থামছেই না পাথরখেকোরা

সিলেট : আগে ছিল অবারিত পাথর সম্পদ। যেদিকেই চোখ যেত কেবল পাথর আর পাথর। গেল দুই যুগে শেষ হয়ে গেছে সব। এখন শুধু কঙ্কাল। আর সেই কঙ্কাল থেকেও শকুন দৃষ্টি সরছে না পাথরখেকোদের। সব যেন শেষ করে দেওয়ার মিশন নিয়ে নেমেছে তারা। মাটির নিচে, নদীর তলদেশে যতক্ষণ পাথর আছে সেগুলো যেন নিঃশেষ হলেই থামবে তারা।
আর অপরিকল্পিতভাবে এই পাথর উত্তোলন করায় বাড়ছে হতাহতের ঘটনা। শুধু শ্রমিক মারা যাচ্ছে তা নয়, নদী থেকে বোমা মেশিনের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন করায় বিভিন্ন স্থানে চোরা গর্তে পড়ে প্রাণ যাচ্ছে পর্যটকদের। গত ২০ বছরে সিলেটের পর্যটন সমৃদ্ধ এসব এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন শ্রমিক ও পর্যটকসহ তিন শতাধিক ব্যক্তি। তার পরও যেন কোনো মাথাব্যথা নেই প্রশাসনের। অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলং, কোম্পানিগঞ্জ ও কানাইঘাটে রয়েছে প্রচুর পাথরসমৃদ্ধ এলাকা। মাটির নিচে এবং নদীর তলদেশেও মেলে পাথরের খনি। বিগত দুই যুগে শেষ করে দেওয়া হয়েছে তা। স্থানীয়রা জানান, আগে জাফলংয়ে বিশাল বিশাল আকারের পাথর মিলত। একেকটি পাথর ছিল এক থেকে দেড় টন। বোল্ডার হিসেবে ডাকা হয় এসব পাথরকে। এখন আর এসব নেই। ২ থেকে ২০ কেজি ওজনের বোল্ডারও মেলে না। ছোটখাটো পাথর তোলা হচ্ছে। বোমা মেশিন নদীর এক থেকে দেড়শ ফুট নিচে থাকে। মাটির নিচে ব্লাস্ট হওয়ায় পাথর অনেকটা ছোট হয়ে পাইপ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নদীর তলদেশ, সমতল ভূমিতে গভীর গর্ত করে ও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলনে গত কয়েক দশক ধরে এলাকার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি হারিয়ে গেছে। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও এর অস্তিত্ব নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. নাজমানারা খানুমও তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে উদ্বেগ প্রকাশ করে সচেতন মহলকে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। জাফলং, কোম্পানীগঞ্জ, ভোলাগঞ্জ এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। হাইকোর্ট থেকে বোমা মেশিন বন্ধের নির্দেশনা থাকলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু গত পাঁচ বছরে বিছনাকান্দি, লালাখাল ও জাফলংয়ে প্রায় ৬০ পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। মারা গেছে শ্রমিকও। আর যারা পাথর তুলতে গর্ত করে, তারা হচ্ছে টাকার খনি। এসব খনির ধারে কাছেও যেতে পারে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন। উল্টো কোয়ারির মালিকদের তোয়াজ করে চলে পুলিশ। কোয়ারির মালিকদের কথামতো কাজ না হলে কর্মকর্তাদের বদলিও করানো হয়। পরিবেশ কর্মীরা জানান, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের স্বার্থের জন্য শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত কাজ করেও তারা পাচ্ছেন না শ্রমের মূল্য। এ ব্যাপারে পরিবেশ আইনবিদ সমিতির সিলেটের সমন্বয়কারী আইনজীবী শাহ শাহেদা বলেন, ‘আমাদের ১২টা আমরাই বাজিয়েছি। যারা দায়িত্বে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে এ ভয়ঙ্কর তা-ব বন্ধ হবে না।’ এ ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার পাল বলেন, ‘পরিবেশ আর ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না। কঠিন পদক্ষেপ নিচ্ছি আমরা।’