ঢাকাকে বিশাল ডিমান্ড নোট দিল্লির

যাবেন হাসিনা, গেলেন কামাল, আসবেন জয় শঙ্কর

বিশেষ প্রতিনিধি : আসামসহ আশপাশ থেকে ৪০ লাখ ‘বিদেশি বিতাড়ন’ অ্যাজেন্ডার মধ্যেই এসে গেছে জুম্মু-কাশ্মীর ইস্যু। বিদেশি বলতে চিহ্নিত করা হয়েছে রোহিঙ্গা ধাঁচের কিছু লোককে। যাদেরকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর শঙ্কা ঘুরছে বিভিন্ন মহলে। এর মাঝেই এল পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর দখলের হুমকি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ হুমকিটি দিয়েছেন কাশ্মীরিদের প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থন আরো বাড়ানোর ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায়। এর আগে সংবিধানের ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে পাল্টে ফেলা হয়েছে ভারতের ৬৯ বছরের ইতিহাস। কেড়ে নেওয়া হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরবাসীর ‘বিশেষ মর্যাদা’। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে ভারত জাতিসংঘের নির্ধারিত নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে বলে জাতিসংঘে অভিযোগ করেছে পাকিস্তান। ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্ডার অ্যাকশন টিমের সদস্যদের টার্গেট করে গুলি চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়। তলব করে ডেকে এনে কঠিন বার্তা দিয়েছে পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে। বলেছে, কাশ্মীরে যেকোনো ধরনের বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে। এর পরও ভারতের বাড়াবাড়ির কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পাকিস্তান কঠিন পদক্ষেপ নেবে বলেও হুঁশিয়ার করা হয়।
এর বিপরীতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন ও আমেরিকাকে ৩৭০ ধারা রদ করার যৌক্তিকতা জানিয়েছে ভারত। এর মাঝেই রীতিমতো বোমা ফাটানোর মতো মন্তব্য করলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম। জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলায় ভারত ভাঙার সূচনা হলো বলে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন তিনি। আরেক বোমা ফাটান জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। তিনি বলেছেন, তাদের জনগণ মনে করছে তারা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে ভুল করেছেন। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেছেন, ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত¡ প্রত্যাখ্যানের এবং ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিল।
কয়েক মাস ধরে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নজর ছিল আসামের দিকে। ৩১ আগস্ট সেখানে নাগরিকপঞ্জির চ‚ড়ান্ত তালিকা ঘোষিত হবে এবং ধারণা করা হচ্ছে, ৩০-৪০ লাখ মানুষ সেখানে রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলে ভয়াবহ এই মানবিক দুর্যোগের আশঙ্কার মুখেই সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া কেঁপে উঠল কাশ্মীর বিষয়ে মোদি সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে।
জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ পাক-ভারতের জন্য ঐতিহাসিক বিষয়। কিন্তু এবার তা মাত্রা ছাড়ানো। সাতচল্লিশে দেশভাগের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটিকে ভারতের প্রতি অনুগত রাখতে জওহর লাল নেহরুর উদ্যোগে প্রণীত হয়েছিল ৩৭০ ধারা। এবার আঘাতটা পড়ল সেখানেই। যার জের বা পরিণাম ভুগতে বাধ্য প্রতিবেশীসহ আশপাশের দেশগুলো। তুলনামূলক বেশি শিকারে পড়তে পারে বাংলাদেশ। কথিত ৪০ লাখ বাংলাদেশির বিষয়ে বাংলাদেশকে একটি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার ক‚টনৈতিক চাল হাতে রেখে এগোচ্ছে ভারত। গত বছরের জুলাইতে এই অস্বাভাবিক নাগরিকত্বের খসড়া তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর উদ্বেগ জানিয়েছিলেন কেউ কেউ। বলা হয়েছে, আসামের তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা কেউই বাংলাদেশি নন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের ক‚টনৈতিক পর্যায়ে কোনো বার্তা আদান-প্রদান হয়নি।
এ রকম সময়েই পূর্বনির্ধারিত সফরে গেলেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। ভারতের কিছু চাহিদার জোগান হিসেবে কয়েকটি চুক্তি হচ্ছে এ সফরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাবেন অক্টোবরে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে চাহিদাপত্র নিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর। দিল্লিকে অফুরান দানের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছেন, তাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন আজীবন তাকে মনে রাখতে হবে ভারতকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের চাওয়ার শেষ নেই। বাংলাদেশের কাছে ছোট-বড় আরো অনেক চাহিদা তাদের। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের কাছে জমি চেয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা বিমানবন্দরকে সম্প্রসারণ করে আন্তর্জাতিক মানে নিতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সীমান্তে এই জমি চাওয়া হয়েছে। সরকারের দিক থেকে বিষয়টা যদ্দুর সম্ভব চাপা রেখে কাজ চালানো হয়েছে অত্যন্ত গোপনে। বিমানবন্দরটি কীভাবে পরিচালিত হবে, কী প্রক্রিয়ায় কতটুকু জমি ইজারা দেওয়া হবে, এসব বিষয়েও আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।
ভারত সর্বপ্রথম বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছে বিমানবন্দরটি সম্প্রসারণের প্রস্তাব উত্থাপন করে গত বছরের জুলাইতে। ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র ও বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। গত অক্টোবরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কলকাতা ও গুয়াহাটি থেকে আগরতলা বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামায় বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে হয়। গত বছরের আগস্টে আগরতলা বিমানবন্দরের নাম পাল্টে মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে এ চাহিদার একটা প্রাথমিক ফয়সালা আসতে পারে। এর আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলরত ভারতীয় বিমানে নিজস্ব সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগে আগ্রহের কথা জানিয়েছে ভারত।
ভারতীয় দূতাবাস থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে তাদের বিমানে সশস্ত্র স্কাই মার্শাল নিয়োগের ইচ্ছার কথা জানানো হয়। ভারতীয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের বাছাই করা কমান্ডো দিয়ে এই স্কাই মার্শাল গঠিত। বিমান ছিনতাই এবং জিম্মি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তারা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা একেবারেই দৃশ্যমান নয়। তবে চেপে ধরলে ভারতকে ‘না’ করার অবস্থায় নেই বাংলাদেশের সরকার।