম্পাদক সাঈদ-উর রব। সাক্ষাৎকার গ্রহণে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আই-এর পরিচালক সাইখ সিরাজ, দর্পণ-সম্পাদক ফজলুল রহমান এবং রিপোর্টার মিজানুর রহমান।
শাহাদত চৌধুরী শুরু করেন তার কৈশোরের স্মৃতিচারণ দিয়ে। বললেন, আমাদের সময়ে গড়ে ওঠা আর এখনকার সময়ে শিশুদের গড়ে ওঠার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আগেকার সময়ের শিশুরা নানাভাবে গড়ে ওঠতো। কেউ খেলাধুলা করে খেলোয়াড় হতো, কেউ রাজনীতি করে রাজনীতিক হতো। তখনকার শিশুদের নানমুখী বিকাশ সাধিত হতো। বাবা-মারাও তেমন চাপ দিতেন না। তাদের ছেলে মেয়েরা বাউন্ডেলে না হলেই হতো-আর এখন আধুনিক যুগের বাবা-মারাই ঠিক করে দেন সন্তান কী হবে। বাচ্চার মতামতকে তেমন প্রাধান্য দেয়া হয় না। বাবা-মার নিজস্ব মতামতই চাপিয়ে দেয়া হয় বাচ্চার উপর। ঠিক করে দেয়া হয় তারা কোন বিষয়ে পড়বে এবং কী হবে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন লেখা-পড়া ছেড়ে দিলাম। তাই বলে আমি বখাটে হয়ে যাইনি। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে আমি আমাদের বাড়ির চিলেকোঠায় বসে বই পড়তাম। অনেক সময় টানা এক সাথে ৩/৪ দিনও বই পড়েছি। বই এর নেশায় একদম বাইরে যেতামনা। এই ভাবে আমি প্রায় দুই বছর অতিবাহিত করলাম। এর মাঝে একদিন আমার আম্মা চিলেকোঠায় এসে বললেন- তোমার সহপাঠী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে আর তুমি? মার কথা বুঝতে আমার একটুও সময় লাগেনি- তাই মাকে বললাম আজ রাতটুকু আমাকে সময় দাও। মা চলে গেলেন। সারারাত মনের সাথে যুদ্ধ করে সিদ্ধান্ত নিলাম পরীক্ষা দেব এবং সকালে মাকে জানিয়ে দিলাম। অতঃপর মার সাথে আমার চুক্তি হলো আমাকে ইন্টারমেডিয়েট পড়তে হবে না। আর আমি যদি পড়ি সেটা নিতান্তই আমার ইচ্ছা। সেই ১৯৬১ সালের কথা। তিনি তার ক্লাশমেট হিসাবে আবেদ খান, সানাউল হক খান ও শেখ আবদুর রহমানের কথা উল্লেখ করেন। শেখ আব্দুর রহমানকে তারা ইন্দ্রনাথ হিসাবে ডাকতেন। আব্দুর রহমান ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। খুব ভাল ইংরেজী জানতেন। পরে অবশ্য তিনি একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানে টাইপিস্টের কাজ করতেন। তার কথা মত এবং উৎসাহেই ইংরেজী শিখতাম এবং ইংরেজী উপন্যাস পড়া শুরু করলাম। প্রথম দিকে কিছু বুঝতাম, কিছু বুঝতাম না। রহমানের কথা মত ডিক্সনারী কিনে অর্থ বুঝার চেষ্টা করতাম এবং কিছু দিনের মধ্যেই বয়স্কদের ইংরেজী উপন্যাস পড়া শুরু করলাম।
একেবারে ছোট বেলার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে জানালেন- কবি সুফিয়া কামালের কোলে পিঠেই আমি মানুষ হয়েছি। সকাল বেলায় দুটো প্যান্ট নিয়ে সুফিয়া কামালের বাসায় চলে যেতাম। দুটো প্যান্ট নেয়ার কারণ হলো দুপুরে গোসল করে প্যান্ট পাল্টাতে হতো। কবি সুফিয়া কামালের আদর-যতেœই বড় হতে থাকলেন। মূলত এখান থেকেই অর্থাৎ সুফিয়া কামালের বাসা থেকে সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরীর উত্থানের শুরু। এই বাড়িতেই বড় বড় নামী-দামী কবি, লেখক, চিত্রশিল্পীসহ মহান ব্যক্তিদের সাথে পরিচিতি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কয়েক জনের নাম উল্লেখ করেন। যার মধ্যে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কবি ফয়েজ আহমেদ ও আহসান হাবীব। কথা প্রসঙ্গে বললেন, শুধু টেলেন্ট হলেই হয়না -এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ব্যাক গ্রাউন্ড যা তিনি পাবিরারিক সূত্রে পেয়েছিলেন। তার পিতা আব্দুল হক চৌধুরী ছিলেন ঢাকার ডিস্ট্রিক্ট জজ। বাসা ছিলো ঢাকার হাটখোলা রোডে। বাবার খ্যাতির কারণেই তিনি ইত্তেফাকে যাওয়া-আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরিচিত হলেন তৎকালীন ইত্তেফাকের নিউজ এডিটর সিরাজ উদ্দিনের সাথে। ইত্তেফাক অফিস বাসার পাশে হবার কারণে তার যাতায়াত হতো অবাধে। নিউজ এডিটরের সাথে সখ্যতার কারণে প্রায়ই ইত্তেফাকে গিয়ে গল্প করতেন এবং শুনতেন। সিরাজ উদ্দিন হোসেন ইয়ংদের প্রাধান্য দিতেন বেশি। তিনি বলতেন- সুযোগ থাকলে ইংয়দের সুযোগ দেয়া উচিত এবং তিনি তাই করতেন। সিরাজ উদ্দীনের কাছ থেকেই তিনি ইয়ংদের প্রাধান্য দেয়ার সূত্রটি রপ্ত করেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিরাজ উদ্দিন হোসেন সবাইকে দিয়ে নিউজ লেখাতেন আর নিজে নিউজের ইন্ট্রো তৈরি করতেন। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন নিরপেক্ষতা বলতে কিছু থাকতে পারেনা কোন না কোন পক্ষ নিয়ে এগুতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা একটি মিশনে যাচ্ছি। ঐ মিশনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি অথবা জায়ামাত নাও থাকতে পারে- তবে কারো না কারো পক্ষে থাকতে হবে-আর সেটি হচ্ছে জনগণের পক্ষে। এটাই হচ্ছে পলিটিক্স এবং মিশনের এগিয়ে যাওয়ার পথ।
সাপ্তাহিক বিচিত্রা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম। আর এই বিচিত্রার সাথেই সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী জীবনের মধুরতম সময়টি অতিবাহিত করেছেন। তবে স্মৃতির জগতের এখনো অধিকাংশ স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, বিচিত্রায় আমরা নতুন ধরনের কাজ শুরু করি। বিচিত্রাই প্রথম শুরু করে নিউজের ইন্ট্রো থাকবে না, উপসংহার থাকবে না- সরাসরি নিউজে প্রবেশ করা। এখানে তিনি তার শ্রীলঙ্কা সফরে এক ডাক্তারের আলাপচারিতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ঐ ডাক্তার বলেছেন “তোমাদের এশিয়ার সংবাদপত্র গুলোতে একই ঘটনা প্রথমে একবার থাকে, বিবরণ একবার থাকে আবার উপসংহারে থাকে একবার।” মোট তিনবার একই ঘটনা পড়তে হয়। এতে সময় ক্ষেপণ ও পাঠক বিরক্ত হয়। ডাক্তারের ঐ কথাটি তিনি চিন্তা করেন এবং কালবিলম্ভ না করেই লুুপে নেন। তিনি পরবর্তীতে বিচিত্রায় কাজে লাগান। বিচিত্রার জন্য তিনি টাইম ফলো করতেন। বিচিত্রার রিপোর্টে সমালোচনা ও কাহিনী এক সাথে জুড়ে দিয়ে সাংবাদিকতা জগতে বিস্ফোরণ ঘটান। বিচিত্রার কথা বন্ধ করে দিয়ে আবার ফিরে আসেন শৈশবে। মার সাথে কথা হয়েছিলো তার ইন্টারমেডিয়েট পড়তে হবে না। তারপরও তিনি ১৯৬২ সালে ভর্তি হয়েছিলেন আর্ট কলেজে। আর্ট কলেজে এসেই তিনি পরিবর্তন হতে থাকেন। জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৬৪ সালে ছাত্র ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেলে বন্ধুদের কারণে তিনি মতিয়া গ্রুপে চলে যান। কথা প্রসঙ্গে বললেন এই সময় এই রাজনৈতিক দলের নেতারা ছিলেন ইক্টেলেকচ্যুায়েল। তারা বাবু সেজে রাজনীতি করতেন। সাধারণ জনগণের পক্ষে যা ধাতস্থ করা ছিলো সাধ্যের বাইরে। চারু মজুমদার এসে এই অবস্থার পরিবর্তন করেন। তিনি কাবলিস্যুট পরা, সৌখিন ও ভদ্র পরিবেশ থেকে এবং বাবু দের হাত থেকে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিকে নিয়ে আসেন সাধারণের কাতারে। ষাট এর দশকে সারা বিশ্ব ছিলো উত্তাল। যে উত্তালতা পৃথিবীতে আগে কখনো আসেনি, ভবিষ্যতেও আসবে কি না সন্দেহ। সারা বিশ্বে তরুণদের উন্মাদানা। সেই সময়ে আমরা মানুষ হয়েছি। জীবনের উত্তম সময় ছিলো আমাদের। ভিয়েতনাম, ইউরোপ, রাশিয়া, ব্রিটেন এবং এশিয়াতে ছিলো বিপ্লব ও যুদ্ধের ঘনঘটা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে সারা পৃথিবী চলে গেল তরুণদের দখলে। তিনি একটি উদাহারণ দিতে গিয়ে বলেন ১৯৬৫ সালে মাও সেতুং এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় এফ যুক্ত শব্দটি একটি গানে ব্যবহার করার জন্য বিবিসি গানটি ব্যান্ড করে দেয়। পরে শব্দটি এমনভাবে ব্যবহার করা হলো যে- যা সহজে কেউ ধরতে পারেননি। ব্রিটেনের জীবন যাত্রা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন পত্রিকা কেনার জন্য তখন ব্রিটেনের মানুষগুরো সুট চাই পরে বাইরে বের হয়ে যায়।
তিনি আবার ফিরে আসেন যুদ্ধে। বলেন-মুক্তিযুদ্ধ বার বার আমাদের মধ্যে ঢুকে যায়। বিশ্ব উত্তেজনার পাশাপাশি বাংলাদেশেও বিপ্লবের ধাক্কা লাগে। বাংলাদেশে আমরা বুঝতে পারছিলাম যে- যে কোন সময়ে যুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। শেখ মুজিবের গ্রুপের সাথে না গিয়ে আমরা গেলাম ভাসানী গ্রুপের সাথে। দেশের অবস্থাও আস্তে আস্তে নাজুক পর্যায়ে পৌঁছাতে থাকে। সব কিছু যেন তেতে আছে। দেশের অবস্থা এত চরম পর্যায়ে যেতে থাকলো যে আমার এক বন্ধু তার আপন নানাকে শ্রেণী শত্রু হিসাবে খুন করে। আমার ঐ বন্ধু সিরাজ সিকদারের গ্রুপ করতো। চারিদিকে শুরু হয়ে গেল জনে জনে চক্রান্ত। ১৯৬৮, ৬৯, ৭০ সাল থেকেই যুদ্ধের মুভমেন্ট শুরু হয়েছিলো। যুদ্ধ যখন এসে গেল আমরা তখন মোটামুটি প্রস্তুত। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন ১৯৬৬ সালে ঠিক হয়েছিলো ‘আমার সোনার বাংলা’ হবে জাতীয় সঙ্গীত। এই তথ্যটি তাকে দিয়েছিলেন ইত্তেফাকের তরুণ কর্মী সৈয়দ শাহজাহান। কিন্তু কিভাবে কারা ঠিক করেছিলো তা তিনি বিশদ ব্যাখ্যা করতে পারেননি। কোন চক্রান্ত হলে বাঙালীর পক্ষে হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন খুবই দূরদর্শী লোক। তিনি আগেই ভেবেছিলেন দেশ বিচ্ছিন্ন হবে। যে কারণে ১৯৬০ সালে তিনি আগর তলা ভিজিট করেছিলেন। দেশের ডানপন্থীরা পাকিস্তানের পক্ষে থাকতে বলেছে আর বামপন্থীরা স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেন। যে কারণে বামপন্থীসহ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষগুলো শেখ মুজিবের পক্ষে চলে যায়। যে কারণে পুরো আন্দোলন চলে যায় শেখ মুজিবের হাতে। শেখ মুজিবুর রহমান তখন স্বাধীনতার কথা বলতেন না, স্বায়ত্ব শাসনের কথা বলতেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফায় স্বাধীনতার কথা ছিলো বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন শেখ মুজিবুর রহমান টেকনিক্যালি স্বাধীনতার কথা বলতে পারতেন না।
শেখ মুজিবের সাহসের কথা বলতে গিয়ে শাহাদত চৌধুরী বলেন- ১৯৬৪ সালে রায়ট হলো। কলেজ থেকে বাসায় ফিরছি; আমার পুরনে ছিলো পায়জামা-পাঞ্জাবী, তাই আমাকে ভাবা হলো আমি নাকি হিন্দু। সেই যাই হোক কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে ইত্তেফাক অফিসে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি সিরাজ উদ্দিন হোসেন কী জানি মনোযোগ দিয়ে লিখছেন। কাছে গিয়ে দেখি লেখাটির নাম দেয়া হয়েছে- ‘বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও’। এই লেখা যদি ইত্তেফাকে ছাপা হয় তাহলে মানিক মিয়া এ্যারেস্ট হবেন একথা নিশ্চিত। লেখাটি ছাপাতেই হবে, কীভাবে ছাপাবেন এ নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করেই শেখ মুজিবকে ফোন করে পুরো ব্যাপারটি জানালেন। শেখ মুজিব ছিলেন অসম্ভব সাহসী। তাই তিনি কালবিলম্ব না করেই লেখাটি তার নামে ছাপিয়ে দেয়ার জন্য বললেন। এই রায়েেটর সময় কাপড় খুলে লোকজনকে পরীক্ষা করা হতে। মুখের কথা কোন পক্ষই বিশ্বাস করতো না। কথা প্রসঙ্গে জানালেন এই রায়টের সময় তার বড় ভাইকেও নাকী কাপড় খুলে পরীক্ষা করা হয়েছিলো।
সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী কথার রেশ ধরেই বললেন ১৯৪৭ সালের মুভমেন্টে তার বাবা জড়িত ছিলেন। দেশ বিভক্তির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন- ভারতের মালদা এবং মুর্শিদাবাদ যদি আমাদের থাকতো তবে আজ ফারাক্কার সৃষ্টি হতো না, আর নালদা এবং মুর্শিদাবাদ থাকলে আমরা সুন্দরবন পেতাম না। কারণ সুন্দরবনের উপর ছিলো ভারতের জয়। সেই দিকে থেকে সুকৌশলে ভারত তাদের কাজটি করে নিয়েছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “বাংলাকে ভাগ করেছে হিন্দুরা”। পুরো ক্ষমতা ছিলো কয়েকটি হিন্দু পরিবারের মধ্যে। যখন জমিদারদের আয় কমে যেতে লাগলো আর জোতদাররা পয়সার মালিক হতে লাগলেন তখনই জমিদারদের মাথা খারাপ হয়ে যেতে লাগলো। শুরু হলো বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন এবং তার বিরুদ্ধে আন্দোলন। সে জন্যই সৃষ্টি হয়েছিলো নুরুদ্দিনের আন্দোলন। বাংলা বিভক্তির সময় সোহরাওয়ার্দী বুঝালেন কলকাতা ছাড়া বাংলা বিভক্ত করে লাভ নেই। কিন্তু শ্যাম প্রসাদরা বাংলা বিভক্তিতে ইন্দন যোগালো হিন্দু প্রতিনিধিদের জন্য। নেবানন্দু চট্টোপাধ্যায় ১৯৪৩ কি ৪৪ সালে লেখেন মুসলমানদের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অথচ তখন বাঙালী মুসলমানদের ৫৬% বাংলায় কথা বলতো এবং ১৬% উর্দুতে কথা বলতো।
যুদ্ধে যেতে হবে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না- নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম। তিনি আবার ফিরে আসলেন ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে। বললেন ৭ই মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণ সব কিছু পাল্টে দিলো। এরকম সুন্দর, রাজনৈতিক ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই কম আছে। এই ভাষণের পর সবাই স্বাধীনতার কথা বললো। পৌঁছে গেল একই মঞ্চে। সেই দিনের রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান দেরীতে পৌঁছেছিলেন। মানুষের উপস্থিতি এবং ভাষণ যেন বিস্ফোরণ ঘটালো। এই মিটিং -এ মানুষ স্রোতের মত আসতে থাকলো। মানুষের যেন বাণ নেমেছে। ৭ লক্ষ মানুষের সামনে শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দিয়েই হঠাৎ করে চলে গেলেন। তিনি এলেন দেরীতে চলেও গেলেন হঠাৎ করে। আরো দেরীতে এলে হয়ত ১৪ লক্ষ মানুষ হতো। এখানে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের আরেকটি সাহসের কথা উল্লেখ করলেন। ১৯৬৪ সালের রায়টের সময় আদমজী জ্বলছিলো। প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্যে জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি ঢুকে গেলেন আদমজীতে এবং ১ দিনেই আদমজীতে রায়ট বন্ধ করে দিলেন- তা মোনায়েম খান পারেননি অনেক দিনেও।
নির্বাচন হয়ে গেল। শেখ মুজিবুর রহমান নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেল কিন্তু তাকে যে ক্ষমতা দেবে না তা আমরা বুঝতে পারলাম। সুতরাং আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা ওদের সাথে থাকবো না। আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। উই হ্যাভ টু ফাইট। এ সব ক্ষেত্রে ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু এক ছিলেন। ১৯৭১ ঘনিয়ে আসছে, আমরা নিকটবর্তী হতে লাগলাম। পার্টির কোন নেতৃত্ব নেই। আমরা যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছি। হাটখোলায় দুটো গাছ কেটে ফেললাম এবং ককটেল দিয়ে বোমা বানাতে লাগলাম। অবশেষে এসে গেলে সেই ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাতটি। প্রচন্ড দুর্বিষহ অবস্থায় কেটেছে রাতটি। আমি ছিলাম আমাদের হাটখোলার বাড়ির চিলে কোঠায়। ২৬শে মার্চ সকালে আমি দেখলাম আমাদের বাড়ির সামনে একটি লাশ পড়ে আছে। গাছ কেটে বাড়ির সামনে রাস্তার যে ব্যারিকেড দিয়েছিলাম তা পাকিস্তানী আর্মির একটি কামানের আগাতেই উড়ে গেল। বুঝতে পারলাম আমরা যা নিয়ে যুদ্ধের জন্য এসেছি তা কিছুই না। একটু পরে দেখি অভিসার সিনেমা হলের সামনে দিয়ে একটি লোক পানি আনতে যাচ্ছে। এ সময় গুলি করতে করতে পাকিস্তানী বাহিনী এই দিকেই আসছিলো। এই অবস্থা দেখে লোকটি মরার ভান করে মাটিতে শুয়ে পড়লো। পাক আর্মির নেতাটি কাছে এসে কয়েকটি লাথি মারলো। অবশেষে লোকটির মাথায় একটি পা রাখলো, অবস্থা দেখে বুঝতে পারলো লোকটি জীবিত। কাল বিলম্ব না করেই ঐ নরপিশাচ লোকটির মাথায় গুলি করলো। গুলি খেয়েই লোকটির দেহ ২ ফিট উপরে উঠে গেল এবং ধপ করে পড়ে মাটির সাথে লুটিয়ে গেল। কিছুক্ষণ ধপাধপি করার পর নিস্তেজ হয়ে গেল দেহটি। আমি ভয়াবহ রকমের শব্দ পেলাম। উত্তেজনায়, ক্ষোভে এবং দুঃখে আমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। কিন্তু ঐ মুহূর্তে আমার কিছু করার থাকে না। এই সময় তার চোখ বেয়ে পানি গড়াতে থাকে। ছবি তুলতে হাতের ইশারায় নিষেধ করেন। ছোট শিশুর মত অঝোরে কাঁদতে থাকেন। অনেকক্ষণ কাঁদার পর আবার শুরু করেন বেশ কয়েক মিনিট পর। আমরা যারা তার কথা শুনছিলাম তার অবস্থা দেখে আমাদেরও চোখে পানি এসে গেল। তার চোখ দিয়ে বন্যার মত পানি গড়াতে থাকল। আমি দেখছিলাম তারা যেন আমাদের বাড়ির দিকেই আসছিলো। আমি ভিতরে গেলাম গুলি কারার প্রস্তুতি নিলাম-কিন্তু পাক বাহিনী এদিকে না এসে ইত্তেফাকে বোমা মারল। দেখলাম ইত্তেফাক ভবন জ্বলছে। যুদ্ধের সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রটেক্ট করার জন্য ৪ টি লোক দেয়া হয়। তারা শেখ মুজিবকে পাহারা দেয়। ২৭ মার্চ আমার বোন আটকা পড়েছিলো আর্ট কলেজে। তাকে আনতে গেলাম। পথে দেখতে পেলাম লোকজনের লাশ ব্রিজের উপর পড়ে আছে। স্টেডিয়ামের কাছে আসতেই ফজল শাহাবুদ্দিন আমাকে বললেন, স্টেডিয়ামে অনেক গুলো লোক ঘুমাচ্ছে। আসতে আসতে দেখি আউটার স্টেডিয়ামে লাশের পর লাশ পড়ে রয়েছে। স্টেডিয়ামের কাছে এসে দেখি ‘ওরা ঘুমন্ত নয়-ওগুলো মানুষের লাশ।” লাশে ভরা মাঠ। একটু এগিয়ে দেখি আজাদ বয়েজ ক্লাবের সেক্রেটারী মোস্তাকের নিহত দেহ পড়ে রয়েছে ক্লাবের সামনে। (যদিও সে ছিলো উর্দুভাষী বিহারী)। তার একটু দূরে রিকশার পাঠাতনে বসে একটি লোক অঝোরে কাঁদছে, আর বলছে “রক্ত শুধু রক্ত, চারিদিকে রক্তের হলিখেলা’ ওরা এত মানুষ মারে কেন।” ঐ নরপিশাচগুলো দেবতুল্য প্যান্ট শার্ট পরা জিসিদেবকে মেরে ন্যাংটা অবস্থায় মাঠে ফেলে রেখেছে। জিসিদেবের লাশ দেখে আমি বলতে থাকি, জিসিদের নেই, আমি শহীদ মিনারে এসে বলতে থাকি শহীদ মিনার নেই। এ সময় আবারো তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখ দিয়ে অশ্রুর বন্যা বইতে থাকে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, আমি বেহুশের মত শহীদ মিনারে বসে কাঁদছি। এ সময় একটি জীপ আমার সামনে এসে থামলো এবং একজন বললো ‘গেট আপ, ডোন্ট ক্রাই’ বিভৎস অবস্থা দেখে আমার কান্না এবং কথা থেমে গেল। ফিরে এলাম বাড়ি। বাড়ি ফিরে এসে ছোট চলে গেল ইকবাল ও জগন্নাথ হলের অবস্থা দেখতে। জগন্নাথ হলের কাছে আসতেই আমার ছোট ভাই এর চোখে পড়লো- “ রক্ত দিয়ে লেখা বিপ্লব বেঁচে আছে” ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ ও পায়ের চিহ্ন দেখে বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়নি বিপ্লব মেডিক্যালের দিকে গিয়েছে। ঐদিন ভাই-বোনদের নিয়ে আমার জিঞ্জিরায় যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু বাবার নিষেধের কারণে যাওয়া হয়নি। ঐ দিন জিঞ্জিরায় লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলা হলো। বাবার আদেশ পালন করার কারণেই আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম। আমার বোনরা সেভ থাকলো। ঐ সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে নিরাপদে থাকলো আর সাধারণ মানুষগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলো। গ্রামের লোকরা ঢাকার অদূরে ডিমহনীতে মাওলার নেতৃত্বে জড়ো হতে থাকলো এবং অনেকেই বালু নদী দিয়ে নাকের মাধ্যমে গ্রামে ছুটতে থাকলো। কেউ জানে না কি হবে। এ সময় সমগ্র জাড়ি ছিলো পুরো অন্ধকারের মধ্যে। তারা কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিলোনা। দিক নির্দেশনাহীন হয়ে পড়লো পুরো দেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধু কোথায় ছিলেন আমরা জানি না। ২৭ মার্চ বিকেলে আমি মেজর জিয়া বলছি এই ঘোষণায় সমগ্র জাতি নড়েবড়ে বসলো, উজ্জীবিত হলো, ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধে। ২৭ তারিখের আগ পর্যন্ত আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত। তিনি বলেন যারা ২৫ অথবা ২৬ মার্চে প্রেসিডেন্ট জিায়ার ঘোষণার কথা বলেন সেটি ভুল। আমি নিজ কানে শুনেছি। “আমি মেজর জিয়া বলছি, বলে ঘোষণা” জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক। তবে জিয়া অন বিহাফ অব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন কী না এ প্রশ্নের জবাবে বলেন -তখন অত কিছু শুনার মত পরিস্থিতি ছিল না। ঢাকায় আমি মোশাররফের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করি। ঢাকায় প্রথম অস্ত্র ঢোকে ৩ নবেম্বর রামকৃষ্ণ মিশন রোডে- বর্তমানে যেটি ইনকিলাব ভবন। আমার বন্ধু আসফাক, সামাদ ও ফতেহ চলে গেল যুদ্ধে। খালেদ মোশাররফ বলছিলো -ছেলেদের নিয়ে আস। আমরা আলমসহ ১৭ জন তৈরি হয়েছিলাম ঢাকায় হিট করার জন্য। কিন্তু খালেদ মোশাররফ বললেন- আমাদের ঢাকা জয় করার দরকার নেই। কিন্তু পাক বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার জন্য সীমান্তে আক্রমণ চালানো হলো। এদিকে বেঙ্গল রেজিমেন্ট বলল সরকার গঠন করার জন্য। ভারতের ভিপি ধর চাইলো ১৭ এপ্রিলের পূর্বে সরকার গঠন করার জন্য। এ সময় তাজ উদ্দিন বললেন -আই এম দ্যা সরকার প্রধান। যুদ্ধে যাবার পর খালেদ মোশাররফ আমাকে ডেকে বলল- ‘তুমি যে জীবন দিতে এসেছো-এর বিনিময়ে কিন্তু কিছুই পাবে না’। স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিলো একটি অসাধারণ যুদ্ধ। ১১টি সেক্টরে ভাগ করে যে যার মত করে যুদ্ধ পরিচালনা করলেন। সিএনসি ওসমানী থাকলেও সেক্টর কমান্ডার নিজেদের মত করে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো- যদি ১১টি সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো বলে আমার মনে হয় না। কারণ তখন কেউ কারো কথা মানতো না। নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কেউ কারো নেতৃত্ব পছন্দ করতেন না। খালেদ, জিয়া এবং তাহের সহ সেক্টর কমান্ডাররা তাদের নিজ নিজ সেক্টর নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন আত্মসমর্পণ করেছিলেন- সেইদিন এসএস গ্রুপের ১৬ জন সদস্যকে ঢাকায় আনা হয়েছিলো। কারণ এসএস গ্রুপের লোকরা জানতো কি ভাবে বিল্ডিং টপকিয়ে ঘর থেকে লোক কিডনাপ করে বাইরে আনা যায়। ঐ দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি নিজে থেকে ধরা না দিতেন তাকে কিডনাপ করা হতো। ৩০ মার্চের পর স্কুল, কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা সহ সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ঐ দিনই ২০ পাউন্ডের বোমা দিয়ে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হোটেল উঠিয়ে দিলাম। এতেই পাক হানাদার বাহিনী উন্মাদ হয়ে গেল। ঢাকা শহরে বৃষ্টির মত গুলি চালালো। কারফিউ দিয়ে ঢাকা শহরের ২৮টি বাড়িতে রেইড করা হলো এবং অনেক লোককে গ্রেফতার করা হলো। আমার ছোট ভাই এসে কেঁদে কেঁদে বলল- সব শেষ। তখন আমার শরীর প্রায় রক্তশূন্য হয়ে পড়লো। সব শেষ মানে কী। সে জানালো আমার ভাই ভগ্নিপতিসহ ২২জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে পুরো দেশে গেরিলা হামলা শুরু হলো ১৭/১৮ সেপ্টেম্বর থেকে। সাভারের দিক থেকে নাসির উদ্দিন ইউসুফ এ্যাকশন শুরু করে দিয়েছে। পুরো যুদ্ধের ৯ মাস আমি খালেদের সহকারী ছিলাম। ঘুম কি জিনিস আমাদের চোখ বুঝেনি, বিশ্রাম কি জিনিস আমাদের শরীর পায়নি। যুদ্ধের সময় রাজাকারদের ধরা হলে পিটিয়ে মারা হতো। আর পাকিস্তানীকে ধরতে পারলে তাকে গুলি করে মারা হতে। একবার এক অপারেশনে খালেদ মোশাররফ আহত হলেন। অপারেশনটি ছিলো সারদা নদী অপারেশন। একটি গুলি এসে খালেদ মোশাররফের মাথায় ঢুকে গেল। এমনভাবে ঢুকেছে যে -ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছিলেন গুলিটা রয়েছে সেইফ জোনে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন গুলিটি খালেদ মোশাররফের মৃত্যু আগ পর্যন্ত ছিল। যেহেতু কোন দিন কোন অসুবিধা হয়নি সেহেতু তা বের করার প্রয়োজন পড়েনি। তিনি যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে আরো জানালেন অনেক মৃত যোদ্ধার পকেট পরীক্ষা করলে পাওয়া যেত বহু মর্মস্পর্শী চিঠি। যে সব চিঠিগুলো মুক্তিযোদ্ধারা লিখেছিলেন তাদের প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রী অথবা স্নেহময়ী সন্তানদের। ঐ চিঠিগুলো পড়লে এমনিতেই কান্না এসে যেতো। যুদ্ধের সময় কুমিল্লাতে লাশ নিয়ে যাবার সময় একবার আমার ছোট ভাই-এর সাথে দেখা হয়েছিল। তাকে বকমার্কা সিগারেট দিয়েছিলাম। আমরা শুধু একজন আরেকজনকে দেখেছি কোন কথা বলতে পারিনি। পরিচিত একজন এই অবস্থা দেখে বলেছিলেন -তোমরা কোন কথা বলনি কেন? তার উত্তরে বলেছিলাম -কী বলব। আমাদের তো বলার কিছুই নেই। কারণ তখনতো আমাদের কিছুই নেই। তখন আমরা দুই কমরেড। যুদ্ধ কখনো ভাল নয়। যুদ্ধ-যুদ্ধই। যোদ্ধারা লাশ দেখলে উদ্বেলিত হয়। যুদ্ধ মানুষকে হিংস্রতা এবং নৃশংসতা শিখায়। যুদ্ধ ছাড়া মানুষ মারা কঠিন কিন্তু যুদ্ধে মানুষ মারা অতি সহজ। আমরা যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে জীবনবাজি রেখে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি ঠিক তখন ভারতের উদয়পুরে অনেক রাজনৈতিক নেতা বাড়িভাড়া নিয়ে পূর্তি করেছিলেন। আগরতলাতে একটি ক্যাম্পে ছেলে-মেয়েরা এক সাথে থাকতো এবং ঐখানে দুনিয়ার বিয়েও হয়েছিল। যার পটভূমি ছিলো কলকাতা। যুদ্ধের পরে আমাদের কারণে খালেদকে বলা হলো বামপন্থী। এটাই ছিলো ইতিহাসের একটি ব্ল্যাক সাইড। মনি ছিলো বিএলএপএ। যে কারণে মনি খালেদের বিরুদ্ধে লেগেছিল। আমি মনে করি কাদের সিদ্দিকী সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের সময়ই ভারতীয়রা খালেদকে বলেছিল ১৫ ডিসেম্বর তোমরা ঢাকায় থাকবে। কেন বলেছিল তা বুঝেছিলাম অনেক পরে। কথা প্রসঙ্গে বললেন বাংলাদেশের ফাস্ট পিএম’র বক্তৃতাও নাকি তার লিখে দেয়া ছিল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সত্যবাদী লোক। কিন্তু ঐ দিন তিনি সিলেট চলে যেতে চেয়েছিলেন এবং ঐ অনুষ্ঠানে ছিলেন না। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন ভারতীয়রা দখল করেনি বলে দেশ রয়ে গেছে। কারণ দেশে তখন কোন প্রটেকশন ছিলনা।
শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধের পরে দেশে এসে রসিকতা করে বলেছিলেন- যুদ্ধ করেছি আমি ইতিহাসও লিখবো আমি। যুদ্ধের পরেই তাকে সবাই মিলে বলেছিলেন ন্যাশনাল গভর্ণমেন্ট করার জন্য। কিন্তু তিনি তা করলেন না। শুনলেন না কারো কথা। এখানে এক প্রশ্নের উক্তরে সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধু যদি যুদ্ধই ঘোষণা করেছিলেন তাহলে তিনি সারেন্ডার করলেন কেন? কেন তিনি ধরা দিয়েছিলেন পাকিস্তানী আর্মির কাছে। সিএনসি সারেন্ডার করলেতো যুদ্ধ সেখানেই শেষ। যুদ্ধের পরেও তিনি উদার হতে পারেননি, পারেননি দলীয় স্বার্থের উর্ধে উঠতে। তারপরই গড়ে তুলেন এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল। কেড়ে নেয়া হয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। গঠন করা হয় রক্ষীবাহিনী। কেড়ে নেয়া হলো সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত বাঙালীদের গণতান্ত্রিক অধিকার। মূলতঃ তখন থেকেই -বাংলাদেশে একদলীয় শাসনের সূত্রপাত। এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান পুরোপুরি পড়ে যান শেখ মনির পাল্লায়। ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন এ ঘটনায় জনগণের সার্পোট ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের বডি গার্ডকে রাস্তায় কুত্তার মত দৌড়াতে দেখা দেছে। যে শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতার দাপটে সংসদে এসে বলেছিলেন কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর একটি ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলেছিল কোথায় আজ শেখ মুজিবুর রহমান। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু সম্পর্কে বলেন হয়ত ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এ হত্যাকান্ডে মঞ্জুর জড়িত ছিল। ঐ সময় সেনাবাহিনীর এংগ্রী গ্রুপকে বান্দরবন পাঠানো হলো। কাজটি সহজে করা যায়। জিয়া তাদের সাথে বসতে চেয়েছিলেন। জিয়াকে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছিল। এটি আইএসআই’র প্রতিশোধমূলক ঘটনা।
রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী বলেন আওয়ামী লীগ সব কিছু দখল করে নিতে চায়। লাইক জুইস পিপল। তাই এই দলের কোন সহযাত্রী নেই এবং কখনো ছিলোও না। তারা মুক্তিযুদ্ধকেও তাদের দখলে আনতে চেয়েছিল।
বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সম্পর্কে বলেন, বিএনপি কোন রাজনৈতিক দল নয়। একটি মাল্টি ক্লাস ক্লাব। জিয়াউর রহমানের আদর্শেই চলছে। ধানের শীষ সেল হচ্ছে- খালেদা জিয়ার নাম সেল হচ্ছে না। বিএনপির ভোট আছে পার্টি নেই। জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে হয়ত জাতিকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারতেন। জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে ভুল ছিল-যুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছে তারা রাজনীতি করতে পারবে না সিদ্ধান্তটি না নেয়া। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত বাকশাল করেই এই পথটি তৈরি করা হয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তিনি বলেন, জামায়াতকে বাংলাদেশের জনগণই ঠেকাবে। তবে জামায়াত বিএনপিকে খেয়ে নেবে এবং তাদের ধ্বংস করে যাবে। জামায়াত বিএনপির ঘাড়ে বসে এনজিওয়ার মাধ্যমে প্রতি গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যাচ্ছে। জামায়াত একটি আদর্শভিত্তিক ক্যাডার সংগঠন। পথটা পেয়েছে অবশ্য আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে তার অভিমত অসম্ভব ইমপ্রেসিব মানুষ ছিলেন। সবার উর্দ্ধে নেতা মনে হয়েছে। তিনি ছিলেন সাহসী। তাকে কখনো প্রধানমন্ত্রী মনে হয়নি। এত বড় ব্যক্তি কীভাবে প্রধানমন্ত্রী হন। আসলে তিনি খেলায় মেতে উঠেছিলেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তার অভিমত-জিয়াকে আমি সোলজার হিসাবে চিনি। আসলে জিয়ার সাথে আমার ভাব থাকার কথা নয়। জিয়ার বুদ্ধিমত্তার কারণেই আমি তার কাছাকাছি চলে আসি। একদিন নরসিংদী থেকে আসার পথে তাকে আমি বলেছিলাম- আপনার ঘোষণা না পেলে আমরা অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম- অন্য কিছু চিন্তা করতাম। সেই জন্য আমি জিয়াকে সর্বোচ্চ আসন দিলাম।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী বললেন- দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে হলে সব কিছুতে ডেমোক্র্যাসি আনতে হবে। পার্টি থাকবে পার্টিতে ডেমোক্র্যাসি থাকবে না তা হতে পারেনা। শুধু পার্টি নয় পরিবারের মধ্যেও ডেমোক্র্যাসি থাকতে হবে। পার্টিতে ডেমোক্র্যাসি না থাকলে দেশেও ডেমোক্র্যাসি থাকতে পারে না। ডেমোক্র্যাসি ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যক্তি নির্ভর রাজনীতির বলয় থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ছেলে হলে ভাল স্কুলে আর মেয়ে হলে খারাপ স্কুলে পড়বে এটা কোন ধরনের ডেমোক্র্যাসি। কথা প্রসঙ্গে বললেন, বাংলাদেশ অসম্ভব সুন্দর দেশ। তাইত অনেকে ৪৩ বছর লন্ডনে থেকেও বরিশালে জমি কিনতে চান। হরতাল সম্পর্কে বললেন- দেশের মানুষ এখন হরতালকে পছন্দ করে না। হরতাল ডাকলে শহরের মানুষ গ্রামে গিয়ে চাষাবাদ করে। এই সব ডাইনেস্টি প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি খুব দৃঢ়তার সাথে বলেন, বাঙালী কোনদিন না খেয়ে মারা যাবে না। অদ্ভূত সুন্দর আমাদের বাংলাদেশ। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন- বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি কাজ করা যেতে পারে তাহলো -যিনি পার্টির প্রধান থাকবেন তিনি সরকার গঠন করবেন না। অন্যরা সরকার গঠন করবেন। নেত্রী না থাকলে বা সকলে না গেলে ভোট পাবে না এ ধরনের চিন্তা দূর করতে হবে। গ্রামে গিয়ে মানুষ চিনতে হবে, মানুষের সুখ, দুঃখে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। নেত্রীর নয় নিজের কাজে ও যোগ্যতায় মানুষের মন জয় করে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন মজার বিষয় কী জানেন- যেখানে সরকারের হাত নেই সেখানেই উন্নতি হচ্ছে। বেসরকারী প্রজেক্টগুলো দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে আর সরকারী প্রজেক্টগুলো লোকসানের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমি মনে করি লোকসানী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের বেসরকারীখাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। রসিকতা নয় তিনি বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন -আগেকার দিনের এমপিরা নির্বাচিত হবার পর দেন দরবার করতো নিজ নিজ এলাকায় কিছু করার জন্য। আর এখনকার এমপিকে টাকা দিতে হয় এলাকায় স্কুল করার পারমিশন নেয়ার জন্য। এই হলো বাংলাদেশের বর্তমান চালচিত্র।
সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী বলেন- মূলত বাংলাদেশী এবং বাঙালীর মধ্যে শব্দের কম-বেশি ছাড়া কোন পার্থক্য নেই। এটা নিয়ে দেশের মধ্যে বিরোধ চলছে। অযথা সময় নষ্ট করা হচ্ছে। বাঙালী বললে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক বলা যায় না। বাঙালী আবহমান। আওয়ামী লীগ বাঙালী বললে জাতির জনক হয়না-বাংলাদেশী বলে জাতির জনক বলা যেতে পারে। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, -আই এম ইংলিশ এটা কখনো হয় না। এই সব আওয়ামী লীগের হটকারী কথা বার্তা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিরোধী দলীয নেত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কেও শাহাদত চৌধুরী খোলামেলা কথা বলেছেন- তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারেন না। দুজন দুজনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন না। একজন আরেকজনের চেহারা পর্যন্ত দেখেন না, কথা বলাত দূরের কথা। এটাই হলো বাংলাদেশের ডেমোক্র্যাসির প্রধান বাঁধা। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাজে শব্দের মধ্যে ব্যবহার করেন বেয়াদপ, আর শেখ হাসিনা এত নোংরা কথা বলেন যা বলা যায় না এবং মুখেও কোন শিক্ষিত মানুষ বলতে পারেনা। যে দল যখন ক্ষমতায় আসে সেই দলের আত্মীয়-স্বজনরা তখন ঢাকায় চলে আসে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে শেখ রেহানা ঢাকায় চলে আসেন। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় নেই তাই শেখ রেহানা ঢাকায় নেই। তাছাড়া শেখ হাসিনাও বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকেন। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পার্টির মধ্য থেকে ত্যাগী নেতারা সরে যাচ্ছেন। কারণ দলের মধ্যে ডেমোক্র্যাসি নেই, চলছে টাকার খেলা। নব্য কোটিপতিরা রাজনীতির খুঁটি নিয়ে খেলা শুরু করেছে। এই খেলা কিছুদিন খেলবে। কথা প্রসঙ্গে বললেন- সাবের কেন মন্ত্রী হতে চায়? অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের হাতে খাতা ও কম্পিউটারের পরিবর্তে অস্ত্র তুলে দেয়া হচ্ছে। ওটা খুবই দুঃখজনক। নতুন প্রজন্মের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পুরো জাতিকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। এরি মধ্যে তাকে প্রশ্ন করা হয় ২০০০ এর নাম ২০০০ দেয়া হলো কেন? এই প্রশ্নের জবাবে ২০০০-এর সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী বলেন -বিচিত্রা ২০০০ করতে চেয়েছিলাম-আওয়ামী লীগ সরকার তা করতে দেয়নি। বিচিত্রা ছোট করে লিখবো বলেছিলাম কিন্তু তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাঈদ তার পরেও অনুমতি দেননি। ২০০০-এর নাম বিচিত্রা ২০০০ হলে পরিপূর্ণ হতো। অবশেষে সাপ্তাহিক ২০০০ ই রাখা হলো। সাংবাদিকতা জগতে কিভাবে এলেন? এই প্রশ্ন উত্তরে তিনি বলেন আমি তখন মিরপুর ক্যাম্পে। হাশেম ভাই আমাকে ফোন করে বললেন চাকুরি করবি- তখনই অস্ত্র হাতে ছুটে এসেছিলাম চাকুরি করতে। এভাবেই আমার সাংবাদিকতা জগতে আসা। তিনি আবারো ফিরে আসেন অস্থির রাজনীতি প্রসঙ্গে। বললেন- আজ সমাজ লুটেরাদের হাতে। বড় মাছ যেভাবে ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে ঠিক সেইভাবেই বুর্জয়ারা আমাদের দেশকে শেষ করে দিচ্ছে। ভুতের মত চেপে বসেছে বুর্জুয়া শোষণ। এই কড়াল থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছিনা। ক্ষমতা ধরে রেখে জমি দখলের চেষ্টা চলছে। আশুলিয়া দখলের চেষ্টা চলছে। তার পরিবারের কথা বলতে গিয়ে বলেন- বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি আমার মেয়েদের নিয়ে ভয় পাই। কে কখন এসিড মেরে বসে। আমি যুদ্ধ করেছিলাম ভাল থাকবো বলে। এত রক্তের পরেও কী যুদ্ধ শেষ হয়নি? এ সময় তিনি বেশ উত্তেজিত এবং ইমোশনাল হয়ে পড়েন- যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা কর। এরপরই তিনি ছোট্ট শিশুর মত অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তিনি যেমনভাবে কাঁদচিলেন যে -আমি আর কোন দিন আমার এই জীবনে এত বড় কোন মানুষকে এভাবে অসহায়ের মত কাঁদতে দেখিনি। অনেক্ষণ কাঁদলেন। আবার আবেগ আপ্লুত কক্তে বলতে শুরু করলেন- যদি অল রাজাকারকে কিল করতাম তাহলে এ অবস্থা হতোনা। অযোগ্য লোকজন দেশ পরিচালনা করছে। দেশ শাসন করছে। কান্নাজড়িত কক্তে বললেন -স্বাধীনতা তো মা- জন্মভূমিতো মায়ের মতন। মাকে স্বাধীন করতে যুদ্ধ করেছি। তাকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি যুদ্ধে লীড দিতেন তাহলে এত ভুল হতো না- আমি নিজে আমার বন্ধু ঝাকি, আসফিক ৪৬ জনের লাশ এক হাতে দাফন করেছি। আশা করেছিলাম শহীদদের নামে কিছু হবে, কিছুই হলো না। শেখ মুুজিবুর রহমান এসবের খেয়াল করতেন না বা করেননি। জিয়াউর রহমান শহীদদের নামে সড়ক নির্মাণ শুরু করেছিলেন এরশাদ এসে শেষ করলেন। রাজাকারদের প্রসঙ্গে ফিডেল ক্যাস্ট্যো একবার বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ইউ আর ফিনিসড, যারা যুদ্ধপরাধীদের তুমি ক্ষমা করে পুনর্বাসিত করেছো। ওয়ান প্রেসিডেন্ট ক্যান রান দি ক্যান্ট্রি। বুরক্রেটদের দিয়ে এখন দেশ পরিচালনা করা হচ্ছে। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলতাম। এখন আর বলিনা। অনেকদিন পর আবার বললাম। মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে নিজেকে স্বাভাবিকভাবে ধরে রাখতে পারিনা। উই লুজ এব্রিথিং-হোয়াট উই গেইন। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে কি হবে? দেশটা আজ কোন পথে? দেশের সোনার টুকরো ছেলেরা আজ বিদেশে কষ্ট করছে। গরীবের ছেলেমেয়েরা আজ দেশে লেখাপড়া করছে। রাজনীতিবিদসহ ধনাঢ্য শ্রেণীর ছেলে মেয়েরা বিদেশে পড়ছে। এই জন্য দেশ এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তাদের চিন্তা নেই। তারা জানে তাদের ছেলে মেয়েরা বিদেশে সেইভ আছে। তাদের গরীব বাবা-মায়ের মত উৎকক্তার মধ্যে থাকতে হয় না ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে অথবা স্কুলে পাঠিয়ে। তাদের ছেলে লাশ হয়ে ফেরার অথবা মেয়েরা এসিড খেয়ে বাসায় ফেরার সম্ভাবনা থাকে না। বর্তমানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য ফার্স্ট চয়েজ হচ্ছে আমেরিকা অথবা কানাডা। এই ভাবেই দেশের ৮৫% মেধা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলো জানে কী ভাবে উন্নয়নশীল ও গরীব দেশ গুলোকে ধ্বংস করা যায়। মাত্র ১৫% জন সংখ্যার জন্য ৮৫% মেধাকে নিয়ে আসা হচ্ছে।
আবারো তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথায় ফিরে আসেন- বললেন খসরুর মত গুন্ডাকে নির্বাচনে দাঁড় করানো। আওয়ামী লীগ না করলে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেয়া হতো না। ৫ লাখ মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ছাপা হলো পথ কলি থেকে। ঐ সার্টিফিকেটগুলো নিতে আসেন কর্ণেল হারুন। জিজ্ঞেস করতেই বললেন- আক্স ইউর লীডার। তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলেন- ১৯৭২ সালে সত্তর বছর বয়সী আমার বাবা জাজ সাহেবের বাড়ি তল্লাসী করা হলো অস্ত্র আছে বলে। আমি একজন ফ্রিডম ফাইটার হিসাবে এই ছিলো আমার প্রাপ্য। মুক্তিযোদ্ধা ছেলের সামনে একজন সৎ বাবার অপমান। আবারো তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার কতা বলতে গিয়ে বলেন- একজন ফ্রিডম ফাইটার যে দেশ স্বাধীন করেছে তাকে মরতে হলো একজন হাইজ্যাকার হিসাবে। সৎভাবে বাঁচার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল মুক্তা, কিন্তু সে পারেনি। দেড় বছরের মাথায় ওয়ার্নিং ব্রেক করতে গিয়ে পুলিশের ৮টি গুলি খেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। স্বাধীন দেশে সন্ত্রাসী, লুটেরা, হাইজ্যাকার ও চাঁদাবাজ নেতাদের ছেলেদের গুলি করে মারা হয় না-মারা হয় একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধাকে। ওরা জানেনা একবার যুদ্ধ করলে মানুষ যে সুস্থ থাকে না। যে এসপি মুক্তাকে গুলি করেছিলো তাকে বলেছিলাম অমুককে কে গুলি করল কিন্তু সে কোন কথার উত্তর দেয়নি? বাংলাদেশে সবাই ক্ষমতায় গেলে ভুলে যান। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে পরনে সাধারণ সুতি শাড়ী, ক্ষমতায় গেলে একজন পরেন শিপন অন্যজন পড়েন লক্ষ টাকার ইন্ডিয়ান শাড়ী। নেতা হলেই সব কিছু পাল্টে যায়- এটা হিপোক্রোসী। কথা প্রসঙ্গে বললেন বাকশাল করলে আজ বাংলাদেশ শেষ হয়ে যেত লাইক রাশিয়া। প্রেস ক্লাব সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি প্রেসক্লাব জার্নালিজমে বিশ্বাস করিনা -যে কারণে তিনি প্রেস ক্লাবে যাননা। তিনি বলেন- প্রেস ক্লাবে যাওয়ার মানে হচ্ছে -সটকার্টে জার্নালিজম শিখা।
তার নিজের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- আমি বুঝতে পারি মানুষ কী চায়? আমার জীবনে যে সময়ে যা করা উচিত ছিল আমি তাই করেছি। আমি মানুষের চরিত্র বুঝতে পারতাম। তিনি বলেন, ডোন্ট ফলো দ্যা নিউজ, ইউ ক্রিয়েট দ্যা নিউজ। তারপর বললেন- আমাকে নিয়ে কতগুলো কথা প্রচলিত আছে। বিচিত্রার বিশেষ ক্ষমতা ছিলো। যেই ক্ষমতায় আসতেন তিন দিনের মাথায় ফোন করতেন। জিয়াকে নিয়েই বেশি কথা প্রচলিত ছিল। কারণ জিয়াউর রহমানের সাথে আমাকে অধিকাংশ জায়গায় যেতে হতো এবং পাশাপাশি সিটে বসতাম। তার সাথে যতক্ষণ থাকতাম তথক্ষণ আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ হতো। মজার বিষয় হলো আমার কোন কথা ভাল লাগলে তিনি তা বাস্তবায়ন করতেন। অনেক বিষয়েই তার সাথে আমার কথা হতো। জিয়াউর রহমান ছিলেন সৎ লোক। তার সাথে মিশতে ভাললাগতো। হরহামেশাই তার সাথে কথা বার্তা হতো।
পত্রিকার কারণে তার সাথে আমার কথা বার্তা হতো। প্রবাসে যেমন ঠিকানার জন্য সাঈদ-উর রবের সাথে কথা বলতে চায়- দেশেও ঠিক তেমনিভাবে বিচিত্রা এবং ইত্তেফাকের জন্য সবাই কথা বলতে চাইতো- যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করতো। তিনি আরো জানালেন জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই ছিলো বিচিত্রার সর্বোচ্চ বিত্রিত সংখ্যা। এরশাদ সম্পর্কে বললেন এরশাদ একটা ভাওতাবাজ। তাকে সব সময়ই আমার হিপোক্রেট মনে হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি একটি গল্পও বলেছিলেন আর তাহলো একদিন সব এডিটরের সামনে লুকিয়ে এরশাদ আমাকে একটি কবিতা দিয়েছিলেন। অন্যরা ভেবেছিল না জানি কী দিয়েছে। এরশাদ রাজনীতিকে বাণিজ্যে পরিণত করেছিলেন। তবে এরশাদের একটি উপকারের কথা তিনি উল্লেখ করেন। একবার তিনি মেক্সিকোতে যাবার পর তার সব চুরি হয়ে গিয়েছিল। মহা বিপদে পড়েছিলেন তিনি। সেই সময় এরশাদ তাকে মেক্সিকো থেকে দেশে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন।
তারেক জিয়ার রাজনীতিতে আগমন সম্পর্কে বললেন- ভারতবর্ষে রাজনীতির এই ধাপটি অব্যাহত আছে- উত্তরাধিকারীই হবেন পার্টির প্রধান। ভারত বর্ষে লিগাসি তৈরির চেষ্টা করেও উত্তরাধীকারীর দাবি নিয়ে আসছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য প্রীতিকর নয়- ডাইনেস্টি বাঁচিয়ে রাখে। ইউরোপে রাজতন্ত্র রয়েছে এটা বিস্ময়কর লাগে। তারেক এখন রাজনীতিতে না এলে ভাল করতো। সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স তৈরী হচ্ছে যেটা খারাপ। ইরাকে ও আমেরিকায় যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন- সাদ্দামের সঙ্গে আমেরিকার এখন যোগাযোগ আছে। হি ইজ এ সি আইএ ম্যান। যুদ্ধের দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই- সাদ্দামের কোন বাহিনী যুদ্ধে অংশ নেয়নি। সাধারণ ইরাকীরাই যুদ্ধ করেছিল। ইরাকীরা অসম্ভব সাহসী। যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন এরকম মানব ধ্বংসী বোয়িং আর কোন দিন দেখিনি।
একুশ টিভি বন্ধ করে দেয়া ঠিক হয়েছে কি না এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশে এটা বন্ধ হয়েছে। একুশে টিভির পারমিশনটাই ছিল ভুল। একুশে টিভির মালিকানার সাথে নাকি তৎকালীন সরকারের আত্মীয় স্বজনরা জড়িত ছিল বলে শুনা গিয়েছিল। আর এটা খুব জটিল বিষয়। সেই সাথে বাংলাদেশ টেলিভিশনের শায়ত্বশাসন সম্পর্কে বলেন বাংলাদেশের দলীয় সরকারগুলো মনে করে আমার পয়সা দিয়ে অন্যের কথা বলবে এটা হয়না। বাংলাদেশ টেলিভিশনে চলছে প্রতিযোগিতামূলক চামচাগিরি।
নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাংবাদিকদের পথিকৃত শাহাদত চৌধুরী বলেন, এক সময় ঢাকা শহরে মোট ১১টি গাড়ি ছিল সিভিল লোকদের তার মধ্যে একটি ছিল আমার বাবার। আর সেই বাবার ছেলে শাহাদত চৌধুরী মাত্র ৭ লাখ টাকা ঋণের জন্য আমার বহু স্মৃতি বিজড়িত হাটখোলার বাড়িটি বিক্রি করতে হলো। অথচ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিচিত্রা বন্ধ করে দিয়ে আমার ১৪ লাখ টাকা আটকে রাখে। আমাকে বলা হয়েছিল ক্যামেরা সামনে গিয়ে চেকটি গ্রহণ করতে কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি বলেছিলাম আমি যেভাবে আমার বেতন ওঠাতাম সেইভাবে আমার টাকা নেব যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তার পুরো সময়ে আমার টাকা আটকিয়ে রেখেছিল। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমি আমার প্রাপ্য টাকা পেয়েছিলাম। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি যে সারাদিন কাগজ ছিড়তেন সেই অভ্যাস কী এখনো আছে- এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন না। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি নিয়ে নাকি তিনি ডাক্তারের কাছেও গিয়েছিলেন। ডাক্তার তাকে বলেছিলেন হয়ত তিনি ইন সিকিউর ফিল করেন অথবা তার রুমটি ছোট হবার কারণে অথবা অনেকগুলো চিন্তা একসাথে করার কারণে এই কাগজ ছেঁড়ার কাজটি করেন। তার রুমটি বড় করার কারণে সারাদিন কাগজ ছেঁড়ার অভ্যাসটি তার বলে যায়।
প্রবাসীদের সম্পর্কে বলেন বাংলাদেশের উন্নয়নে ৪ ধরনের নায়করা অবদান রাখছেন। এর মধ্যে প্রবাসীরা হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর নায়ক। জনশক্তিই হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশে কিছু হলে প্রবাসীরা সাপোর্ট করবে এবং সার্বভাইব করতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সার্ভিস অরিয়েন্টেড অর্থনীতি। ইন্টারটেইমেন্ট বিজনেস সারা বিশ্বকে অদ্ভূত জগতে নিয়ে যাচ্ছে একথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন- একদিন হয়ত বাঙালী আমেরিকার কৃষি দখল করবে। কথার শেষ দিকে এসে শাহাদত চৌধুরী বললেন বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি। আমার বুকের মধ্যে আছে স্বাধীনতা। আমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপে যেন মুক্তি যোদ্ধার রক্ত জড়িত। মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে এখনো শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন কথা বলে। আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা এবং দেশ হচ্ছে মায়ের মত। এক শ্রেণীর মানুষের কাছে স্বাধীনতা এখন শো পিস। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাকে মানুষ সম্মান করেছে- করেনি সরকার এবং রাষ্ট্র। এর জন্য মুক্তিযোদ্ধারাও দায়ী। আমরা জাতি সত্তাকে যুুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারিনি। লুঙ্গি পরা মুক্তিযোদ্ধার সাথে প্যান্টশার্ট পরা মুক্তিযোদ্ধাদের মিলাতে পারিনি। বাঙালী গ্রেট নেশন -সবাই যুদ্ধ করেছে। এর অংশিদারিত্ব সারা জাতির। কোন পার্টি বা ব্যক্তির নয়। সবশেষে বললেন- বাংলাদেশ অদ্ভূত সুন্দর দেশ, পৃথিবীর সেরা দেশ। বাংলাদেশের মানুষ কোন দিন না খেয়ে মারা যাবে না।