তোমার পতাকা যারে দাও

সব বিষয়েই সব সময় আমরা সবাই একমত হই না। এটাই স্বাভাবিক। কিছু দেখার বিষয়েও আমাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও অগ্রাধিকার পায়। এটা প্রকৃতিরই বিধান। তাই আমাদের প্রত্যেকের মতামত ও দেখাও আলাদা।
দেশ- আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, কিন্তু কেমন চলছে স্বদেশ। কেউ হয়তো বলবো এরচেয়ে ভালো কখনোই চলেনি, বা ছিলো না। কারো কাছে এই ভালোর মধ্যে মন্দটাই চোখের বালি। একই ভালো তো সবার জন্য অভিন্ন হয় না! কথায় আছে- প্রতিটা সৌভাগ্যের পেছনে দুর্ভাগ্য লুকিয়ে আছে। কাউকে ঠকানো, প্রতারণা করা, বঞ্চিত করা ছাড়া আরেকজনের ভালো করা চলমানকালে খুবই কঠিন। সবাই কি আমরা সবারই ভালো চাই কি-না, বা চাইলেও সংখ্যা কতো- এটাও ভাবার বিষয়। সবার ভালো চাইলে বা করতে হলে এক অর্থে প্রত্যেকেরই যার যার অবস্থানে ভালো হওয়া বা থাকা দরকার। অনেকে বলতেই পারি- ভালো-মন্দ এসব কথার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা ধারণা নেই। শব্দগুলো আপেক্ষিক। সময়, কাল, নীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির ওঠানামার সাথে যা সম্পর্কিত। কথাটা কতোটা ঠিক? ভালো-মন্দ যতোই আপেক্ষিক হোক না, এরপরও এসবের চিরন্তন কিছু অভিমত আছে। যেমন, কারো বাড়িতে গিয়ে কাউকে খুন বা হত্যা করে আসি, সেটা কিন্তু ভালো না। দ্বিমতের অবকাশ আছে কি? একজন অপর একজনকে কেবল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ঠকালাম বা হত্যা, খুন বা গুম করলাম। অথবা নিরাপরাধ কাউকে আঘাত করলাম, পেটালাম, পেট্রোল ছুঁড়লাম, গ্রেনেড ছুঁড়লাম- এগুলোর কোনটাকে ভালো বলবো?

ভালো বা মন্দ সব ক্ষেত্রে একে আপেক্ষিক বলা কিংবা এটা নিয়ে তর্কবির্তক করার অবকাশ নেই। শৈশবে ‘আদর্শ লিপি’ নামে একটি বই পড়তাম বা পড়ানো হতো। স্কুলে এবং ঘরেও। সেখানে কিছু আচরণ এবং চিন্তার বিষয়ে ভালো-মন্দ কথা লেখা থাকতো। আজকাল জানা মতে এমন কিছু বাচ্চাদের পড়াই না। ওরাও জানে না। এটা নগদ পাওনার যুগ। হাইব্রিড কালচারের চর্চা চলছে। মন এবং চিন্তার মাটিতে যেমন, তেমনি উৎপাদনের জমিতেও। এই হাইব্রিডের যুগে হাই ব্লাড প্রেসারও আমাদের ভোগাচ্ছে। লক্ষ করি কারোর প্রতি নিজেদের ভাবনা- ভালো বা মন্দ, সেটা প্রকাশের উত্তেজনাতে। কিছুর সমালোচনার বেলাতেও এই উত্তেজনা দেখা যায় কখন, কখন।
সমস্যার গভীরে যেতে চাই না অনেকেই। তড়িঘড়ি কারণ চিহ্নিতকরণ এবং তার সমাধানে আগ্রহী হই। চলমানকালে আমাদের উন্নতি আছে। প্রগতি আছে। সামনে এর আরো প্রসার হবে। কৃষি থেকে শিল্প এবং আগামী প্রজন্মের অন্য নানান ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল হবার এবং বিশ্বে নিজের আত্মপরিচয়কে গৌরবের করারও সম্ভাবনা অনেক। এগুলো সবকিছু সময়ের দাবি, চ্যালেঞ্জ এবং অস্তিত্বের যুদ্ধের সাথে জড়িত। পাশাপাশি আমাদের ক্ষমতার নেশার সাথে আইনের শাসনের কার্যকরি বাস্তবতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার হাল সম্প্রতি সবক্ষেত্রেই শান্তির ললিত বাণী অরণ্যে রোদন, যেনো স্বপ্ন পোড়ার জ্বালা।

ভয় ও সন্ত্রাস উন্নত সমাজেও বিরাজ করে। কখন কখন হতাশার মেঘে কালো হয় হৃদয়ের সাদা/নীল আকাশ। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই কথা কানে বাজে- ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস/ শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।
দেশে এখন মহামারি আকারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রতাপ। ইতিমধ্যে হাজার-হাজার মানুষ আক্রান্ত। মৃত্যুও হয়েছে অনেকের। কিন্তু বিষয়টার গভীরতার ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে একে অন্যকে দোষারোপ, কেউ অন্যের সমালোচনা, বিষয়টাকে নিয়ে হাসি-তামাশার কথা বা কথকতা যা শুনছি এবং পড়ছি সেটা দুঃখজনক।
দায়িত্বশীল এবং দায়িত্ববান কেউ এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্বের বা অব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় পদত্যাগ করেনি, মনে হয় করবেনও না। দেশে পদত্যাগ করার ‘বদ অভ্যাস’ অবশ্য নেই। পদে থাকবে বা রাখতেই হবে যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ।
ব্যাংকের টাকা লুট, গণপিটুনিতে যাকে-তাকে ধরে মেরে ফেলা। ধর্ষণ ও মিথ্যা মামলা। আসামির বিনা বিচারে মুক্তি। দলীয় নানা ধরনের ইজারাপনা- এসবের উন্নতিও চোখে পড়ে। অনেকে এটাও বলছেন যে, এসব কিছুই নাকি উন্নতির পূর্বশর্ত।
নূতন শতকের প্রায় উনিশটি বছর শেষই বলা যায়। এ সময়ে যেমন আমরা, তেমনি বিশ্ববাসীও প্রত্যক্ষ করছে সমাজ-জাতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং অবক্ষয়কে। মায়ের কোলে সন্তান নিরাপদ নয়! প্রার্থনায় নত শীর, তাদেরও জীবনের নিশ্চয়তা নেই। স্কুলে ছোট ছোট শিশুদের জীবন নিরাপদ নয়। আনন্দ, উৎসব কেন্দ্র নিরাপদ নয় অস্ত্র বা বন্দুকধারীদের হাত থেকে। ক্লাব/রেঁস্তোরাও আক্রান্ত সন্ত্রাসীদের তৎপরতায়। ধনীদের সন্তানরাও সন্ত্রাসী নানা বিভ্রান্তির কারণে।

এগুলো সভ্যতার দুর্ভাগ্য। বর্তমান শতাব্দীতে দাউ দাউ করে জ্বলছে রাজনৈতিক সশস্ত্র সংঘাতভিত্তিক পরিবেশ। খাদ্য উৎপাদন ও এর সরবরাহের সিন্ডিকেট বাড়ছে। জ্বালানি সংকট এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যেও রুঢ় বাস্তবতা দিক ও দিগন্তে ছড়াচ্ছে। শরণার্থী জটিলতা এবং এর রাজনৈতিক ব্যবহার বদলাচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে ন্যায়, সততা, ত্যাগও ইতিহাসের সংজ্ঞা। বাড়ছে বিভিন্ন তদন্তের অসমাপ্ত নথির বোঝা।
১৯৯০ দশকের সূচনাতে ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার পতন হয়। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষের পর স্নায়ুযুদ্ধের শেষ হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে দুনিয়ার এক শক্তিশালী পিলার হয়ে। আধিপত্য বিস্তার হচ্ছে তার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন- এই দুই পরাশক্তির বজায়কালে যেটুকু স্থিতিশীলতা বিশ্বে ছিল, তা এখন নেই। এক ধরনের ‘স্যাটেলাইট সাম্রাজ্য’ বৃদ্ধি বা বিস্তার করে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেশে দেশে স্থিতিহীনতা, অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, জাতিগত এবং ধর্মভিত্তিক সংঘাত ও সংঘর্ষ বেড়ে যাচ্ছে। দৃষ্টান্ত চলমানকালের বসনিয়া, কসোভো, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, রুয়ান্ডা, এঙ্গোলা, কঙ্গো, সিয়েরা লিয়ন, আর্মেনিয়া, কাজাখস্থান, রাশিয়ার চেচনিয়া। এসব জায়গার বিচলিত ঘটনাগুলোর কথা বলা যায়। যোগ হয়েছে কাশ্মির অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা।

এসব ক্ষেত্রেই ব্যক্তিতান্ত্রিকতা, কর্তৃত্বায়ন ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের মোড়লিপনাতে নিহত হয়েছে এবং হচ্ছে অসংখ্য নিরাপরাধ এবং আত্মমর্যাদার সংগ্রামে লড়াই করা হাজার-হাজার নিরপরাধ মানুষ। প্রভু-মনিবের সামন্ত প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও শেষ হয়নি। কর্পোরেট প্রথার মাধ্যমে সামন্ত প্রথা এখন নতুন বিশ্বের নিয়ম। (নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার)।
পৃথিবীর কমবেশি নানা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও জনপ্রতিনিধি বাছাই বা নির্বাচনে এক হাইব্রিড পদ্ধতি এবং এর বাস্তবতা দেখছি। হাইব্রিড নির্বাচন নিয়ে সম্প্রতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের প্রকাশিত বই ‘Voting in a Hybrid Regime’ (প্রকাশক : Palgrave Macmillan) বইটি চিন্তাশীল মহলে আলোচিত এক গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে অধ্যাপক আলী রীয়াজ তথ্য এবং নানা সূত্র দিয়ে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের অসঙ্গতি তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকাতে ২৬ জুলাই ২০১৯ এ বই নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনাতে বলা হয়- ‘অধ্যাপক রীয়াজ মনে করেন যে, কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্র বা সমাজের শাসকরা নির্বাচনের প্রতি তারা একটি প্রতিক্রিয়া দেখান। তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাসী না। আবার নির্বাচন ব্যবস্থাকে তারা নির্মূলও করতে চায় না। এর পরিবর্তে তারা যেটা করেন, সেটা নির্বাচনটা পেতে ভোটের অনুষ্ঠানকে ম্যানপুলেট করেন।’ অধ্যাপক রীয়াজ হাইব্রিড রেজিমের অধীনে ভোটের কি হাল হয় বা হতে পারে- দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বাংলাদেশের ২০১৮ সালের নির্বাচনকে কেসস্টাডি হিসাবে দেখিয়েছেন। বইটি পড়ার পর স্পষ্ট হয়ে যায় ৯০-উত্তর তো বটেই, এর পূর্বেও গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্যতম একটি যে নাগরিকের ভোটাধিকার, এটাও এখন সন্ত্রাস, ভয়, চাঁদাবাজি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ইজারা মুক্ত নয়। সাথে যুক্ত প্রতিবেশী বা বিদেশি রাষ্ট্রশক্তির স্বার্থ এবং এর প্রভাব।

নানা দেশে বর্তমান কালটা যতোটা উন্নতি ও সমৃদ্ধির এক যান্ত্রিক যুগ বলা যায়, ততোটাই মানবিক মূল্যবোধের ক্রান্তিকাল। আমরা হৃদয় এবং মনও চাই। যুক্তিও চাই। আবেগও চাই। কবিতাকে ভালবাসি, আবার কঠিন গদ্যও চাই। বিধাতা যে পতাকা আমাদের হাতে তুলে দেন, তারে বহিবার শক্তি যেনো ইচ্ছা করেই দিলেন না কিনা, জানি না!
১৯৭১-এ আমরা একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র পেলাম অজস্র বুকের রক্তের বিনিময়ে। পতাকা পেলাম। উন্নতি, প্রগতি, প্রবৃদ্ধিও হলো বাঙালি জাতির বাংলাদেশিদের। কথা ছিলো- আমরা একটি ন্যায়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবো। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকবে আমাদের। ব্যক্তিমর্যাদা থাকবে। বৈষম্য কমাবো। ‘৭১ সেই পতাকাই আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু এর বহিবার শক্তি হয়ত দেয়নি।

সমাজ ও রাষ্ট্রে এখন কারণে-অকারণে বৈষম্য এবং একে অন্যের ব্যাপারে হিংসা, প্রতিহিংসা, জিঘাংসা এবং কুচক্রে দিবানিশি কাটে। এই মানসিকতা বা প্রবণতা আমাদের অর্জন এবং প্রবৃদ্ধির অন্য সব পাপড়িকে ছিঁড়ে নিয়ে যায়।
আরেকটু দায়িত্বশীল, নৈতিক, উদার, মহৎ হওয়া জরুরি প্রত্যেকেরই প্রত্যেকের প্রতি। বিশ্বে এবং দেশের বর্তমান হালচাল কিন্তু এর বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত। এটা ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ভদ্রতা, সৌজন্য- সব জায়গাতেই এক যুগসন্ধিক্ষণের ভেতর দিয়ে হাঁটছি আমরা। স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের যে পতাকা আমাদের পূর্বসুরী শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বরা হাতে তুলে দিয়েছিলেন, বিধাতা সেই পতাকাকে বহন করার শক্তি আমাদের দিয়েছেন কম।
পতাকাটাকে যেন ছিঁড়ে না ফেলি বা বর্গির হাতে তুলে না দিই । ভবিষ্যতে যারা আমাদের লাল-সবুজের পতাকা হাতে নেবে, তাদের জন্য এই প্রার্থণা, রবীন্দ্রনাথের কথাতেই বলি-
‘তোমার পতাকা যারে দাও
তারে বহিবারে দাও শকতি।’

বয়সে এখন যারা তরুণ, তারা জীবনকে অনুভব থেকে এবং অনুভবকে জীবন থেকে আলাদা করে দেখতে পারছে না, ওদের জন্য বলা- লাল-সবুজের এই পতাকার ওজন কিন্তু ভারি। হাজার হাজার পৃষ্ঠা আছে এই পতাকার লাল ও সবুজ রংয়ে লেখা। আছে জানা-অজানা অগুনিত দেশপ্রেমিকদের আত্মত্যাগ স্বার্থত্যাগ এবং প্রাণদানের কাহিনী।
আছে সুন্দর প্রত্যয়, প্রতিজ্ঞা ও স্বপ্নের নকশি কাঁথায় বোনা রেখাচিত্র।

কোন ধোঁয়াশে আলেয়ার পেছনে যেনো না ছুটি আমরা সেটাকে আলো ভেবে। আগামী প্রজন্ম যখনই এই পতাকা হাতে নিয়ে সম্মুখে যাবে, মনে রাখবে আমাদের আজকের রাজনীতি ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণ ও ফলাফলকে এবং একই ভুলের যেনো পুনরাবৃত্তি না হয়। আজকের হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের কথা বার বার এভাবে বলার অন্যতম একটি কারণ- আগামীদিনের সূর্যের আলো যেনো মানুষের তৈরি মেঘে ঢেকে না যায়। সত্যের পতাকা বহনের শক্তি সঞ্চিত হোক।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক।
৩০ আগস্ট ২০১৯
ই-মেইল: [email protected]