ডেঙ্গু জোশে মেগা বিনোদন

এলিট সোসাইটির এডিস মশায় ডেঙ্গু জ্বর। এই জ্বরে মৃত্যু বা মরণযন্ত্রণার সঙ্গে শরীর-মনে কিছু বাড়তি ক্রিয়া-বিক্রিয়াও হয়। সাইড এফেক্ট হিসেবে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যায়। নানা ধরনের প্রলাপ বকে। আগডুম-বাগডুম করে। তাদের উল্টাপাল্টা কথাবার্তায় সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়। চিকিৎসা ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের গবেষণায় নাকি এমন তথ্য এসেছে।
গবেষণাটির সত্য-মিথ্যা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। তবে হাল বাস্তবতায় লক্ষণ মিলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর লক্ষণ তেমন খেয়াল করছেন না কেউ। তাদের খবর কেই-বা রাখে। তবে ভিআইপি বা এলিট সম্প্রদায়ের দিকে খেয়াল রাখে সবাই। বিশেষ করে মন্ত্রী, মেয়র, নেতাসহ মাননীয় পর্যায়ের সাম্প্রতিক অসংলগ্ন-হাস্যকর কথাবার্তায় প্রশ্ন জাগছে তাদের ওপর দিয়ে কি ডেঙ্গুর ঝড় গেছে? নইলে ওজনদার-সমঝদার এই বরেণ্যরাও কেন হাস্যকর কথাবার্তায় বিনোদন দিয়ে চলছেন? নিজেরাও হয়ে পড়েছেন বিনোদনের আইটেম? আশপাশে কে কী মনে করল, কী বলল তা দেখার ফুরসতও থাকে না তাদের। লজ্জা বা কিছু মনে করার সময়ও হয় না।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিএনপি চামড়া কিনে ফেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মাটি-মানুষের সঙ্গে থেকে বেড়ে ওঠা নেতা শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। কখনো হালকা বা ঠুনকা কথার মানুষ ছিলেন না তিনি। রোববার ১৮ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সরকার, ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও কাঁচা চামড়া-সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে নুরুল মজিদ হুমায়ুন এ মন্তব্য করেন। বলেন, বিএনপি রাজনীতিতে কিছু করতে না পেরে চামড়ায় বিনিয়োগ করেছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও বিনোদন দিয়েছেন। ওজনদার এই মাননীয় বলেন, একটি কুচক্রী মহল সরকারকে বিপদে ফেলতে চামড়া ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত করেছে। কোরবানিতে এক কোটি চামড়া হয়। এবার তার ১ শতাংশ চামড়াও নষ্ট হয়নি।
এর আগে, কয়েক মান্যবর ডেঙ্গু নিয়ে নন-স্টপ বিনোদন জোগান দিয়েছেন। কথার খই ফুটিয়েছেন তুলনামূলক কম কথার মানুষ এলজিআরডির হাফমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যও। তার মতে, ডেঙ্গু বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রমাণ। বাংলাদেশ এখন উন্নত দেশ হতে যাচ্ছে, তাই এখন দেশে ডেঙ্গু এসেছে। তার আগে, একই টাইপের বিনোদন দিয়েছেন বুঝেশুনে কথা বলায় নামকরা এলজিআরডির ফুলমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তার বয়ান ছিল, ডেঙ্গু এলিট শ্রেণির একটি মশা। এ মশা সিঙ্গাপুর, আমেরিকায়ও দেখা যায়। তাদের আগে, ডেঙ্গুনামায় ভিন্ন পজিশন করেছেন আরো কয়েকজন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশারা প্রজননক্ষমতায় রোহিঙ্গাদের মতো। এই কিসিমের বচনে সম্প্রতি বেশ ফর্মে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। ডেঙ্গু নিয়ে সেই সার্ভিসটা তিনি একটু বেশিই দিয়েছেন। প্রথমে বলেছেন, এটা গুজব। গুজব ছড়ালে কঠোর বিচার হবে। পেঁপে পাতার জুস খেলে ডেঙ্গু ভালো হয়ে যায়Ñএ প্রেসক্রিপশনও দিয়েছেন তিনি। মেয়র জানান, পেঁপে পাতার মধ্যে একধরনের এনজাইম রয়েছে। পেঁপে পাতার জুস খেলে রক্তে প্লাটিলেটের সমস্যা চলে যায়। ডাক্তারসহ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ভাবনায় পড়ে যাওয়ার সঙ্গে মুচকি হেসে বিনোদনও পেয়েছেন অর্ধেক ঢাকার এই নগরপিতার সবকে। আর উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, কারো বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে দেওয়া হবে কঠিন শাস্তি।
মশার কামড়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সংসদে বাজেট পাঠ করতে না পারা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কানাডার সমান। তার আরেক বচন : ২০৪১ সালে বাংলাদেশের কাছ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঋণ নেবে। নিরিবিলি বৈশিষ্ট্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, টেমস নদী দেখতে লন্ডন যেতে হবে না। বুড়িগঙ্গা দেখলেই হবে। তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ওপর থেকে ঢাকা দেখতে সিঙ্গাপুর-শিকাগোর মতো দেখায়। আর ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো সিঙ্গাপুরের মতো।
ধর্ষণের কারণ ব্যাখ্যায় আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, দেশে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে বেশি উঠে আসছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে থাকার সময় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছিলেন, কিশোর বয়সে রোজ ৪০ মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন তিনি। রীতিমতো গিনেস বুকে ওঠার মতো রেকর্ড। ধানের দাম না পেয়ে বগুড়ায় কৃষকের জমিতে ধান পুড়িয়ে ফেলা ইস্যুতে বিনোদন জোগান আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর নেতা যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেন, নিজের ধানক্ষেতে কৃষকের আগুন দেওয়ার ঘটনা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ডেঙ্গু আসার বেশ আগে হানিফের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে তথ্য পাওয়ায় ফণীর ক্ষতি কমানো গেছে মর্মে দেওয়া বক্তব্যও মানুষকে আচ্ছা বিনোদন দিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ফসলের দাম না পেলে ফ্রান্সেও ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।
এমন ডেঙ্গু সিনড্রোমে যোগ হয়েছে ‘মুজিবগঞ্জ জেলা বাস্তবায়ন ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তন পরিষদ’ নামের এক আচানক সংগঠন। তারা গোপালগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে মুজিবগঞ্জ চান। সেই সঙ্গে চান জাতীয় সংগীতের পরিবর্তনও। গোপালগঞ্জের নাম মুজিবগঞ্জ রাখার দাবি পরিষ্কার করলেও তারা নতুন জাতীয় সংগীত হিসেবে কোনো গানকে প্রস্তাব করেননি। বিনোদনের জোগানদাতা হিসেবে তাদের অবদানও ব্যাপক।
গতকালের ধীর-স্থির, শান্ত-সুবোধ ব্যক্তিসহ কারো কারো বেসামাল হয়ে ওঠার এই নমুনা ক্ষমতার দোষে না ডেঙ্গু ভাইরাসেÑএ প্রশ্নের জবাব পাওয়া কঠিন। এ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন