ঢাকায় দিনে ২শ’ যানবাহন নামছে

রাজধানী ডেস্ক : রাজধানীর নতুন বাজার থেকে মালিবাগ আসতে সময় লাগে অন্তত আড়াই ঘণ্টা। যানজট। তাই সড়কে হাজারো যানবাহনের সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এ চিত্র প্রতিদিনের। গত ২ এপ্রিল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যারা এ সড়কটি ব্যবহার করেছেন তারাও যানজটের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না। মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক নির্মাণের পর কথা ছিল ফ্লাইওভার দুর্ভোগ কমিয়ে আনবে। মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে শান্তিনগর পর্যন্ত উড়াল সড়কের লুপও রয়েছে। তবুও যানজট কমেনি। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের পর সমস্যা বেড়েছে। সমানতালে বেড়েছে জনদুর্ভোগও। এমন চিত্র গোটা শহরের বলা চলে
আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, এক দশক আগেও রাজধানীতে যানবাহনের গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। যানজটের কারণে এখন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ পাঁচ কিলোমিটার সড়ক অতিক্রম করা সম্ভব একটি চলন্ত গাড়ির। চলমান অবস্থার উন্নতি না হলে ২০২৫ সালে যানবাহনের গতি ঘণ্টায় চার কিলোমিটারের কমে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে রাজধানীতে নিবন্ধিত পরিবহনের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। অপরিকল্পিত নিবন্ধন চলছেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অযান্ত্রিক আরও অন্তত ১০ লাখ পরিবহন। ঢাকার বাইরে থেকে অন্তত লক্ষাধিক পরিবহন রাজধানীতে প্রবেশ করছে প্রতিদিন। চলমান বাস্তবতায় পরিস্থিতির উন্নতির আশা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে যাত্রীদের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ আবার কাজ করছে অন্যান্য রোগের উৎস হিসেবে। যানজট ৯ ধরনের মানবিক আচরণকে প্রভাবিত করছে।
গবেষণায় আরও বলা হচ্ছে, যানজটের কারণে শুধু ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যানজটের পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে, তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও যে বাড়বে, তা বলাবাহুল্য। সঙ্কট সমাধানে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে দ্রুতগতির ট্রেন সার্ভিস চালু ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেয়ার মতামত আসছে।
রাজধানী ঢাকার যানজটের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিশেষজ্ঞরা এমন মতামতই তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ। এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। যানবাহনের পরিমাণ যদি বাড়তে থাকে তাহলে ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। মানুষের হাঁটার গড় গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার বলে মনে করা হয়। এমন তথ্য বিশ্বব্যাংকের।
আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটির মতে, যানজটের পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে, তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও যে বাড়বে, তা বলাবাহুল্য। যানজটের কারণে রাজধানীতে পরিবহন প্রবেশ করতে না পারায় প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয় নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা ১২ ঘণ্টায় রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনকে যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়।
এর মধ্যে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে প্রায় ২০০ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন। ২০৩০ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা হবে ৩০ কোটি। এ প্রেক্ষাপটে যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই। রাজধানী ঢাকাকে সবার জন্য বসবাসের উপযোগী করতে হলে যথাযথ সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।
সমাধানের পথ ঢাকার যানজট কমাতে বাস সেবা আরও বিস্তৃত ও উন্নত করা, রেলে যাত্রী পরিবহন বাড়ানো, ব্যক্তিগত গাড়ি কমানো, ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন পরামর্শের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুরের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। অফিস সময়ের আগে ও পরে ১০ মিনিট পরপর এসব রুটে ট্রেন ছাড়লে মানুষ রাজধানীর বদলে লাগোয়া জনপদে বেশি থাকবে বলে মনে করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজধানীতে মোট জমির যে সাত থেকে আট শতাংশ রাস্তা আছে। সেটারও যদি সঠিক ব্যবহার করা যায় তাহলে যানজটের কারণে ক্ষতি হওয়া ২২ হাজার কোটি টাকা রক্ষা করা যাবে।