তহবিল তছরুপের অভিযোগ : মারামারিতে পন্ড চট্টগ্রাম সমিতির সংবাদ সম্মেলন

ঠিকানা রিপোর্ট : তুমুল হট্টগোল, ধাক্কা-ধাক্কি, অশ্রাব্য গালিগালাজের পর পুলিশের হস্তক্ষেপে বড় ধরনের একটি সংঘাত থেকে রেহাই পেলেন চট্টগ্রাম সমিতির সদস্য-কর্মকর্তারা। আর এভাবেই ভন্ডুল হয়ে গেল এক পক্ষের সংবাদ সম্মেলন। এ ঘটনায় সহজ-সরল চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক ঘটেছে। সম্প্রীতির বন্ধনে সকলকে আবদ্ধ রাখার সংকল্পে দায়িত্ব গ্রহণের পর নেতৃবৃন্দ মারপিটে লিপ্ত হবেন-এটা কেউ আশা করেনরিন। উল্লেখ্য, গত দেড় যুগেরও অধিক সময় যাবত চট্টগ্রাম সমিতির নেতৃত্ব নিয়ে মারপিট, ঠেলা-ধাক্কা, মামলা-মোকদ্দমার উদ্ভব হচ্ছে। আর এসব মামলা পরিচালনার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হয় সমিতির তহবিল থেকে অর্থাৎ নেতৃত্ব নিয়ে কিংবা সমিতির অর্থ নিজ স্বার্থে ব্যবহারের অভিপ্রায়ে সৃষ্ট গোলযোগের দায় বর্তাচ্ছে সাধারণ সদস্যগণের চাঁদার অর্থের ওপর। জানা গেছে, সমিতির ভবনের ভাড়াটেরা মাসে ৭ হাজার ২০০ ডলার করে প্রদান করেন। এই অর্থ নিয়েই বারবার অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ উঠছে। সর্বশেষ ঘটনাটিও তারই নামান্তর বলে সাধারণ সদস্যরা উল্লেখ করেছেন।
৪ ফেব্রুয়ারি রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সমিতির ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সমিতির সেক্রেটারি মোহাম্মদ সেলিমের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। যথারীতি সেলিম তার লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করা শুরু করেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সভাপতি আব্দুল হাই জিয়া গ্রুপের লোকজন সেখানে এসেই চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘সভাপতির অজ্ঞাতে কোন সংবাদ সম্মেলন হতে পারে না।’ এ কথা বলার সাথে সাথে তার সমর্থকরা একযোগে মঞ্চে উঠার চেষ্টা করলে তুমুল-বাক-বিতন্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলনের ব্যানার খুলে নেন জিয়ার সমর্থকরা। এ অবস্থায় কিংকতর্ববিমূঢ় সেলিম মঞ্চে অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও তার সমর্থকরা ধাক্কা-ধাক্কি আর গালাগালিতে লিপ্ত হন প্রতিপক্ষের লোকজনের সাথে। মুহূর্তেই রনক্ষেত্রে পরিণত হয় জ্যাকসন হাইটসে পালকি পার্টি সেন্টার। সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন পার্টি সেন্টারের দুই মালিক কামরুল এবং হারুন ভ’ইয়া। হাঙ্গামায় লিপ্ত সকলকে অনুরোধ জানান শান্ত হবার জন্যে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। এক পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি ঘটে এবং পুলিশের আহবানে সকলেই ঐ স্থান ত্যাগ করেন।
উদ্ভ’ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সভাপতি আব্দুল হাই জিয়া এ সংবাদদাতাকে বলেন, ‘সমিতির সিদ্ধান্ত ছাড়াই ব্যাংক একাউন্ট থেকে ৪৪ হাজার ৬২২ ডলার সরিয়েছেন সেক্রেটারি মো. সেলিম ও কোষাধ্যক্ষ মীর কাদের রাসেল। সমিতির ব্যাংক একাউন্ট থেকে এই অর্থ তারা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সরিয়েছেন। এখন তারা আমার অজ্ঞাতে সংবাদ সম্মেলন করে চট্টগ্রাম সমিতির সদস্যদের বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছিলেন’।
‘চট্টগ্রাম সমিতির ব্যানার ব্যাবহারের কোন সুযোগ অন্যদের নেই বলেই আমরা বাধা দিলাম’-উল্লেখ করেন জিয়া।
প্রবাসের অন্যতম বৃহত্তম চট্টগ্রাম সমিতির মালিকানাধীন একটি ভবন রয়েছে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলীনে বাংলাদেশী অধ্যুষিত চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডে। ৪ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের এপার্টমেন্ট থেকে মাসিক ভাড়া আদায় হয় ৭ হাজার ডলারের অধিক অর্থ। এই অর্থই হয়েছে সমিতির নেতৃবৃন্দের মধ্যেকার হিংসা-বিদ্বেষের অন্যতম কারণ বলে অনেকেই মনে করছেন। সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জানান, ‘সাবেক সভাপতি কাজী আজমের মদদে বর্তমান সেক্রেটারি মো. সেলিম এবং কোষাধ্যক্ষসহ কয়েকজন ভ’য়া ভাউচারে সমিতির অর্থ আত্মসাতের অভিপ্রায়ে ব্যাংক একাউন্ট থেকে ৪৪ হাজার ৬২২ ডলার সরিয়েছেন। এর কয়েক বছর আগে কাজী আজম দায়িত্ব পালনকালিন সময়েও বিপুল অর্থ তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। সেই হিসাব এখনও পাননি সদস্যরা।’
অভিযোগ অস্বীকার করে কাজী আজম পাল্টা অভিযোগ করেন, ‘মোহাম্মদ হানিফের কারণেই চট্টগ্রাম সমিতি আজ খন্ড-বিখন্ড হয়ে পড়ার পথে। এথেকে উদ্ধারের জন্যে দরকার দক্ষ নেতৃত্ব।’ ‘আমিও চাই সমিতির আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব’-উল্লেখ করেন কাজী আজম।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সমিতির ভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে সভাপতি আব্দুল হাই জিয়া অভিযোগ করেছেন যে, কাজী আজমের মদদেই সমিতির অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ ব্যাপারে শীঘ্রই আদালতে যাবো।
গত বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয় সমিতির নির্বাচন। সেই নির্বাচনে দুটি প্যানেল মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ‘জাহাঙ্গির-বিল্লাহ প্যানেল’ নির্বাচন থেকে সরে দাড়ায়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের অভিযোগ করেন ‘জাহাঙ্গির-বিল্লাহ প্যানেল’র কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় ‘‘জিয়া-সেলিম প্যানেল’কে একতরফা বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সেই ‘জিয়া-সেলিম প্যানেল’র মধ্যেও এখন বিভক্তি দেখা দেয়ায় চট্টগ্রাম সমিতির অস্তিত্ব বিলীন হবার উপক্রম হয়েছে বলে প্রবীন প্রবাসীরা আশংকা করছেন।
এদিকে, চট্টগ্রাম সমিতির সেক্রেটারির ডাকা ঐ সংবাদ সম্মেলনের ব্যাপারে প্রদত্ত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মো. সেলিম ৫ ফেবুয়ারি রাতে জানান : গত ৪ ফেব্রুয়ারী বিকেল ৬টায় চট্টগ্রাম সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামাল হোসেন মিঠু, সাধারণ সম্পাদক মোঃ সেলিম, চট্টগ্রাম সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী শাখাওয়াত হোসেন আজম, সাবেক সহ-সভাপতি তরিকুল হায়দার চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহীউদ্দীন চৌধুরী খোকন, সহ সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসাইন, কোষাধ্যক্ষ মীর কাদের রাসেল, সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, কার্যকরী সদস্য মেছবাহ উদ্দীন, শফিউল আজম শিকদার, হারুনুর রশিদ এবং মুহীম উদ্দীন। সাধারণ সম্পাদক এর লিখিত বক্তব্য শেষে যখন সাংবাদিকদের সাথে প্রশ্নউত্তর পর্ব চলছিল তখন এক পর্যায়ে বর্তমান কার্যকরী পরিষদের অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি আব্দুল হাই জিয়ার নেতৃত্বে কিছু বহিরাগত সংবাদ সম্মেলনে হামলা চালায় এবং সংবাদ সম্মেলনকে বাধা দেওয়া অপচেষ্টা করে, অনুষ্ঠানে উপস্থিত চট্টগ্রামবাসীর প্রতিবাদের মুখে তাদের সে অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, গত ২৮ জানুয়ারী অব্যাহতি প্রাপ্ত সভাপতি আবদুল হাই জিয়া ও আরও ৪/৫ সদস্য নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে, সেখানে অনেক মিথ্যা তথ্য চট্টগ্রামবাসীর সামনে উত্থাপন করে চট্টগ্রামবাসীকে বিভ্রান্ত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ মিলে সমিতির একাউন্ট থেকে ৪৪,০০০.০০ ডলার উত্তোলন করে আত্মসাৎ করার কথা। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, গত ১৭ ডিসেম্বর তারিখে চট্টগ্রাম সমিতির নির্ধারিত মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর দিনে জিয়া-খোকন গংরা বাইরের কিছু ভাড়াটিয়ার সহযোগিতায় সমিতি ভবনে ৪টি তালা দিয়ে আটকিয়ে দেয়। বিকেলে তথাকথিত বিশেষ সভার আয়োজন করে যার কার্যকরী পরিষদের কোন অনুমোদন ছিল না। এই বিশেষ সভায় আবদুল হাই জিয়া সকলের সামনে নিজ দায়িত্বে, একক ক্ষমতাবলে কার্যকরী পরিষদ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন এবং সেইদিন থেকে চট্টগ্রাম সমিতির সকল দায় দায়িত্ব বিগত কমিটিকে তথা আকবর, তাহের ও বিল্লাহকে অপর্ণ করেন। এবং পরের দিন ব্যাংকের হিসেবও বুঝিয়ে দিবেন বলে অঙ্গীকার করেন। তাই আমরা কার্যকরী পরিষদের অধিকাংশ সদস্য রাত দশটায় এক জরুরী কার্যকরী পরিষদের সভা আয়োজন করি। সেই সভায় গঠনবিধি লংঘনের দায়ে আবদুল হাই জিয়াকে তার সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি এবং তাকে সহযোগিতা করার জন্য সিনিয়র সহ-সভাপতি খোকন কে চৌধুরীকে তার সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এবং উপস্থিত সদস্যদের সিদ্ধান্তক্রমে সমিতির আমানত তিনটি ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে একটি ব্যাংকে চট্টগ্রাম সমিতির একাউন্টে নিরাপদ ভাবে স্থানান্তর করা হয়। কোন ব্যক্তিগত হিসেবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়নি। তাই অর্থ আত্মসাতের প্রশ্নও উঠে না।