তোমারে সেবিতে…

যতোক্ষণ পর্যন্ত কোন বিষয় মন ও হৃদয়ে তাড়না দেয়, ততোক্ষণ সেই বিষয়ে কথা না বলা একটু কঠিন। সমাজ-সভ্যতায় আজকের মানবিক অধঃপতন দেখে চিত্তে উত্তেজনা, অস্থিরতা, সংশয় ও মনে ক্ষত সৃষ্টি হয়। সমাজের এবং দেশের দুঃসংবাদেও এমনটি হয়। দেশে একদিকে কথিত উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির উর্দ্ধগতি, অন্যদিক ইতিবাচক মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয়ের বিচিত্র বাস্তবতা বিবেককে তাড়িয়ে বেড়ায় আর সেটা কালি ও কলমে এসে বন্দি হয়। কাউকে কিছু দিতে চাইলে সেখান থেকে, বিনিময় আশা না করার চর্চাটা কঠিন। তবে এই কঠিনের চর্চা সামাজিক বৃহৎ পরিসরে যতো বেশি করা সম্ভব বা যাবে, সেটা বড় কল্যাণকে সাহায্য করবে। মানুষই যদি মানুষই না থকি, তাহলে প্রবৃদ্ধি, উন্নতি কার জন্যে, কার স্বার্থে? সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মানব নির্মিত বা জাগতিক পদ্ধতি যতোই ত্রু টিমুক্ত হোক, এর নেতৃত্ব এবং পরিচালনার দায়দ্বায়িত্ব মানুষের হাতে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, বিজ্ঞান যে পরিমাণে মানুষের হাতে মানুষ ও মনুষত্বকে হত্যা করার অস্ত্র তুলে দিয়েছে, সেই পরিমাণে হিংসা-বিদ্বেষ বা ‘প্রতিশোধের’ বিপরীতে সহনশীলতার সামাজিক ও মানবিক উপযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়নি বা দিতে পারেনি।
প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়লো। ‘আমাদের বাড়ির পেছনে ধানক্ষেত। রাতে শেয়ালের ডাক শোনা যায়। পাড়ার কুকুরের সঙ্গে শেয়ালের মাঝে মাঝে লড়াই লাগে। এক-আধটা শেয়াল কখনও কখনও মারা যায়। কিন্তু কোন কুকুর অন্য কুকুরকে খুন করেছে, এমন চোখে পড়েনি। মানুষ যদি পারস্পরিক হিংসায় কুকুরের স্তরে উন্নীত হতে পারতো, তাহলে আমাদের অঞ্চলে শান্তি বৃদ্ধি পেত।’ (প্রবাধ সংগ্রহ, অম্লান দত্ত, পৃ: ৫০০, প্রকাশক- আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিডেট, কলকাতা ১৯৯৩)।

উল্লেখ্য যে, শ্রী অম্লান দত্তের প্রথম বইয়ের নাম “ঋড়ৎ উবসড়পৎধপু” প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। লেখক একসময় ঢাকার কলিজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত সেটা ১৯৩৯ কি-না (সঠিক সাল মনে নেই), সহপাঠী ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব মরহুম সৈয়দ আলী আহসান।
অম্লান দত্তের নানা লেখাতে গণতন্ত্র, মানবতা, মানবচরিত্র এবং সমসাময়িককালের রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক দুর্বলতা, সহিংসতা, এবং অবিচারের ওঠানামার চিত্রও মেলে। একটা কথা সত্যি যে, আমাদের ছোটবেলার অনেক দৃশ্য মনকে যেভাবে গভীরভাবে চঞ্চল রাখতো বা করতো, এখন সে রকম হয় না। তবু মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, সমাজে এবং রাষ্ট্রে মানুষ হিসাবে কতোটা মানুষ পর্যায়ে আমরা আছি। এখন আমাদের চালচলন, আচার ব্যবহারের কৃষ্টিতে যেভাবে বেঁচে আছি, সেটা কতোটা মনুষত্বকে উঁচু করে ধরে রাখতে পারছে? ব্যতিক্রমতো থাকবেই এবং আছেও। ব্যতিক্রম আছে বলেই সভ্যতা টিকে আছে। ব্যতিক্রম তাই ভাবায় না, ভাবায় সচরাচরা আমরা যা করি, যেভাবে চলি। রাস্তায় একটা মানুষকে বিপদে পড়লে কতোজন এগিয়ে যাই সাহায্য করতে! যদি যাইও সেই বিপদগ্রস্থ মানুষের সামনে, উৎসাহটা থাকে শুধু দেখার জন্য ভিড় করা! লক্ষ্য করেছি কোথাও আগুন লাগলে কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ি তার ছবি বা ‘সেলফি’ তুলতে! তখন সেখানে দমকল বা কোন উদ্ধারকারী দলের পৌঁছাতে বিলম্ব এবং কষ্ট হয়। ফলে ত্বরিৎ সমাধানে এবং এর অব্যবস্থাপনায় মৃত এবং আহতের সংখ্যাই বাড়ে।

মানুষের বৃহত্তম নৈতিক বিধানে একটা নিম্ন মাত্রা আছে- যেখানে কোন বিষয়ে ‘না’ শব্দটা বা প্রকাশ বেশি হয় বা অগ্রাধিকার পায়। আর যেটাকে বলি উর্ধ্বমান, যাকে হাঁ বা হ্যাঁ বলে অন্যের পক্ষে যেটা ভালো হয়, এটা সাম্প্রতিককালে কমে যাচ্ছে এবং এর চর্চাটাও কমছে বৈ বাড়ছে না।

অধিকাংশ সময়ই নেতিবাচকের পেছনেই আমরা বেশি ছুটি। গুণিজনরাই বলেন যে, মানুষই সেই জীব, যে হিংসা পুষে রাখে, আর অতীতের হিংসা নিয়ে অন্ধের মতো ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে। অনেক রাজনীতিক এবং এর পরিচালনার নেতৃত্বে এ প্রবণতা লক্ষণীয়। তবে এটা সত্য কথা যে, পৃথিবীতে একটা আদর্শ বা আর্দশিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। এ রকম ধারণার যুক্তিটাও দুর্বল। একটা সমস্যা, আমরা যে যা প্রাণ দিয়ে চাই, সেটাই আবশ্যম্ভাবী ভাবতে বেশি ভালবাসি। ভুলে যাই কাল ও কালাতীতের পারস্পরিক আকর্ষণেই আদর্শের সৃষ্টি। তাই আদর্শ বদলায় কাল ও যুগের পরিক্রমাতে। পঞ্চাশের দশকে সমাজ ও রাষ্ট্রে যে বা যা আদর্শ ছিলো, ষাটে এসে সেটার পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে একাবিংশ শতাব্দীতে আরেক রূপে রূপান্তরিত। মানুষের স্বার্থচিন্তাও বদলে যাচ্ছে, সাথে তার আদর্শও।
এখনকার সমাজে ন্যায়-নৈতিকতা, বিচার-শাস্তি, দেশপ্রেম, প্রতিশোধ, যুদ্ধ বা শান্তি- সবকিছুর নতুন নতুন বোধ এবং সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে রাতে-দিনে যা দ্রুতই বলা যায়।
কিছুদিন আগে শুনেছি, কাউকে কোন কাজে ‘ঘুষ’ দিলে সেটাকে ঘুষ বলা যাবে না। সেটা হলো কাজকে ত্বড়ান্বিত করার জন্য কিছুটা ‘সম্মান’ বা ‘পুরস্কার’, ঘুষ না! এখন শুনছি ঘুষ যিনি দেন এবং নিবেনং, উভয়ই দোষী এবং এটা রোধ করতে হবে। কেবল এটাই নয়। এখন স্বাধীনতা, মুক্তি, শোষণ, স্বৈরাচার, গুপ্তহত্যা, বিচারভুক্ত বা বিচার বর্হিভূত হত্যা- সবকিছুর ব্যাখ্যাও রাতে-দিনে বদলে যায় এবং যাচ্ছে দেশ ও দেশান্তরে।

কখন, কখন কথায় কথায় কেউ রাষ্ট্রদ্রোহী হন, কারো বা এই দ্রোহ নানা কার্য করণ দ্বারা সুরক্ষিত। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে বৃহত্তর রাষ্ট্রে এ রকম প্রবণতা সমাজের সুকল্যানের পথে অন্তরায়। হিংসার বা হিংসাত্মক বিপ্লবের দাহনে সমাজের বাইরে যে অংশটার শেষ বা ইতি হয়, তাতে কিন্তু অসাম্যের বা অবিচারের গভীরের কারণের অবসান বা নির্মূল হয় না।

বিজ্ঞানের সুবাদে মানুষের জীবনের গড় আয়ু বেড়েছে হয়ত। কিন্তু মনে সুখ কতটা বেড়েছে। বিজ্ঞান ছাড়া আমাদের চলবে না তবে অন্যায় আশা এবং এর ব্যবহারও বড় বিপদের কারণ সৃষ্টি করে। এই সবকিছু আমাদের বাহ্যিক উন্নতির স্থিতিশীলতা এবং এর ফলাফল সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সাথে সম্পর্কিত এবং যুক্ত।
সমাজের বর্তমান মানবিক অবক্ষয়ের কৃষ্টিকে রোধ না করতে পারলে বা এর উত্তরণ না ঘটাতে পারলে, সামনে বিপদ বাড়বে। উন্নতি, ভোগ বিলাস এবং যে কোন প্রবৃদ্ধিও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। আমাদের চলমান কালও সভ্যতা এক চ্যালেঞ্জ ও সংকটের ভেতর দিয়েই এগুচ্ছে।

শুনামির মত গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের মানবিক আচরণ, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে। প্রতিদিনের খবরের কাগজগুলির দিকে চোখ ফেললেই নানা রকমের চারিত্রিক এবং আচার আচরণের অমানবিক চিত্র গুলি চোখ পড়ে। বহুক্ষেত্রেই এখন স্বাভাবিক মৃত্যুটাও অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে ধাপে ধাপে।

আমাদের মনে শৃঙ্খলার একটা আসন থাকা চাই। এই শৃঙ্খলিত আসন মানে মনের পায়ে শেকল পড়া নয়। এই শৃঙ্খলা বাইরের সঙ্গে ভেতরের যোগ ঘটাবার একটা অভ্যাসের চর্চাকে বোঝায়। এই অভ্যাসটা হচ্ছে ইতিবাচক মূল্যবোধের অনুশীলনের পথে বিরতিহীনভাবে পা পা করে চলা এবং অগ্রসর হওয়া। নিজেকে বুঝতে অন্যকেও বোঝার মানসিকতা রচনা করা। অন্যমত, অন্য মানুষ, অন্য ধর্ম, এসব বোঝার পরিবর্তে এখন আমাদের চরিত্রে এক রকম রাজতান্ত্রিক, মনোভাব একাই শ্রেষ্ঠ। এই মনস্তত্বের প্রভাব বেড়েই চলছে। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে শুভ যোগ এবং এর সমন্বয় ঘটছেনা। আপাতত উত্তরণের পথে রাষ্ট্র ও সমাজের অধিপতি দের এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের এই ব্যাপারে বিভিন্ন দায়িত্ব এবং জবাবদিহিতার পরিসর কিন্তু ব্যাপক। আমাদের মন ও মননকে সেবিতে আমিত্বের অহঙ্কার এবং এর অন্ধকারে সবই যেন কালো মেঘে ঢেকে না যায়। সমাজে বস্তুগত চাহিদার লাগামহীন দৌড় প্রতিযোগিতায় আমরা যেন শেষ না হই। আমরা রাষ্ট্র এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের অব কাঠামোর অসম বিন্যাসে হারিয়ে ফেলছি এক মানুষ অপর এক মানুষকে বোঝার অবস্থানের গুরুত্বকে। সবাই একা একা ভালো বা উন্নতি করতে গিয়ে অন্য মানুষের সেবার মনটা হারিয়ে গেছে গহীনে। কবি কাজী নজরুলের সেই কবিতাটা তখন মনে পড়ে।

‘‘যেই দধীচির হাড় দিয়ে ওই বাষ্প সকট চলে
বাবু সাব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বন্ধু তোমার বুকভরা লোভ দু’চোখে স্বার্থ ঢুলী
নতুবা দেখিতে তোমারে সেবিতে
দেবতা হয়েছে কুলি।”
সমাজের সাধারণ মানুষ যাদের শ্রম, ত্যাগ, সহনশীলতা উৎপাদন ও বিনির্মাণের কারণে সমাজের উন্নতি রক্ষিত হচ্ছে- তারাই দেবতাতুল্য আমাদের কাছে। কোন স্বার্থে ও ভোগের কারণে তাদের যেন নিজেদের কুলি না মনে করি কেউ।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
ই-মেইল: [email protected]