তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে খালেদার আস্থার সংকট বেড়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি : পঁচাত্তরোর্ধ্ব বেগম খালেদা জিয়াকে আর জেলখানায় ফেরত পাঠাতে চান না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গুলশানের বাড়িতেই স্থায়ীভাবে রাখার পক্ষে তিনি। প্রয়োজনে গুলশানের বাসা সাবজেল করা হবে। তার আগে বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার নামে বিদেশ পাঠানোর প্রক্রিয়া আপাতত থেমে আছে। পারিবারিক আস্থার অভাব থেকেই খালেদাকে এ যাত্রায় বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি। সরকারের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতেই বেগম খালেদা জিয়া জেলখানা থেকে গুলশানের বাসায় অবস্থানের সুযোগ পান। অবশ্য করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে থেকেই সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছিল। রাজনৈতিক বোঝাপড়ার অংশ হিসেবেই খালেদা জিয়ার প্যারোল লাভ এবং তার মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া।
জানা যায়, চলতি মাসেই বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্যারোলের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। জেলকোড অনুযায়ী প্যারোলের মেয়াদ টানা এক বছর বর্ধিত করার সুযোগ নেই জেনেও এ আবেদন করা হয়। জানা যায়, ছয় মাসের জন্য প্যারোলের মেয়াদ বাড়ালেও পরবর্তীতে আরো ছয় মাস প্যারোলে মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি সরকারের উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। তবে খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির শর্তসমূহ লঙ্ঘন করলে পরিস্থিতি ভিন্নতর হবে। সরকারি মহলও মনে করে, বেগম খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির শর্তসমূহ লঙ্ঘিত হয় এমন কিছু করবেন না। জেলখানা থেকে গুলশানের বাসায় আনার পর আজ পর্যন্ত তিনি এমন কোনো আচরণ করেননি, যা শর্তভঙ্গ বলে বিবেচিত হতে পারে।
উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়ার ছয় মাসের প্যারোলের মেয়াদ পরে আরো ছয় মাস বাড়ানোরও পক্ষে সরকার। খালেদা জিয়া এখন পঁচাত্তরোর্ধ্ব। শারীরিকভাবেও বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। বয়স ও উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদার আবেদন বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিতেও অনাগ্রহী ছিলেন না। খালেদা জিয়ার বোনসহ কয়েকজন আত্মীয়, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এ মনোভাবের কথা খালেদা জিয়াকে জানানো হয়। কিন্তু বিএনপির লন্ডনে অবস্থানরত শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের বিভিন্নমুখী যোগাযোগ, চীনের একজন কূটনীতিকের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক, খালেদা জিয়ার জন্মদিনে চীনের এই প্রথম প্রকাশ্য শুভেচ্ছাবার্তা প্রদান এবং ঢাকায় বিএনপির তারেকপন্থী নেতাদের আন্দোলনের হুমকি সরকারের অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সরকারি দলে নানামুখী প্রতিক্রিয়া থাকলেও নীতিনির্ধারকেরা আদৌ বিচলিত নন। খালেদা জিয়াকে জেলখানায় নেওয়া এবং দেশে রাখা নিয়ে সরকার চিন্তিত, অনেকটা বিচলিতও ছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল, বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী দলের নেতাকর্মীরা নিশ্চুপ। ঢাকা শহরে তারা কোনো প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি, তোলার কার্যকর উদ্যোগই নেননি। প্যারোলে মুক্তির পরও কারো কারো মধ্যে সংশয়, প্রশ্ন ছিল। কিন্তু দেখা গেল, সবই স্বাভাবিক। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় থেকে নিয়ে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা প্যারোল শর্তভঙ্গকারী কোনো ভূমিকা নেননি। এমনকি শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতেও আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে আসেননি। গুলশানে খালেদা জিয়ার আবাসস্থলকে ঘিরে কারা আসা-যাওয়া করছেন, গুলশান এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের সমাগম, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তৎপরতা সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্টরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। সরকারের দেড় বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা, অদক্ষতায় মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস মহামারি। এই ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ, ব্যাপক প্রাণহানি হওয়ার ঘটনায় গভীরভাবে শঙ্কিত দেশের মানুষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথা সরকারের সীমাহীন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ তারা। কর্তৃপক্ষ এর প্রতিকারে শুরু থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি, বরং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছে। যার ফলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি, ভয়াবহ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনও করতে পারেনি। অনিয়ম, দুর্নীতি, জবাবদিহিহীনতা, অস্বচ্ছতা, দলবাজি, টেন্ডারবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণহীনতা, বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতায় দেশের মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজমান। টানা ছয় মাস কোভিড পরিস্থিতি লাখ লাখ মানুষকে বেকার, কর্মহীন করেছে। দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের লাখ লাখ মানুষ। অভাবনীয় এ অবস্থা মোকাবিলায় সরকার সমন্বিত সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আগামীতেও পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপি গঠনমূলক সমালোচনা যেমনি করতে পারছে না, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না, যাতে মানুষ নিরাশার মধ্যেও ভবিষ্যতে আশার আলো দেখতে পায়।
খালেদা জিয়া দেশের বাইরে থেকে বিদেশি-দেশি বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রয়াস চালাতেও পারেন মর্মে সরকারি মহলে সংশয় ছিল। বিদেশে খালেদা জিয়ার চলাচল সরকারের নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত থাকবে না। তা সত্ত্বেও একটা সংশয়-শঙ্কাও কাজ করছে। শুধু চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডনে যাওয়ার ও সেখানেই অবস্থানের জন্য বলা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া এই শর্তে এখন রাজি হলেও পরবর্তীতে কী করেন, তা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে দ্বিধা রয়েছে। এ ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন খালেদা জিয়ার পক্ষে সরকারকে প্রভাবিত করেন বলে জানা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের প্রতি সরকারের আস্থাহীনতা প্রবলভাবে থাকায় ড. কামাল এ যাত্রায় সুবিধা করতে পারেননি।
ড. কামাল হোসেন রাজনৈতিকভাবে হলেও বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মুখ্য, আইনগত ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু দলের প্রধানসহ বিএনপি ও ২০ দলের অনেকেই মনে করেন, কামাল হোসেন মূলত সরকারের পক্ষে কাজ করছেন। এমন একটা সন্দেহ-সংশয় খালেদা-তারেকের মধ্যে নেই, এমনটাও মনে করেন না তারা। কিন্তু খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। নিরুপায় হয়েই তারা ড. কামালকে দিয়ে আপাত রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেষ কীভাবে হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। পরবর্তীতে কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে খালেদা জিয়া আইনগত সংকটে পড়বেন। প্যারোলে দেশে থাকার সিদ্ধান্তও স্থগিত বা খারিজ করা হতে পারে। সরকারবিরোধী কর্মসূচি দেওয়ার কথা ইতিপূর্বে বলা হলেও বিএনপির নেতারা এখন নিশ্চুপ। তারা ৫টি আসনে উপনির্বাচনে যাচ্ছেন সরকারের অনাস্থা, অবিশ্বাসের মাত্রা কমানোর জন্য।