ঠিকানা এবং কমিউনিটির মেলবন্ধন আজও অটুট : আমরা কৃতজ্ঞ

বাংলাদেশে দুটি বড় খবর। একটি বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার রায় ঘোষণা। সেই রায়ে ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। দুই. গত ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১ জনের যাবজ্জীবন এবং অন্য ৩ জনকে ১৪ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। টুঙ্গিপাড়ার কোটালীপাড়ায় একটি সভাস্থলের কাছে ৪০ কেজি এবং ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে। ওই জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল। বোমা পোঁতার ঘটনাটি প্রকাশ হয়ে পড়ায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান। ন্যায়বিচারের দিক থেকে দুটি রায়ই উল্লেখযোগ্য। মানুষের দৃষ্টি ছিল দুটি মামলার দিকেই।
এর বাইরেও বাংলাদেশে আরও দুটি ঘটনা খুব উত্তাল করে তুলেছে প্যান্ডামিক কোভিড-১৯ এর মধ্যেও। একটি ‘প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে কাতারভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) কর্তৃক সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিল করার প্রস্তাব। বাংলাদেশে দুটি ঘটনা নিয়েই আলোচনা হচ্ছে এবং উত্তাপ ছড়াচ্ছে। রাজনীতি অনেকটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়ে পড়ছে। দুটি ঘটনাই আলোচনার টেবিলে খুব গুরুত্ব পাচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে সরকারপক্ষে ক্ষোভ লক্ষ করা যাচ্ছে। জিয়াউর রহমানের খেতাব প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রস্তাবে বিএনপিও ক্ষোভে ফেটে পড়েছে।
এদিকে আমেরিকায় অতিমারি করোনার প্রকোপ অনেকটা দুর্বল লক্ষ করা যাচ্ছে। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের ওপর যত জোর দিয়েছেন এবং ভ্যাকসিন বিতরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিয়েছেন, এ তারই ফল মনে করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের অনেকেই মনে করছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনা নিয়ে অবজ্ঞা, অবহেলা করায় এবং কোনো রকম নিয়মশৃঙ্খলা না মানায় যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্প করোনাকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে অনেক মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হতো বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমেরিকানদের দুর্ভাগ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প মানুষের জীবন রক্ষার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি মত্ত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকা নিয়ে। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও অনেকটা জোরপূর্বক বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকার ‘ধনুকভাঙা পণ’ করেন। এ জন্য তিনি তার সমর্থকদের উসকে দিয়ে ক্যাপিটল হিলে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ বন্ধ করতে দাঙ্গা পর্যন্ত বাধিয়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য ট্রাম্পের উগ্রবাদী ডানপন্থী সমর্থকেরা ক্যাপিটল হিলে ভাঙচুর করে বিপুল ক্ষতিসাধন করে। তাদের কর্মের পরিণতিতে পুলিশসহ ৫ জন মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যায়। এ ঘটনা নিয়ে আমেরিকা এখনো উত্তাল। সাধারণ মানুষ থেকে আইনপ্রণেতা, আইন-আদালত পর্যন্ত আলোচনায় মুখর। এমনকি এ দেশে যাদের আন-ডকুমেন্টেড বলা হয়, অর্থাৎ দালিলিকভাবে এ দেশের বৈধ নাগরিক নন, তারাও এই আলোচনায় সরব।
আরেকটি ঘটনা সরবে নয়, অনেকটা নীরবেই ঘটে গেছে। বিষয়টি অনেকের কাছেই খুব গুরুত্ববহ বলে প্রতীয়মান হবে না। তবে একটি সম্প্রদায় বা প্রবাসী একটি কমিউনিটির কাছে খুব ছোট ঘটনা মনে নাও হতে পার। তাদের কাছে ঘটনাটি অনেক বড় এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, যারা সেটির সেবা নিয়ে আসছে। প্রবাসে যাদের অসহায়ত্ব কাটানো এবং সাহস জোগাতে সাহায্য করেছে তাদের কাছে ঘটনাটি বিরাট, বিশাল। ঘটনাটি হচ্ছে এই প্রবাসে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদপত্র ‘ঠিকানা’র ৩২তম বছরে পদার্পণ।
৩২ বছর আগে, ১৯৯০-এর একুশে ফেব্রুয়ারি যখন ঠিকানা প্রথম প্রকাশিত হয় নিউইয়র্কে, তখন কি কেউ ধারণা করতে পেরেছিল, ঠিকানা কমিউনিটির জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ, এতটা সহায়ক হয়ে উঠবে? আবার কমিউনিটিও ঠিকানার পাশে এসে দাঁড়াবে বন্ধুর মতো! তখন নবীন বাংলাদেশ কমিউনিটি, নবীন পত্রিকা-ঠিকানা। দুই নবীনের মেলবন্ধন। আজ কমিউনিটিও অনেক বড় হয়েছে। অনেক সাহস ও শক্তি অর্জন করে সবল হয়েছে। সফল ও সমৃদ্ধ হয়েছে। ঠিকানাও আজ বয়েসী এবং সফল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেদিনের সেই দুই নবীনের মেলবন্ধন আজও অটুট। বরং আরও মজবুত হয়েছে। আরও টেকসই হয়েছে। দীর্ঘ ৩২ বছরে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সয়ে সয়ে একসঙ্গে পথচলা। ভালো-মন্দ, সুসময়-অসময়কে একসঙ্গে উদ্্যাপন এবং মোকাবিলা করা। এই দুয়ের সম্পর্ক অটুট হয়েছে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে।
এবার ৩২ বছরের উদ্্যাপনে ঠিকানা এবং কমিউনিটির এই নিবিড় এবং আন্তরিক সম্পর্ক আরেকবার প্রমাণিত হলো। ৩২ বছরে অনেক নিকট সম্পর্কেও অনেক সময় দূরত্ব তৈরি হয়। অনেক সময় মলিন ও বিবর্ণ হয়ে যায়। ঠিকানা এবং কমিউনিটির সম্পর্কটা বয়স যতই বাড়ুক, সময়ের প্রয়োজন ও চাহিদায় যে সম্পর্ক ৩২ বছর আগে তৈরি হয়েছে, তাতে মালিন্য স্পর্শ করতে পারেনি এতটুকু। বরং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এত দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিয়ে এখন সুবর্ণজয়ন্তীর পথে পা বাড়িয়েছে। এর জন্য কৃতিত্ব অবশ্যই দুই পক্ষকে দিতে হবে। ঠিকানা যেমন সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কমিউনিটিকে সেবা দিয়ে এসেছে, অন্যপক্ষে কমিউনিটিও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ঠিকানাকে জড়িয়ে রেখেছে। কোনো পক্ষেই বিশ্বাস ও আস্থার ঘাটতির অভাব হয়নি কখনো। এখন কমিউনিটি এবং ঠিকানা উভয়েই পরিণত তাদের চলার পথে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতায়।
এই সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে রহস্য খুঁজতে গেলে কে কিসের সন্ধান পাবেন, জানি না। একটি রহস্য সম্ভবত খুব সহজেই সবার চোখে ধরা দেবে। তা হলো ঠিকানা সব পরিবেশে নিজের স্বার্থকে পেছনে রেখে কমিউনিটির স্বার্থকে প্রথম গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে কমিউনিটির স্বার্থ বড় করে দেখেছে সব মুহূর্তে। কমিউনিটি বড় হোক, কমিউনিটির ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাক, শিক্ষা-দীক্ষায়, মানে-গুণে সমৃদ্ধ হোক, সফল হোক সব কর্মে। সন্তানদের মেধায়, মননে বড় করে তুলুক-তাই ছিল ঠিকানার একমাত্র প্রার্থনা। এ ব্যাপারে এগিয়ে যেতে ঠিকানা কমিউনিটির পাশে থেকেছে সেবার মনোভাব নিয়ে। মুনাফাকে কখনো বড় করে দেখেনি। ঠিকানার প্রতিষ্ঠাতারা অবশ্যই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। তারা জানতেন, কমিউনিটি বড় হলে ঠিকানাও বড় হবে। কমিউনিটি সমৃদ্ধ ও সফল হলে ঠিকানাও সফল ও সমৃদ্ধ হবে। ঠিকানার সেই দূরদৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা বিফলে যায়নি। ঠিকানার সাফল্য ও সমৃদ্ধির পেছনে কমিউনিটির পৃষ্ঠপোষকতা লাভ ছাড়াও আরেকটি কারণকেও ছোট করে দেখা যাবে না। ঠিকানা একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদপত্র। সংবাদই এর প্রাণ, প্রধান উপকরণ। সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে ঠিকানা ৩২ বছরের সব সময়েই অগ্রগামী থেকেছে। এই জায়গাটি অন্য আর কোনো সহযোগী পত্রিকার পক্ষেই স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি। ঠিকানা এখানে অদ্বিতীয়। পত্রিকার বিক্রয়মূল্য থাক বা না-থাক, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় এক ও অভিন্ন। ঠিকানা কখনো কাউকে হারিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ দেয়নি। বরং ঠিকানাকে অন্য অনেকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ঠিকানা কেবল পাঠকের প্রতি তার অঙ্গীকার রক্ষা করে চলেছে সতর্কতার সঙ্গে। সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করে গেছে সততার সঙ্গে। কখনো হিংসা-বিদ্বেষ কিংবা রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য কাউকে ফেভারও করেনি, আঘাতও করেনি। যার যতটুকু প্রাপ্য, তাকে ততটুকুই দিয়েছে। কার্পণ্য করেনি এতটুকু।
তার জন্য ঠিকানা কখনোই আত্মপ্রসাদে কর্তব্য বিস্মৃত হয়নি। আগামী দিনেও ঠিকানা তার প্রতিশ্রুতি এবং অঙ্গীকারে অটল থাকবে। ৩১ বছরের পথচলায় ঠিকানা যার কাছে যতটুকু সহযোগিতা-পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে, তার জন্য সবার কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা। সবার মঙ্গল হোক। আগামী দিন সবার জন্য শুভ হোক! ঠিকানা সবার সাথি হোক।