তৃতীয় শক্তির উঁকিঝুঁকি!

নূরুল ইসলাম : নির্বাচন কমিশন ইঙ্গিত দিয়েছে, ২০২৪ সালের শুরুতে হবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক বছর আগে থেকেই হার্ডলাইনে অবস্থান করছে দেশের দুই বড় দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপি। জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে বিএনপি। বলছে, এবার দেওয়া হবে মরণকামড়। হুংকার দিয়েছে আওয়ামী লীগও। বলছে, দেওয়া হবে না ছাড়। ঢাকার রাজপথ নিয়ন্ত্রণে নিতে উভয় দলই নেমেছে কোমর বেঁধে। অতীতে জাতীয় নির্বাচনের আগে শক্তির মহড়ায় কে এগিয়ে- অনেক কিছু আগে থেকে আঁচ করা গেলেও এবার অতীতের হিসাব মিলছে না। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অনেক অজানা খবরের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে তৃতীয় শক্তি। বিদেশি শক্তিগুলোও তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চব্বিশের ভোটে লড়াই হবে উনিশ-বিশ। তবে শত চাপের মধ্যেও নিজেদের অধীনে আবারও আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনের ঝুঁকি নেওয়া এবং মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে তা ঠেকাতে বিএনপির শেষ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। দুই দলের মরণকামড়ের প্রস্তুতিতে অনেক অঘটনের জন্ম দিয়ে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাবও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যেহেতু বিএনপি চাচ্ছে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতাসীন সরকারকে সরানো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার, জাতীয় সরকার গঠন; সেহেতু বিএনপির ক্ষমতার লড়াইয়ের পাশাপাশি অন্য কিছু হলে তাতেও তাদের সমর্থন থাকবে। আর আওয়ামী লীগ জানে, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন না হলে তাদের ভরাডুবি নিশ্চিত। তাই যেকোনো মূল্যে তারা চাইবে নিজেদের অধীনেই নির্বাচন করতে। এতে যেকোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও তারা নিজেদের অবস্থান থেকে সরবে না।
রাজনীতিতে চোখ রাখা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে হওয়া দুটো নির্বাচন বিএনপির সীমানার বাইরে চলে যায়। দলটির মাঠ থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। যার কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আন্দোলনের বিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবে কয়েকটি মানববন্ধন ছাড়া তেমন বড় ভূমিকা দেখাতে পারেনি। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইস্যুতে নানা ক্ষোভ থাকলেও দলটিতে কোনো ভাঙন তৈরি হয়নি। কোনো নেতা রাগ-অভিমানে অন্য দলেও চলে যাননি। মাঠের শক্তির ইঙ্গিত গত মাসে সমাবেশ থেকে দেওয়া শুরু হয়েছে। বিএনপি বুঝতে পেরেছে, অতীতের ন্যায় আবারও ক্ষমতায় থাকার জন্য নানা কৌশল নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। সবকিছুই বিএনপি এখন থেকে মোকাবিলা করছে। একদিকে মাঠে শক্ত অবস্থান, অন্যদিকে সরকারের দুর্বলতাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে যে কাজগুলো করবে, তারও রোডম্যাপ শুরু করেছে। বিএনপির এবারের আন্দোলনে শেষবেলায় আরও গণজোয়ার তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা জীবন-মৃত্যুর ভূমিকা পালন করে যাবে, যাতে সরকার দাবি মেনে নিয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে প্রশাসন ক্ষমতাসীনদের পক্ষে থাকে। এটা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সংকটের শুরু তখন থেকেই। এবার সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক নজরের সঙ্গে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার নিশ্চিতের দাবি উঠছে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকেও। হ্যাটট্রিক সময়ে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিলেও বড় কঠিন সময় পার করছে। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। জ্বালানি সংকট, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, ব্যাংকে তারল্যের সংকট, রিজার্ভের অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং সামনের বছর থেকে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও। এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষেরও ক্ষোভের তোপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের খারাপ পরিস্থিতিগুলো গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সরকারের ঘরেও যাচ্ছে।
অন্যদিকে কয়েক বছরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের রেড সিগন্যাল দেওয়া। র‌্যাব-পুলিশের কিছু কর্মকর্তার ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাও এসেছে। রোহিঙ্গা ও ইউক্রেন সংকটের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের চাপ অনেক বেড়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও বড় প্রকল্পে চীনের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ভারতের সঙ্গে কিছুটা হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দাবি করছেন।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এখনো এক বছর বাকি আছে সংসদ নির্বাচনের। নির্বাচন এলে ঝুঁকি থাকে। যেহেতু সময় রয়েছে, তাই এখনো অনেক কিছু দেখার বাকি আছে। তবে এখনো বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা যায়নি। রাজনীতির স্বাভাবিক ইস্যুগুলো এখন চলছে। কী ঘটছে তা পূর্বের মতো এবার বলা যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্বব্যাপী। অর্থনৈতিক এই অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। এমন অবস্থায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যদি আরও খারাপের দিকে যায়, তাহলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করা খুবই কঠিন হবে। চলমান এসব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলের। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা এবং সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচন গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু তারা যদি নিজেদের মধ্যে সংলাপ বা আলোচনা না করে, তাহলে সত্যিই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করা অনেক কঠিন হবে। কারণ সংসদ নির্বাচনে সব সময় ঝুঁকি থাকে। দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই ঝুঁকিগুলো এখনই দেখা যাচ্ছে।