দখলের রাজা শিবগঞ্জের আজিজুল

বগুড়া : বগুড়ার শিবগঞ্জে চলছে আজিজুল হকের দখলরাজত্ব। কোনো কাগজপত্র বা টাকার বিনিময় ছাড়াই সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সাধারণ মানুষের জমি দখল করে নিচ্ছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে শিবগঞ্জে কেউ কথা বলা মানেই নির্যাতন ডেকে আনা। তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শিবগঞ্জ উপজেলা সভাপতি। এটাই তার শক্তির মূল উৎস।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দখল রাজার কবল থেকে রক্ষা পায়নি মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে অসহায় সিএনজিচালক, হিন্দুদের শ্মশানসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। এমনকি জমির ধানও লুট করে নিয়েছেন তিনি। পুকুরের মাছ, গাছ, বাঁশঝাড় কেটে দখলে নেওয়ার ঘটনাও আছে। আর এভাবেই দখলের রাজা বনে গেছেন শিবগঞ্জের এই আওয়ামী লীগ নেতা। তার রোষানল থেকে সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। এমনকি শিবগঞ্জ বিআরডিবির সভাপতি পদও জমি দখলের মতো তিনি দখলে নিয়েছেন। আজিজুলের এই দখলের সঙ্গে রয়েছেন তার স্ত্রী শিবগঞ্জ উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসরাত জাহান রাখি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দখল রাজা আজিজুলের রয়েছে কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এর মধ্যে জমি দখল বাহিনী, সালিশ বাহিনী উল্লেখযোগ্য। দখল হয়ে যাওয়া জমির প্রকৃত মালিকরা বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পান না। তার এহেন কর্মকা-ের জন্য শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ কয়েক ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের, আরেক পক্ষ পৌর মেয়রের এবং অন্যটি আজিজুলের। উপজেলা সাধারণ সম্পাদক ও শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র তার কর্মকা- পছন্দ না করলেও ভয়ে একটু যোগাযোগ রাখেন। তবে উপজেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা আজিজুলের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছেন।
জানা যায়, আজিজুল একসময় ফেরিওয়ালা ছিলেন। শিবগঞ্জে আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকায় নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা ছিল না। ফলে আজিজুল আওয়ামী লীগের নেতা বনে যান। দুবার উপজেলা সাধারণ সম্পাদক ও ২০১৩ সালে সভাপতি হন। এই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। একবার উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আলমগীর হোসাইনের কাছে নিজের জামানত হারান। ২০১৬ সালের ২ মে বিহার ইউনিয়নের ধামাহার গ্রামের আবদুল খালেকের ৭৩ শতক জমির ৫৫ মণ ধান লুটে নেওয়ার ঘটনায় আজিজুলসহ ১৪ জনের নামে মামলা হয়। একই বছর ২৩ জুলাই উপজেলার পুটখুর মৌজার সোয়া ৪ একরের একটি জলমহালের মাছ লুটে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় আজিজুলসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ইসাহাক আলী নামে এক ব্যবসায়ী বগুড়া আদালতে মামলা করেন। শিবগঞ্জের সাংবাদিক প্রদীপ মোহন্তকে নানা ঘটনায় হুমকি-ধমকি দেওয়ায় তিনি ২০১৬ সালের ৩ জুলাই সাধারণ ডায়েরি করেন। শিবগঞ্জে কোনো সাংবাদিকই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে কোটি টাকা মূল্যের একটি জমির মালিক সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও শিবগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আজিজ মাস্টার। এ জমিতে কুদৃষ্টি পড়ে আজিজুলের। নিজস্ব বাহিনী নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আজিজ মাস্টারের এই জমি দখলে নিয়ে নেন আজিজুল। আজিজ মাস্টার বাধা দিলে আজিজুলের লোকজন তাকে ও তার স্বজনদের পিটিয়ে জখম করেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস, থানা পুলিশসহ বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করলেও আজিজুলের ভয়ে কেউ আজিজ মাস্টারের পাশে দাঁড়াননি। এই মুক্তিযোদ্ধার জমিতে এখন দৃষ্টিনন্দন ভবন বানিয়েছেন দখলদার আজিজুল হক। এ ঘটনায় আজিজ মাস্টার বগুড়া আদালতে একটি মামলা করেন। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা আজিজ মাস্টার বলেন, ‘৬০-৭০ জনের একটি বাহিনী নিয়ে আজিজুল আমার জমি দখল করে নেয়। এখন এই জমিতে আজিজুল ভবন বানিয়েছে। আমি প্রতিবাদ করায় আজিজুল আমার বাসার সামনে মানুষের বিষ্ঠা ফেলে রাখে। এমনকি রাত-বিরাতে দরজা-জানালায় লাথিও মারে। রাস্তায় তার বাহিনীর ছেলেরা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারের আমলে অসহায় জীবনযাপন করছি।’ তিনি বলেন, ‘এই আজিজুল একসময় হকার ছিল। বিভিন্ন বাজারে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করত। আজিজুল আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও সরকারি বিভিন্ন দফতরে জামায়াত ও রাজাকারদের চাকরি দিয়েছে।’
শহরের বানাইল এলাকায় সড়কের পাশে সিএনজি অটোরিকশা চালক আফজাল হোসেনের ছেলে ইব্রাহিম ইসলাম পিটু ৭ শতক জমিতে একটি খুপরি ঘর বানিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। আর এই সিএনজিচালকের খুপরি ঘরের সামনে সড়কের অন্য পাশে আওয়ামী লীগ সভাপতি আজিজুলের বাসা। সরকারদলীয় সভাপতির বাসার সামনে একটি খুপরি ঘর মানায় না অল্প জমি হলেও জমিটি মূল্যবান, তাই জমিটি নিজের দখলে নিতে তিনি ফন্দি আঁটেন। আজিজুল তার বাহিনী লেলিয়ে দেন সিএনজিচালকের বিরুদ্ধে। তার ঘরের সামনে মুরগির বিষ্ঠা, বাসাবাড়ির ময়লা ফেলে রাখেন। এমনকি মানুষের মলমূত্রও ফেলে রাখা হয়। দিনের বেলায় ঘরের সামনে আজিজুলের ছেলেরা মোটরসাইকেল রাখেন, যাতে সিএনজিচালক পিটু অতিষ্ঠ হয়ে এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এর প্রতিবাদ করলেই সিএনজিচালককে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এ ঘটনায় বগুড়া প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। সিএনজিচালক স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অসহায়ের মতো নানা দফতরে ধরনা দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে ইব্রাহিম ইসলাম পিটু বলেন, ‘আমার পৈতৃক সম্পত্তিতে বসবাস করছি বহুদিন ধরে। হঠাৎ আজিজুল হক জোর করে আমাকে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছেন। এমনকি আমার ঘরের দক্ষিণের একটি অংশ দখল করে একজন পুলিশকে তিনি ভাড়া দিয়েছেন। আমি থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছি। কিন্তু পুলিশ আজিজুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেয়নি।’ এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে দখলের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি বৈধভাবেই আজিজ মাস্টারের জমি ও সিএনজিচালকের জমি দখলে নিয়েছি।’
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, আজিজুল হকের দখলি দৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শিবগঞ্জ উপজেলা শহরের মূল সড়কের ওপর করতোয়া নদীঘেঁষা হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কয়েক শ বছরের পুরনো শ্মশানের জমি। এ ছাড়া পৌরসভার দহিলা এলাকায় কুতুব আলীর ৩ বিঘা জমি দখলে নেওয়া হয়। উপজেলার আলাদী এলাকায় সরকারি জমি দখলে নিয়ে মাছের আড়ত বানিয়েছেন তিনি। উপজেলা শহরের শিশু পার্কের পাশে এক প্রতিবন্ধীর ২০ শতক জমি দখলে নেওয়া হয়। শিবগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ২২টি দোকান নিয়ে মার্কেট রয়েছে। এ মার্কেটের ছয়টি দোকান ভাড়া নেন আজিজুল হক। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সভাপতি হওয়ায় ওই দোকানগুলোর ভাড়া কখনো স্কুল কর্তৃপক্ষকে তিনি দেন না। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে কিছু বলার সাহসও পায় না। উপজেলার সৈয়দপুর, কাঠগড়া, ধামগড়া, মড়াগাটা এলাকায় পুকুর দখলে নেন তিনি। এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, ‘আজিজুল মামা স্কুলের মার্কেট লিজ নিয়েছেন। কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাড়া দিলেও দুই বছর যাবৎ কোনো ভাড়াই তিনি দিচ্ছেন না।’ একই কথা বলেন স্কুলের সভাপতি বুলবুল ইসলাম, ‘১৯ বছর যাবৎ স্কুলের মার্কেট দখলে রেখেছেন আজিজুল। নিজের বাবার সম্পত্তির মতো তিনি মার্কেটে যা খুশি করছেন।’ গত বছরের ২০ ডিসেম্বর উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি লিমিটেডের নির্বাচনের তফসিল দেওয়া হয়। এ নির্বাচনে আজিজুল সভাপতি প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। ২৭ নভেম্বর দুপুরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যান। তখন উপজেলা পরিষদ চত্বরে পুলিশের সামনেই আজিজুলের বাহিনী তাকে কুপিয়ে আহত করে এবং মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এ সময় পাশেই বসা ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাসহ আজিজুল হক।