ডাকসু নির্বাচন: সচেতন শিক্ষার্থীদের নিয়ে শঙ্কা সরকারে

নিজস্ব প্রতিনিধি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারি দল স্বস্তিদায়ক অবস্থায় নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় বিশাল বিজয়ের পরও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংশয়-শঙ্কা রয়েছে তাদের মধ্যে। সরকারি ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ নয় বছর ধরে সব কটি হলের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও ডাকসু নির্বাচনে বিজয় সম্পর্কে আস্থাশীল হতে পারছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দেশের সচেতন শ্রেণি বলে বিবেচিত। গত সংসদ নির্বাচনে তাদের অধিকাংশই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এ নিয়ে অসন্তোষ জমে আছে তাদের মধ্যে। গত নয় বছরে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে আসতে পারেননি। সভা-সমাবেশসহ প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা চালাতে, ক্যাম্পাসে উঠতেও পারেননি। ছাত্রদলের একশ্রেণির সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া নিয়ে আশ্বস্ত থাকতে পারছেন না সরকারি ছাত্রসংগঠনের নীতিনির্ধারক মহল। দেশের সর্বাধিক রাজনীতিসচেতন এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের ভোটাররা গোপন ব্যালটটি ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থীদের, বিশেষ করে ডাকসুর ভিপি ও জিএস পদে পড়বে কি না সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। যে ভীতি থেকে ছাত্রদল ও বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে নেওয়া সকলের সহ-অবস্থান ও হলের পরিবর্তে প্রশাসন ভবনে বা কলাভবনের প্রকাশ্য স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি বিবেচিত হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর আগ্রহ-উদ্দীপনার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনে উন্মুখ হয়ে আছেন তারা। কিন্তু অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হবে কি না, সে সংশয়-শঙ্কা রয়েছে শিক্ষার্থী ভোটারদের মধ্যে। কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাও সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে নির্বাচন করছেন। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ উভয়েই কিছু ছাড় দিয়ে এদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে। বাম প্রগতিশীলরা এদের সঙ্গে মিলে নির্বাচন করতে বেশি আগ্রহী।
ডাকসু নির্বাচনে প্রতিপক্ষ সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল ছাত্রজোট। ছাত্রদল ও বাম ছাত্রজোট নির্বাচনের তারিখ পেছানোর দাবি করেছে। ভোটকেন্দ্র হলে স্থাপন না করে প্রশাসনিক ভবনে বা কলাভবনে স্থাপনের দাবি করেছে। হলে কেন্দ্র স্থাপন করা হলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ভোটদানে প্রভাব সৃষ্টির সুযোগ পাবে বলে তাদের আশঙ্কা। উন্মুক্ত পরিবেশে ভোটকেন্দ্র স্থাপিত হলে সে সুযোগ তারা পাবেন না বলে বিরোধীরা মনে করেন। ছাত্রদল ও প্রগতিশীল ছাত্রজোট নির্বাচনের দিন ১১ মার্চ থেকে পিছিয়ে নেওয়ার দাবি করেছে। আরো কিছু দাবি থাকলেও এ দাবিই তাদের মুখ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কর্তৃপক্ষ এ সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণার আগে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে কথা বলেছে। উপাচার্য শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। আভাস পাওয়া যায়, ভোটের দিন দুই থেকে তিন সপ্তাহ পিছিয়ে নেওয়ার কথা চিন্তা করা হচ্ছে। মার্চের শেষ সপ্তাহে ভোটের দিন ধার্য করা হতে পারে। তবে ভোটদান কেন্দ্র হল থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি পূরণ করা হবে না। সর্বশেষ নির্বাচনসহ ডাকসু ও হল সংসদের অতীতের সব নির্বাচনেরই ভোটদান কেন্দ্র স্থাপিত হয় হলে। এবার এর ব্যতিক্রম করার কারণ নেই। ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করবে প্রশাসন। এ ব্যাপারে ছাত্রসংগঠনগুলোর মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রচার-প্রচারণাসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সব সংগঠনের সম-অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের নিশ্চয়তা, ডাকসুর চাঁদা প্রদানকারী অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের ভোটার না করা হলে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে ছাত্রদলের একাংশের মত। তারা মনে করে, প্রশাসনের নির্ধারিত ব্যবস্থায় নির্বাচনে গেলে ছাত্রদলের পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভব হবে না। এতে ছাত্রলীগের বিজয়ের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্র হল থেকে সরানো না হলে কারচুপি, জালিয়াতি বন্ধ করা যাবে না। হলের ভোটকেন্দ্র ছাত্রলীগেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রশাসন নানা কৌশলে তাদের পক্ষেই ভূমিকা রাখছে এবং রাখবে। এমনি পরিস্থিতিতে নির্বাচন বর্জনের পক্ষে ছাত্রদলের এই অংশটি। তবে অপর বৃহত্তর অংশটি মনে করে, ফলাফল যদি প্রত্যাশিত নাও হয় ছাত্রদলের কর্মী, সমর্থকদের নির্বিঘেœ ক্যাম্পাসে, হলে ওঠার সুযোগ পাওয়াটা কম নয়। তাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের ভয়, হুমকির মুখে তারা ক্যাম্পাসে উঠতেই পারছিলেন না। গত নয় বছরে ছাত্রদল এই প্রথম ক্যাম্পাসে মিছিল করেছে কোনো বাধা ছাড়াই। নির্বাচনের সময় ছাত্রদলের কর্মীরা অনেক বেশি সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। আগামীতে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত ও জোরদার করতে ছাত্রদলের সংহত শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। নির্বাচন বর্জন করলে তারা অসংগঠিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। হলে ভোটের কেন্দ্র স্থাপন না করার দাবি আদায় না হলেও তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে। শিক্ষার্থী ভোটাররা ভোট দিতে পারলে সরকারি ছাত্রসংগঠনের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বলে তারা মনে করেন। তারা নীরবে ভোটবিপ্লব ঘটাবে বলে ছাত্রদল নেতারা মনে করেন।
সন্ত্রাস, ভয়-ভীতি, কারচুপি, জালিয়াতির নির্বাচন হলে ছাত্রদল ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করার পরিকল্পনাও করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানী শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ডাকার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা ধর্মঘটের ডাক দেবে। শিক্ষাঙ্গন ছাপিয়ে একে রাজনৈতিক ইস্যু করবে। জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রদল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে ঐক্যবদ্ধ, সমন্বিত কর্মসূচি নেবে। অপরদিকে নির্বাচনের আগে ও পরে ক্যাম্পাসে নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করতে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রদলের একটি অংশ আস্থাশীল সম্পর্ক রেখে চলেছে।