দিনাজপুরে প্রাণিখেকো উদ্ভিদ

দিনাজপুর : প্রাণীদের খেয়ে ফেলেÑ এমন উদ্ভিদের কথা রূপকথার গল্পে আছে, বাস্তবেও আছে; তবে সত্যিসত্যি তেমন উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু বিরল সেই উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছে দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ। গাছটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে কলেজেরই ক্যাম্পাসে। উদ্ভিদটি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন ছাত্রছাত্রীরা।

দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, এক বীজপত্রী মাংসাশী এ উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম যাকে বাংলায় বলা হয় সূর্যশিশির। মাংসাশী উদ্ভিদের মধ্যে এই প্রজাতি সবচেয়ে বড়। ৪-৫ সেন্টিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট গোলাকার থ্যালাসসদৃশ উদ্ভিদটির মধ্য থেকে একটি লাল বর্ণের ২-৩ ইঞ্চি লম্বা পুষ্পমঞ্জরি হয়। ১৫-২০টি তিন থেকে চার স্তরের পাতাসদৃশ মাংসল দেহের চার দিকে পিন আকৃতির কাঁটা থাকে। মাংসল দেহের মধ্যভাগ অনেকটা চামচের মতো ঢালু এবং পাতাগুলোতে মিউসিলেজ সাবস্ট্যান্স নামের এক রকমের এনজাইম (আঠা) বের হয়। সুগন্ধে ও উজ্জ্বলতায় আকৃষ্ট হয়ে পোকা বা পতঙ্গ উদ্ভিদটিতে পড়লে এনজাইমে আটকে যায়। এ সময় পতঙ্গ নড়াচড়া করলেই মাংসল পাতার চার দিকের পিনগুলো বেঁকে পোকার শরীরকে বিদ্ধ করে আটকে ফেলে। এভাবে এ উদ্ভিদটি পোকা বা পতঙ্গ খেয়ে থাকে।

গত ১৫ জানুয়ারি দিনাজপুর সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের উত্তর দিকের পরিত্যক্ত ভ‚মিতে এ উদ্ভিদগুলো শনাক্ত করা হয় বলে জানান সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, মাংসাশী বা পতঙ্গখেকো এই উদ্ভিদের ইংরেজি নাম। এটি  বর্গ এবং  গোত্রভুক্ত। কলসপত্রী ও পাতাঝাঝি নামে এ গোত্রের আরও দুই সদস্য রয়েছে।

কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের এমএসসি শেষ পর্বের ছাত্র মোসাদ্দেক হোসেন জানান, ২০১৬ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের জীববিজ্ঞান গ্যালারিতে ঘুরে দেখার সময় জেনেছিলেন, সূর্যশিশির নামের এমন একটি উদ্ভিদ এ দেশে শুধু দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলেই জন্মায়। এরপর তিনি বিভিন্ন স্থানে এ উদ্ভিদটি খোঁজার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত গত ১৫ জানুয়ারি বিভাগের শিক্ষকদের সহায়তায় কলেজ ক্যাম্পাসেই সূর্যশিশিরের সন্ধান পান তিনি। এর ফলে নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, একটি উদ্ভিদ কিভাবে পোকা খায়। এ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এ উদ্ভিদটি পেয়ে এটি নিয়ে হাতেকলমে কাজ করার একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি হলো।

একই কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী হাফিজা ইসলাম হ্যাপী জানান, নিজেদের ক্যাম্পাসে পতঙ্গখেকো এই উদ্ভিদের সন্ধান পেয়ে তারা গর্ববোধ করছেন।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. ফিরোজ জানান, এ এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় এমন একটি গাছ পাওয়ায় উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য নিয়ে জ্ঞানার্জন অনেক সহজ হবে।

পিএইচডি গবেষণারত কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল হোসেন জানান, সূর্যশিশিরকে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এর আগে বাংলাদেশে এই উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা হয়নি। এটিকে রক্ষা ও গবেষণা করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। কিভাবে এটি কপি ও সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। এর টিস্যু নিয়ে কাজ করা যাবে বলেও মনে হচ্ছে। এই উদ্ভিদটি প্রোটিন হিসেবে পোকামাকড় খায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর আগে দেশের অন্য কোথাও এমন উদ্ভিদের সন্ধান মেলেনি বলেও জানান তিনি।