ঠিকানায় সাঈদ রহমান মান্নানের সর্বশেষ সাক্ষাৎকার

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের শরীয়রতপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার একটি অজপাড়া গাঁ থেকে প্রথমে পুরনো ঢাকা। এরপর ঠিকানায় মান্নানের সর্বশেষ সাক্ষাৎকার পুরনো ঢাকা থেকে কুয়েত ঘুরে ঢাকায় ফিরে ভাগ্যচক্রে একদিন ওপি-ওয়ানে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইট্স। সেই ১৯৯০ সালে শুরু করেছিলেন যাত্রা। মাত্র ৫০০ ডলার হাতে নিয়ে পা রেখেছিলেন বিশ্ব রাজধানীখ্যাত নিউইয়র্কে।

তারপর থেকে অনেক সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতীক্ষার পর এক সময় সুখের সন্ধান পেয়েছেন। শুরুতে কঠিনসব কাজ করেছেন। আসার পর প্রথম ১৫দিন রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন। এরপর টানা ছয় থেকে সাড়ে ছয় বছর কেটে গেছে বাসবয় হিসেবে। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত নেন- অনেক হয়েছে, আর চাকরি নয়, এবার ব্যবসা করবেন। তাই বেছে নেন দেশের মুদি দোকানের সঙ্গে সামঞ্জন্স্যপূর্ণ ব্যবসা গ্রোসারি শপ।

আজ তিনি নিউইয়র্কে একজন সফল বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তার নাম সাঈদ রহমান মান্নান। মান্নান ভাই নামে সবার কাছে সুপরিচিত। সেই থেকে হালাল ফুডের মাধ্যমে বাংলাদেশি ও অন্যান্য কমিউনিটির মানুষের সেবা করে আসছেন। গড়ে তুলেছেন একের পর এক সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার অধীনে এখন কাজ করছেন ১২০ জন। তিনি ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টাই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছেন এসব প্রতিষ্ঠান।

মাত্র আড়াই মাস আগে হঠাৎ করেই তার লিভার ক্যান্সার ধরা পড়ে। রুটিন চেকআপে গেলে সব চেকআপ করার পর জানতে পারেন তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত! কত দিন বাঁচবেন- এমন সময়ও বেঁধে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু কোন কিছুই তাকে হতাশ করতে পারেনি। এ নিয়ে তিনি সামান্যতমও চিন্তিত নন। এখনও নিয়মিত কাজ করছেন। অদম্য মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি নিজেই জানালেন তার সেই ব্যবসা শুরুর গল্প। তিনি বলেন, এটি ১৯৯৬ সালের কথা। তখন এখানে চাকরি করে হাতে টাকা জমেছে ৩৫ হ্জাার ডলারের কিছু বেশি। সেই পুঁজি দিয়েই ব্যবসা শুরু। মান্নান গ্রোসারি। ওই সময়ে নতুন ব্যবসা শুরু করায় অনেক কিছুই বুঝতে পারিনি। তাই দেখা যেতো, অনেক সময় মিট কাটিং মেশিন চালালে কারেন্টের লাইন বন্ধ হয়ে যেতো। আবার অন্য একটি কাজ করতে গেলে তখন নতুন আরেকটি সমস্যা। এভাবে কত যে সমস্যা হয়েছে, আস্তে আস্তে দিন যতো গেছে, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়েছে। আমার স্ত্রীকে সাথে নিয়েই ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন যদিও তিনি পুরোদমে গৃহিণী। তবে একসময় তিনি ব্যবসার উন্নতির লক্ষ্যে আমার পাশে দাঁড়িয়ে অনেক কাজ করেছেন।

মান্নান গ্রোসারি দিয়ে শুরু করে আজ তিনটি মান্নান সুপার মার্কেট, মান্নান বেকারি, মান্নান ডিসকাউন্ট স্টোর, মান্নান হালাল সুপার স্টোরসহ বিভিন্ন স্টোর গড়ে তুলেছেন।

ব্যবসায় এখন কত পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে সেভাবে কখনোই হিসাব করে দেখিনি। যখন যেখানে যা প্রয়োজন হয়েছে, ইনভেস্ট করেছি। কোনদিন লাভ-লোকসান যেমন হিসাব করিনি, তেমনি কোন কিছুই হিসাব করিনি।

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আসলে কোনদিন হিসাব করার প্রয়োজনবোধ করিনি ঠিক কত অর্থ, ধন-সম্পদ আমার আছে। তাই আমি নিজেও বলতে পারবো না। তবে সবই আছে আল্লাহর রহমতে। সাঈদ মান্নান জানান, ১৯৯৬ সালে আমি ব্যবসা শুরু করেছি। এরপর আস্তে আস্তে তা বাড়িয়েছি। আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। তবে সেটা এখনও বলতে পারি না। পরিকল্পনা আগেভাগে করে আমার কিছু হয় না। তাই এখনও তেমনটি হবে না।

তিনি বলেন, দেশ থেকে যতটুকু মনে পড়ে ৫০০ ডলার নিয়ে এসেছিলাম। তখন দেশে পুরনো ঢাকায় মুদি দোকান ছিল। ওই সময়ে ব্যবসা ভালই ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, লেখাপড়া করতে আমার একেবারেই ভাল লাগতো না। কেন জানি না ওইদিকে কোনদিনই মন বসাতে পারিনি। আমি ছিলাম বাবার সাত সন্তানের মধ্যে ছেলেদের মধ্যে বড়। ১৯৭৪ সালে আমাদের বাড়িতে একবার ডাকাত পরেছিল। ডাকাতরা বাবাকে গুলি করে। এরপর বাবা বিছানায় ছিলেন প্রায় ৩ বছর। এ কারণে আমাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। জীবনের প্রয়োজনে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের অজপাড়া গাঁ থেকে ঢাকায় পা রাখি। এসে কী করবো, প্রথমেতো তা বুুঝতেই পারছিলাম না। এজন্য শাহজাহানপুরের আটার মিল থেকে কম দামে আটা কিনে এনে সদরঘাটে বিক্রি করতাম। এভাবেই বেশ কয়েক বছর চলেছে। পরে আস্তে আস্তে নিজেই দোকান দিয়েছি।

ঢাকায় দোকান করা অবস্থায় ভাগ্যান্নেষণে কুয়েতে যাই। সেখানে ছিলাম প্রায় ছয় বছর। এরপর চিন্তা করলাম, আরব দেশে যে বৈষম্য, তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই সেখান থেকে ফিরে আমি চিন্তা করলাম আর বৈষম্যের দেশে যাবো না। এমন দেশে যাবো, যেখানে কোনো বৈষম্য নেই। আমার টার্গেট ছিলো ইউরোপ বা আমেরিকা। সে সময় হঠাৎ করেই ওপি-ওয়ানের সুযোগ এলো। আমি আবেদন করলাম। সত্যি বলতে কি, আমি নিজে ফরম ফিলাপ করিনি। কৃষি ব্যাংকে চাকরি করতো আমার এক বন্ধু। ও আমাকে নিজ হাতে ফরম ফিলাপ করে দেয়। আজ আমি এখানে, আর সে হয়তো আজও কৃষি ব্যাংকেই চাকরি করে কিংবা অবসরে গেছে। তার সঙ্গে আমার বহুদিন ধরে তেমন একটা যোগাযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে আসার গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি যখন আমেরিকার ইমিগ্রেশনে আসলাম, তখন ইমিগ্রেশন অফিসার বললেন, ওয়েলকাম, ওয়েলকাম টু ইউএসএ! এসে দেখলাম এখানকার মানুষ অন্যরকম! অনেক সহযোগিতা করে। এ পর্যন্ত আসতে অনেকের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছি। প্রথমে গ্রোসারি স্টোর চালু করার পর ক্যাশ রেজিস্ট্রার চালাতে পারতাম না। তখনও পরিকল্পিত স্টোর করা যায়নি। কিন্তু এখনতো আমরা চাইলেই একটি স্টোরের লেআউট করতে পারি। পরিকল্পনা মাফিক সবধরণের ডিজাইন আগেই করতে পারি।

তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানে এখন ১২০ জনেরও বেশি স্টাফ কাজ করছেন। এর মধ্যে এদেশিও স্টাফের সংখ্যা প্রায় ১০-১৫ জন। তিনি বলেন, দেশের মানুষকে কাজ দেওয়ার একটি কারণ হলো- আমার নিজের দেশের মানুষের উপকার করা। তাদের জন্যও আমি কিছু করতে পারলাম।

তিনি বলেন, দিন যতোই যাচ্ছে, এখানে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ততো বাড়ছে। আর এ কারণে ব্যবসাও অনেক বেড়েছে। আমরাই যে কেবল দেশ থেকে সবকিছু আমদানি করছি এমন নয়, আমরা বাংলাদেশের পণ্যও এখান থেকে কিনতে পারছি। এখানেও পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছেন।

মান্নান বলেন, এদেশে বাংলাদেশি পণ্যের ভাল বাজার রয়েছে। যদি ফ্রোজেন ছাড়া সরাসরি শাক-সবজি আনা যেতো তাহলে আরও ভাল হতো।

তিনি বলেন, এখন সবই আসে ফ্রোজেন হয়ে। ফ্রোজেন না হলে আরও বেশি পণ্য আসতো। ফ্রোজেন করার জন্য যেমন সময় লাগে, তেমনি খরচও বেশি।
তিনি বলেন, এ ব্যাপারে যদি দুই দেশের সরকার আলোচনা করে ঐক্যমত হতে পারে,তাহলে ভাল হবে।

মান্নান বলেন, ঢাকা-নিউইয়র্ক-ঢাকা বিমানের রুটটিতে বিমানের ফ্লাইট বন্ধ আছে অনেক বছর। আমরা অনেকদিন ধরেই দাবি করে আসছি, যাতে ফের এ রুটে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট চালু করে। কিন্তু সেটাতো হবে হবে করেও আর হচ্ছে না। এ ফ্লাইট চালু হলে পণ্য ও কার্গো পরিবহণে অনেক সুবিধা হতো ব্যবসায়ীদের। এ বিষয়গুলো সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, এখানে যারা আসছেন, তাদের জন্য ব্যবসার দারুণ সুযোগ আছে। তারা করতে পারেন গ্রোসারি কিংবা সুপারশপসহ বিভিন্ন ব্যবসা। একটি নতুন সুপারশপ করতে হাফ-এ-মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন। তবে সব পয়সা নিজে বিনিয়োগ করতে হবে, এমন নয়। এখানে ব্যবসায় টিকে থাকতে বিশ্বাস অর্জন একটি বড় ফ্যাক্টর। সেইসঙ্গে দরকার ক্রেডিট স্কোর। আমরাতো এখন এমন পর্যায়ে আছি যে, চাইলে আমরা যেকোন কোম্পানি থেকে ক্রেডিটে অনেক বেশি পণ্য নিতে পারি। ব্যবসার দীর্ঘপথ পরিক্রমায় আমাদের এই বিশ্বাসটা অর্জন করতে হয়েছে। নতুন ব্যবসায়ীদের এটি অর্জন করতে কমপক্ষে ৩-৪ বছর লাগতে পারে।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেক সময় দ্বন্দ্ব-বিভেদ দেখা যায়। প্রফেশনাল জেলাসিও রয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আসলে জেলাসি করে কিছুই হবে না। একটি দোকান ভাল চললে দেখা যায় পাশেই আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। এতে করে অনেক সময় বিক্রেতা হয়তো ভাগ হয়ে যায়। তবে যার প্রতি ক্রেতাদের বিশ্বাস বেশি তারা আসবেই। আমি মনে করি, আমাদের মধ্যে ঐক্য থাকা জরুরি। আর এ ঐক্যের স্বার্থে হিংসা ও ভেদাভেদ কিছু থাকলে সেটা ভুলে যেতে হবে। আসলে একটি কমিউনিটি তখনই ভাল ও উন্নতি করবে, যখন নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পারবে।

তিনি বলেন, আমাদের কমিউনিটিতে অনেক সময় অনেক ঘটনা ঘটে, অনেক কথা শোনা যায় ,কিন্তু তারা কেন এমনটা করে, আমি আজও এর কোন কারণ খুঁজে পাই না।

মান্নান বলেন, আমার সাথেও এমন হয়েছে, অন্যরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছে। এক সময় আমার কাস্টমার ছিলেন, তারাও কেউ কেউ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছেন। আমি তাদের ওখানে গিয়েছি, তাদেরকে সহায়তা করেছি। অনেক সময় তাদের দোকান থেকে কেনাকাটাও করেছি। বলেছি, কোন সহায়তা লাগলে আমি তাও করবো। সেই হিসাবে কাজও করেছি। আমি আসলে অন্যের কাজ বা নেতিবাচক কথাকে কখনোই গুরুত্ব দেই না।

কারণ এতে প্রকৃত অর্থে কোন লাভ নেই। এ কারণে আমি সবসময় নিজেকেই গুরুত্ব দেই। আর সে অনুযায়ী কাজ করি। আমি সব সময় যেকোনো ধরণের কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি থেকে দূরে থাকি। ভুল বুঝাবুঝি হবে এমন কোন কাজও আমি করি না। তাই এগুলো আমার কাছে কোন সমস্যাই নয়। এমনকি আমার সঙ্গে যারা কাজ করে, এরমধ্যে অনেকেই আছে যারা বেশি কাজ পারে, তাদের বেতনও বেশি। কিন্তু আমি মিটিংয়ে তাদেরকে বলি যে, আপনাদের যাদের বেশি বেতন, আপনারা যারা বেশি দক্ষ, তারা কখনোই অন্য আর একজনকে ডমিনেট করবেন না।

সাঈদ রহমান মান্নান জ্যাকসন হাইটসকে তার ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে বেছে নেয়ার বিষয়ে বলেন, আমি যখন প্রথম ব্যবসা শুরু করি, তখন এ এলাকায়ই করেছিলাম। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছিল এখানেই ভালো ব্যবসা হবে। তখনও এ এলাকায় অন্য কমিউনিটির মানুষজন বেশি থাকতো। বাইরে থেকে লোকজন আড্ডা দিতে আসতো। তখন পাকিস্তানি ও ভারতীয় পণ্যের দখল ছিল। সেই বাজার আজ বাংলাদেশি পণ্য অনেকটাই দখল করে নিয়েছে। আমাদের এখানে আমরা সব ধরণের পণ্যই রাখি, যাতে একজন কাস্টমারও এসে ফেরত না যান।

তিনি আবারও ফিরে আসেন নিজের সাফল্যের পেছনের ইতিহাসে। বলেন, আবার বাবা দেখে গেছেন যে আমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। আর এ প্রতিষ্ঠা শুধু আমার একার নয়, আমার পরিবারের সদস্যরাও উপকৃত হয়েছে। আমার ভাই ও তার পুরো পরিবার এখানের সিটিজেন। এখন তারা দেশে থাকে। বোনও একজন থাকেন এখানে। আর এক বোন ইতালিতে। এছাড়া অন্যরাও আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।

মান্নান বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেন, আমি সব সময়ই চেষ্টা করছি যাতে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে পারি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেকেই আজকাল এখানে আসেন। তাদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, যদি তারা ভালো থাকতে চান, তাহলে এখানে এসে লেখাপড়াটা করা ভালো। একবার কষ্ট করে লেখাপড়া শেষ করতে পারলে সারাজীবন ভালো থাকতে পারবেন। আর যদি লেখাপড়া না করেন, তাহলে হয়তো সারাজীবন থাকতে পারবেন, কিন্তু কষ্ট থেকেই যাবে।

নিজের কথাই বলি, আমি লেখাপড়া করিনি। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে লেখাপড়া করেছে। ভালো করছে। বড় ছেলে ব্যবসায় যোগ দিয়েছে। ছোট ছেলে পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করছে। আর মেয়ে বারুখ কলেজে বিজনেসে পড়ছে। আমি নিজে না পড়লেও তাদেরকে লেখাপড়া করিয়েছি। তারা আগামী দিনে আরো ভালো করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

বাংলাদেশি যারা এখানে এসেছেন, তাদের অনেকেরই সন্তান এখানে ভালো ফল করছেন। তারা এ দেশের মূলধারার সঙ্গে মিলে আগামী দিনে অনেক কিছু করতে পারবে বলে আমি আশাবাদী।

সাঈদ রহমান মান্নান এখন অসুস্থ। আড়াই মাস আগে জানতে পারেন তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। ইতোমধ্যে দুইবার কেমো দেয়া হয়েছে। আর আগামীতেও চিকিৎসা চলবে।

চিকিৎসকরা কোন টাইম ফ্রেম বেঁধে দিয়েছেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা একটি টাইম ফ্রেম বেঁধে দিয়েছেন। সেটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিষয়। তবে আমি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি। হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহ, তিনি যতদিন হায়াত রেখেছেন, ততোদিন বেঁচে থাকবো। এজন্য মন খারাপ করে কোন লাভ নেই।

তিনি বলেন, আমি চিকিৎসা নিচ্ছি, আর রুটিন মেইনটেইন করছি। আমার অসুস্থতার খবর শুনে নারী-পুরুষ অনেকেই সহানুভুতি জানিয়েছেন। এটা আমার খুব ভাল লেগেছে।

তিনি বলেন, আগে দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টা কাজ করতাম। এখনও ১৫ ঘন্টার বেশি কাজ করি। সব কিছুই স্বাভাবিক গতিতে রাখার চেষ্টা করছি। ঘুমাই ৪-৫ ঘন্টা। তবে আমি এখনও হতাশ নই। যখন যে অবস্থায় আমি থাকি না কেন, আমি সব সময় নিজেকে সুখি ভাবার চেষ্টা করেছি। এজন্য কোনদিন অসুখি ভাবতে হয়নি।

তিনি বলেন, আমি নিজেও যখন যে কাজ করেছি, সবসময় সে কাজটাকে এনজয় করেছি। যদি তা না করতাম, হতাশ হতাম, তাহলে আর এগুতে পারতাম না। তাই অন্যদের প্রতিও আমার পরামর্শ হলো- আপনি যে অবস্থানে যখনই থাকেন না কেন, কাজটি ঠিক মতো করুন, আর নিজেকে সব সময় সুখি ভাবুন। এতে করে ভাল থাকবেন। কারণ সন্তুষ্টি না থাকলে কখনো শান্তি আসবে না।

তিনি বলেন, আমার অসুস্থতাও আমাকে দমাতে পারেনি। আমি এখনও কাজ করি। দোকানে হয়তো আজকাল কম আসি। কিন্তু কাজ করতে এখনোও ভালবাসি। ছেলে এখন ব্যবসার অনেক কিছুই বুঝে নিয়েছে, এজন্যই কাজ কম করতে হয়।

মান্নান বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশিরা যে দেশে যেভাবেই যাওয়ার সুযোগ পাক না কেন, তাদেরকে বেশি বেশি করে দেশের বাইরে যেতে হবে। কারণ এতে দেশের রেমিট্যান্স বাড়বে।

তিনি বলেন, এখানে এখন অনেক বাংলাদেশি সমস্যায় পড়ছে, এর মূল কারণ হলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য না থাকা। তাদের উচিত হলো কোনো ধরণের দ্বন্দ্ব-বিবাদে না জড়িয়ে নিজেকে সংযত রেখে কাজ করা। কারো সঙ্গে অহেতুক ঝগড়া-বিবাদে জড়ানো ঠিক না।

সাঈদ মান্নান প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হলেও ব্যক্তি জীবনে তিনি তেমন বিলাসিতা পছন্দ করেন না, কেবল দামি ব্রান্ডের ড্রেস পড়া ও দামি গাড়ি ব্যবহার করা ছাড়া। তিন বছর পর পর গাড়ি বদল করেন। বলেন, আমি দেশে থাকতেও দামি জুতা পড়তাম। একটা জিনিস পছন্দ হলে সাথে সাথে না কিনতে পারলেও নজরে নজরে রাখতাম। এরপর দুই বছর পরে হলেও সেটা কিনতাম। যে দোকানে জিনিসটা পছন্দ হতো, প্রায়ই গিয়ে দেখে আসতাম সেটা আছে কিনা! এরকম বেশ কয়েকবারই হয়েছে। পরে আবার যখন পয়সা জমেছে তখন কিনেছি।

তিনি বলেন, আমি লেখাপড়া করতাম না বলে আমার বাবা মায়ের দুশ্চিন্তা ছিল ভবিষ্যতে আমি কিছু করতে পারবো কি না। বাবা-মায়ের ভয় ছিল আমি হয়তো না খেয়ে মারা যাবো! কিন্তু আজকে আমি যেখানে এসেছি, সেখানে কেবল সততা ও নিষ্ঠার জোরে এসেছি।

তিনি বলেন, আমি খেতে ভীষণ পছন্দ করতাম। এখনও খাই। তবে এখন সব অর্গানিক খাবার খাই। আর অনেক খাবারেই নিয়ন্ত্রণ আনতে হয়েছে অসুস্থতার পর থেকে। সালমন ফিশ আমার খুব পছন্দের খাবার।

তিনি বলেন, আমি আগে দুবার জেবিবি-এর সভাপতি এবং দুবার উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আর কোন কিছুর সঙ্গে অফিসিয়ালি ওভাবে নেই। কারণ সময় নেই। তবে সব কিছুতেই আমার কমবেশি কন্ট্রিবিউশন থাকে। চেষ্টা করি বিভিন্নভাবে যুক্ত থাকতে।

সৈয়দ রহমান মান্নান ব্যবসায়ী হিসাবে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল থেকে ক্রেস্ট ও সম্মাননা ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। যার সংখ্যা ২৫টির বেশি। তিনি বলেন, এসব সম্মাননা আমাকে আরও বেশি দায়িত্বশীল করে দিয়েছে। বেশি বেশি কাজ করেছি।

তিনি বলেন, পরিশেষে আমি একটা কথাই বলতে চাই, সেটা হলো যে বাংলাদেশের আমরা দেশে-বিদেশে যে যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের সব ধরণের বিভেদ ভুলে যেতে হবে। নিজেদের মধ্যে কোনোভাবেই দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখা যাবে না। তাহলে সবাই মিলেই আমরা একসাথে এগিয়ে যেতে পারি। দেশ ও মানুষের স্বার্থে রাজনৈতিক বিভেদও ভুলে যাওয়া দরকার। মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে সবারই একসঙ্গে কাজ করা দরকার। দেশে বিভেদ আছে বলেই এখানেও যারা আসে তাদের মধ্যেও বিভেদ দেখা দেয়। কিন্তু সেটা না থাকলে আমরা একে অপরকে আরও বেশি সহযোগিতা করতে এবং আরও বেশি উন্নতি করতে পারতাম।