ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে…! প্লেব্যাক সম্রাটের বিদায়

চলে গেলেন প্লেব্যাকের মুকুটহীন সম্রাটখ্যাত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। অসংখ্য ভক্তদের কাঁদিয়ে গত ৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে রাজশাহীতে বোনের নিজস্ব ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ক্যানসারে ভুগছিলেন। কিংবদন্তি এই শিল্পীর চলে যাওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে সংগীতাঙ্গন তথা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ৯ মাস পর গত ১১ জুন দেশে ফেরেন আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি এই গায়ক। ক্যানসারমুক্ত হয়ে দেশে ফেরার কথা থাকলেও তা হয়নি। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন আর কিছুই করার নেই।
বিষয়টি জানার পর এন্ড্রু কিশোর পরের দিনই বিশেষ ফ্লাইটে চলে আসেন দেশে। জীবনের শেষ ক’দিন নিজের দেশেই কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি। দেশে এসে মিরপুরের বাসায় ছিলেন। পরে চলে যান নিজের বাড়ি রাজশাহীতে। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন এই শিল্পী। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর তার শরীরে নন-হজকিন লিম্ফোমা নামের বøাড ক্যানসার ধরা পড়ে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক লিম সুন থাইয়ের অধীনে তার চিকিৎসা শুরু হয়। কয়েক মাস সিঙ্গাপুরে তার চিকিৎসা চলে।
এন্ড্রু কিশোরের চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ জোগাতে এন্ড্রু কিশোর বিক্রি করে দেন রাজশাহী শহরে তার কেনা ফ্ল্যাটটি। শিল্পীর পরিবারের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসীরা এগিয়ে এসেছিলেন। এন্ড্রু কিশোরের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা দু’জনেই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা সিডনিতে গ্রাফিকস ডিজাইন ও ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক মেলবোর্নে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়াশোনা করছেন। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন। তাকে বলা হতো প্লেব্যাকের মুকুটহীন সম্রাট।
বাংলা গানের এই কিংবদন্তি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সুরের জাদুতে সংগীতপ্রেমীদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। প্রাথমিকভাবে আব্দুল আজিজ বাচ্চুর অধীনে সংগীতের পাঠ শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, কিশোর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোক ও দেশাত্মবোধকসহ প্রায় সব ধারার গানে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হন। তার চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৭ সালে আলম খান সুরারোপিত ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানের মধ্য দিয়ে। তার রেকর্ডকৃত দ্বিতীয় গান বাদল রহমান পরিচালিত এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী চলচ্চিত্রের ‘ধুম ধারাক্কা’। তবে ১৯৭৯ সালে এ জে মিন্টু পরিচালিত ‘প্রতিজ্ঞা’ চলচ্চিত্রে তার গাওয়া ‘এক চোর যায় চলে’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। একের পর এক জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়ে গেছেন চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রের বাইরেও অডিওতেও তিনি উপহার দিয়েছেন অনেক শ্রোতাপ্রিয় গান। বাংলা চলচ্চিত্রের গানে অবদান রাখার জন্য তিনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

তার কালজয়ী গান
Ñএক চোর যায় চলে

  • তুমি যেখানে আমিও সেখানে
  • জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প
  • প্রিয়া আমার প্রিয়া
  • ভালোবেসে গেলাম শুধু
  • আমার সারাদেহ খেও গো মাটি
  • আমার বাবার মুখে
  • আমার বুকের মধ্যেখানে
  • চাঁদের সাথে আমি দেবো না
  • হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস
  • আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে
  • সবাই তো ভালোবাসা চায়
  • ওগো বিদেশিনী তোমার চেরি ফুল দাও
  • আজও বয়ে চলে পদ্মা মেঘনা
  • চোখ তোমার বলে হ্যাঁ
  • পৃথিবীর যত সুখ
  • আজ রাত সারারাত জেগে থাকব
  • ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা
  • তুমি এলে সমুখে
  • আমি এক দিন তোমায় না দেখিলে
  • তুমি আজ কথা দিয়েছ
  • তুমি আমার জীবন
  • বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে
  • তুমি আমার কত চেনা
  • পৃথিবী তো দু’দিনেরই বাসা
  • বুকে আছে মন
  • আর যাব না এমেরিকা
  • বেলী ফুলের মালা পরে
  • শিখা আমার শিখা
  • তোমাকে আমার কিছু বলার ছিল
  • বলো না কোথায় ছিলে
  • আমার এ গান তোমারই জন্য
  • এ মাটি আমার
  • তুমি ছিলে না যখন
  • সবার জীবনে প্রেম আসে
  • তুমি বন্ধু আমার চিরসুখে থাকো
  • প্রেমের সমাধি ভেঙে
  • যে জীবনে তুমি ছিলে না
  • চিরদিন এ দুনিয়ায় হয়েছে হায়
  • জয় হবে হবেই আমার
  • সুন্দর সন্ধ্যায়
  • কে তুমি বলো মায়াবিনী
  • নায়ক তো নয় খলনায়ক আমি
  • স্বর্গ হতে এই জগতে
  • এখানে দু’জনে নিরজনে
  • ভালোবাসিয়া গেলাম ফাঁসিয়া
  • সব সখীরে পার করিতে
    -আমি তোমার প্রেমে পাগল
    -ও সাথীরে যেও না কখনও দূরে
    -এইদিন সেইদিন কোনোদিন
    -তুমি আমার জীবনের শুরু
    -আমি যে তোমার প্রেমে পড়েছি
    -গান আমি গেয়ে যাব
    -প্রেম প্রীতি আর ভালোবাসা
    -এ জীবনে যারে চেয়েছি
    -ভালো আছি ভালো থেকো
    এক নজরে
  • নাম : এন্ড্রু কিশোর
  • জন্ম তারিখ : ৪ নভেম্বর ১৯৫৫
  • স্ত্রী : ইতি কিশোর
  • ছেলে : জে এন্ড্রু সপ্তক
  • মেয়ে : মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা
  • প্রথম প্লেব্যাক : মেইল ট্রেন (১৯৭৭)
  • প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস (বড় ভালো লোক ছিল, ১৯৮২)
  • শখ : গান শোনা
  • আনন্দের স্মৃতি : ছেলে যেদিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন
  • আবার জন্ম নিলে : এন্ড্রু কিশোর হয়েই জন্ম নিতে চাইতেন

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের মত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সোমবার এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন: এন্ড্রু কিশোর তার গানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এন্ড্রু কিশোরের জন্য শিল্পীদের শোক
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোর চলে গেছেন গত ৬ জুলাই সন্ধ্যায়। তার চলে যাওয়ায় সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার সহকর্মীরাও জানিয়েছেন শোক। তাই তুলে ধরা হলো-
সৈয়দ আব্দুল হাদী
এন্ড্রু কিশোরের মতো শিল্পী শত বছরেও আসে না। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের গানে তার যে অবদান, তার কথা সবাই জানেন। তার এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
রুনা লায়লা
এন্ড্রু কিশোর এভাবে চলে যাবেন ভাবিনি।
আমাদের দেশ আরেক রত্ন হারালো। সংগীতের যে ক্ষতি হলো তার চলে যাওয়ায় তা কখনো পূরণ হবে না। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
সাবিনা ইয়াসমিন
এন্ড্রু কিশোরের মৃত্যুর খবরটা এভাবে শুনবো ভাবিনি। আর কোনো দিন আমাদের এক সঙ্গে গান করা হবে না। একজন এন্ড্রু কিশোরের অভাব আমাদের কোনো দিন পূরণ হবে না। বাংলা সংগীতকে যেভাবে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন তা অকল্পনীয়। হাজারো গানে এন্ড্রু আছেন এবং থাকবেন। বাংলা গানের মধ্যে আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখবো।
রবি চৌধুরী
এন্ড্রু দা আর নেই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা শুধু ব্যক্তি এন্ড্রু কিশোরকে নয়, দেশের সম্পদ হারালাম। এই বছরটি আমাদের হারানোর বছর। এক দিকে মহামারী করোনায় আমাদের অনেকে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন। তার মধ্যে গত ৬ জুলাই হারালাম প্লে-ব্যাক সম্রাটকে। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
মনির খান
এভাবে আমরা এন্ড্রু দাকে হারাবো ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। তার অসুস্থতার খবর শোনার পর থেকেই একটা আতঙ্কে ছিলাম। গত ৬ জুলাই অবশেষে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। তবে আমি বিশ্বাস করি তার হাজারো গানের মধ্যে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। দাদার সঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে। এখন থেকে সেসব স্মৃতির ভেতর দাদাকে খুঁজে নেবো।

ডলি সায়ন্তনী
দাদাকে নিয়ে বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ভাষা পাচ্ছি না কি বলবো। তার মৃত্যু আমাকে যেন বোবা করে দিয়েছে। আর কোনো দিন আমরা দাদাকে পাবো না এই সত্যটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। দাদার আত্মার শান্তি কামনা করছি।