দুই নেত্রীর কাছে খোলা চিঠি

আহমেদ মূসা : জননেত্রী শেখ হাসিনা ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, আসসালামু আলাইকুম।
আপনাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে আজ আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই।
আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও শ্রেষ্ঠ বীরদের হত্যার বধ্যভূমিতে স্বজনদের রক্ত ও অশ্রুসিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে আপনারা রাজনীতিতে এসেছিলেন, তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে আসতে হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমি শর্তহীনভাবে আপনাদের সম্মান করি, যেমন সম্মান করি বাংলাদেশের পতাকাকে। সম্মান করি তাদের, যাদের আত্মবলিদান ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এ-যাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকাক্সক্ষার স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। একটি জাতির উত্থান, স্পন্দন ও বিজয়ে কত নাম-না জানা মানুষের ত্যাগ এবং রক্ত-অশ্রু থাকে!
তবে রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনাদের সব কাজ সবার কাছে সমর্থনযোগ্য নয়। সব কাজেই প্রশংসা ও সমালোচনা বিদ্যমান থাকে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে, যেগুলো আমার চোখে সমালোচনার যোগ্য, আমি আজকে বলে যেতে চাই। বলে যেতে চাই, অন্তত বয়সের দাবিতে এবং অভিজ্ঞতার আলোকে।
আমি এমন এক সময় এই লেখাটি লিখে চলেছি, যখন কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে আমার চাওয়া-পাওয়া বা হারাবার কিছু নেই। ক্যান্সারসহ কিছু জটিল ব্যাধি নিয়ে জীবনসায়াহ্নে পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, বাংলাদেশে আমাদের উত্তর-পুরুষদের সামনে ভয়াল এক অন্ধকার। মানুষের জীবন-জীবিকা, সম্মান, মৌলিক ও মানবাধিকার চরমভাবে ভূলুন্ঠিত। আমাদের আলোকিত মানুষেরা যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন, সে আলো ক্রমশ নিভে আসছে। সেই উদ্বেগ থেকে এই লেখা।

মাননীয় জননেত্রী, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা, দলে ভাঙন ঠেকাতে আপনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশে এসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আপনার আগমনের ১৩ দিনের মাথায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হন। এরপর বিএনপিও ভারসাম্য রক্ষা করতে দলে নিয়ে আসে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। আপনারা দুজনই নিজ নিজ দলের পক্ষে ঐক্য এবং দুই দলের জন্য ভারসাম্যের প্রতীক। কিন্তু জাতির কাছে, এই মুহূর্তে জাতীয় স্বার্থে আপনাদের আগমন, বিকাশ ও পরিণতি কী দাঁড়িয়েছে, সে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
আমি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগ করেছি এবং ১৯৯৬ সালের মধ্যভাগ থেকে কার্যত ২০০৭ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত করেছি বিএনপি। অবশ্য অনেকগুলো সাংস্কৃতিক ও লেখক সংগঠনের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত ছিলাম। এখন আমি কোনো দলে যুক্ত নই বলেই মুক্তকণ্ঠে কথাগুলো বলার অবকাশ আছে। বিএনপি করার সুবাদে আমি ভেতর থেকে এই দলটিকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তবে আওয়ামী লীগ সম্পর্কেও আমার অভিজ্ঞতা কম নয়। আমি এই দলটিকে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এসেছি। এই দলটির ওপর আমার একটি গ্রন্থ ও অসংখ্য লেখা রয়েছে। কথা বলব আমার নিরীক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে।
আমি যে কথাগুলো বলব সেগুলো আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ঘরানার কোনো লেখক-বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বলা সম্ভব নয়, দলীয় কাঠামো বা ঘরানার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে। সে অবস্থায় আমিও পারতাম না। তাদের সমস্যা আছে, যে সমস্যা আমার এখন নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি হিসেবে আপনারা রাজনীতিতে এসেছিলেন। আপনারা রাজনীতিবিদ হিসেবে একসময় ছিলেন তাদের ছায়া কিংবা অবশেষ। পরিশেষে, এখন দেখতে পাচ্ছি আপনাদের হাতে রাজনীতি এবং নেতৃত্বের বিকৃত বিকাশ ঘটে চলেছে, যার কারণে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে এবং আরো বড় ক্ষতির পথ উন্মুক্ত হতে চলেছে।
একসঙ্গে আপনারা সংগ্রাম করেছিলেন এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, যে স্বৈরাচার বাংলাদেশের সমস্ত প্রথা-প্রতিষ্ঠান এবং মূল্যবোধ ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী বীজ রোপণ করে গেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে আপনাদের সেই সৌহার্দ্য আর থাকল না। যে আন্দোলনে আপনারা দুজন নেতৃত্ব দিয়ে জাতির সম্মান অর্জন করেছিলেন, সেই এরশাদকেই আবার আপনারা ক্ষমতা এবং রাজনীতির স্বার্থে কাছে টেনে এনেছেন। আপনাদের উত্থান-পর্বের গৌরবজনক অধ্যায়ের কবর রচনা করেই শুরু করলেন অশুভ যাত্রা। সেই যাত্রা বাংলাদেশকে আজ কোন গন্তব্যে নিয়ে এসেছে, আশা করি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। দেখছেন দেশের জনগণ। ক্ষমতাকেই আপনারা সব সময় বড় করে দেখেছেন। এতে দেশ ও জনগণের পরিণতি কী হতে পারে বা জনগণের কাছে কী বার্তা যাচ্ছে, তা নিয়ে কখনো ভাবেননি।
এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় জামায়াত আপনাদের একজনকে অনুসরণ করে আন্দোলনের মিত্র সেজেছে, ৯৬ পর্বেও একই কাজ করেছে। অন্যজন জামায়াতকে ভাগ দিয়েছেন ক্ষমতার, এমনকি তাদের গাড়ি-বাড়িতে তুলে দিয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা, যে দেশটাকে জামায়াত আজও আন্তরিকভাবে মেনে নিয়েছে কি না সন্দেহ। ভুল কারো কম, কারো বেশি, কিন্তু সবটাই যে ক্ষমতার জন্য, তাতে সন্দেহ নেই। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে আপনারা ক্ষমতায় থাকার জন্য যাবতীয় যা কিছু দরকার তা-ই করেছেন এবং করে চলেছেন।
জনগণ আপনাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠালে আপনারা ক্ষমতার চেয়ারে না বসে উপবেশন করেন বাঘের পিঠে। নামতে না পারায় আপনাদের দরকার হয় ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, ২০১৪ ও ২০১৯ সালের মহাকলঙ্কের নির্বাচন। এই গর্হিত কাজে কখনো দোহাই দিয়েছেন সংবিধানের। রাষ্ট্রকে জালিয়াতি ও তস্করের কাজে ফাইফরমাশ খাটায় বাধ্য করেছেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনীতির বড় বিকৃতি হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকার ও দলগুলো বিরোধী দলগুলোকে কখনো আস্থায় না নিয়ে উচ্ছেদের বিরামহীন অপচেষ্টা চালানো, যদিও সে চেষ্টা কখনো সফল হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।
একই বিকৃতির জন্য প্রকৃত বিরোধী দলকে বাইরে রেখে গৃহপালিতদের খড়কুটো দিতে হচ্ছে। রাজনীতি, নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের বিকৃত বিকাশের খেসারত হচ্ছে বামুন-ক্লাউনদের মঞ্চ দখল। ঘটে চলেছে সার্কাসের পালা।
রাজনীতিতে আগে নেতৃত্ব আসত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, গণসংগঠন, অঙ্গসংগঠন, ত্যাগী ও পোড়খাওয়া ব্যাকগ্রাউন্ডের সৎ-অঙ্গীকারবদ্ধদের মধ্য থেকে। বিকৃত বিকাশে এখন আসে সামরিক-বেসামরিক আমলাপল্লি, ব্যবসায়ী, বিশেষ বিশেষ পরিবার, পেশিবাজ, স্তাবক, লুটেরা প্রভৃতির কাতার থেকে। যে বিকৃত বিকাশ ঘটেছে তাতে শাসনক্ষমতা হয়ে পড়েছে ফুটবলের মতো; এক দলের লুণ্ঠন-জুলুমের সময়কালটা লাথি মেরে সেই বল পাঠিয়ে দেয় অন্য দলের কোর্টে। আপন গতিতে পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতা বদল হয়ে যায় বলে নিজের কোর্টের বল কেউ আর ছাড়তে চায় না। এটাই আজকের বাংলাদেশের নিয়তি। এখানে কে কার সঙ্গে জোট করল, তা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিজ দল ভুল করলে জোট তাকে রক্ষা করতে পারে না। মূল দলগুলোর রাজনীতি বা কৌশলই এখানে প্রধান।
এর সবগুলোই রাজনীতি ও নেতৃত্বের বিকৃত বিকাশের ফসল। এই বিকৃতির ফসল নিয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি গত জুলাইয়ে আমার লেখা ‘বাংলাদেশকে কসাইখানার দিকে নিয়ে যায় কারা, কেন’ নিবন্ধে, যার লিংক ফেসবুক স্ট্যাটাসের মন্তব্যের ঘরে থাকবে। আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
এখানে আমি শুধু রাজনীতি ও নেতৃত্বের বিকৃত বিকাশের সূত্রগত ভিত্তিটা তুলে ধরতে চাই। একটি কলাগাছের এক পাশে মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা যদি নখে দাগ দিয়ে বলেন ‘এটাই আওয়ামী লীগ’, আর অন্য পাশে দাগ কেটে মাননীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যদি বলেন ‘এটাই বিএনপি,’ বাস্তবে সেগুলোই দল বলে পরিগণিত হয়। এতটাই অধোগতি হয়েছে আপনাদের দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের।
আবার কতগুলো কলাপাতা দেখিয়ে মাননীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যদি বলেন এরাই আমার দলের মূল নেতা, এবং মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও যদি অভিন্ন কথা বলেন, তবে ওরাই দুই দলের মূল নেতা। দলের সম্মেলনগুলোতে এসে এরা আপনাদের দুজনকে নির্বাচন করে বাকিদের নির্বাচনের ভার আপনাদের ওপর ছেড়ে চলে যায়। এর ছাপ গিয়ে পড়ে দেশের মূল ও অঙ্গদলগুলোর সর্বস্তরের কমিটিতে। ফলে নেতা সৃষ্টি না হয়ে সৃষ্টি হয় কতিপয় কর্মচারী, যাদের প্রধান যোগ্যতা সন্ত্রাস বা স্তাবকতা। গ্রামে-গঞ্জে এখন তৃণমূল নেতা-কর্মী নয়, সৃষ্টি হচ্ছে একদল ‘খাদক-গোষ্ঠী’। স্তাবক ও সন্ত্রাসীরা সামনে চলে আসায় নিবেদিতরা পেছনে সরে যাচ্ছে। একদলের স্থানীয় নেতা সন্ত্রাসী হলে অন্য দলকেও সন্ত্রাসীই পুষতে হচ্ছে। ব্যতিক্রম সামান্যই। আর আপনাদের হাল আমলে যখন দেখা যাচ্ছে ভোটারদের আর প্রয়োজন নেই, তখন ধারণা করা যায়, অচিরেই দেশের সর্বস্তরের পদ-পদবিগুলো সন্ত্রাসী, লুটেরা, স্তাবক ও অযোগ্যদের হাতে চলে যাবে। বাংলাদেশ বাচ্চা সাকাওয়ের আফগানিস্তানে পরিণত হবে। যেহেতু বিএনপির পক্ষে আন্দোলনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের দায়িত্ব পালন সুদূরপরাহত, সেহেতু এই আশঙ্কা আরো প্রবল।
এক দল ক্ষমতায় এসে অন্য দলের প্রয়াত নেতার অবদান উড়িয়ে দিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অন্য দলও ক্ষমতায় এসে অভিন্ন কাজ করে। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ ও তার প্রয়াত নায়কদের। তাদের রেখে যাওয়া দলগুলো ক্রমশ দেউলিয়া হয়ে পড়ায় ক্ষমতার প্রাণভোমরা হিসেবে প্রয়াত দুই নেতাকে একচ্ছত্রভাবে হাজির করতে গিয়ে দুজনকেই গালিগালাজের লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত করে চলেছে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও দেখি রক্ত, গুজব আর ঘোলা পানিতে প্রায়ই ভাসে বাংলাদেশ। রক্তপাতের মানচিত্রে লাশের জোগানদার-চলনদারেরা এখনো ক্লান্তিহীন। লাশ জুগিয়ে চলছে সরকার, ভায়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনীতিবিদ, ধর্মগুরু, ধর্ম ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন কেন্দ্র। এ যেন লাশ নিয়ে প্রতিযোগিতার মহোৎসব। লাশই হয়ে পড়েছে ক্ষমতা দখল বা রক্ষার অব্যর্থ সিড়ি, বিকল্পহীন নিয়ামক। লাশের জন্য ছড়ানো হচ্ছে গুজব। ছড়াচ্ছেন তারাও, যাদের আলো ছড়ানোর কথা। লাশ হয়ে পড়েছে তাদের আরাধ্য, যেমন আরাধ্য শকুন ও হায়েনার। জীবিকার অন্বেষণে এসে লাশ হয়ে ফিরছে মানুষ, লাশ হয়ে ফিরছে প্রতিবাদ জানাতে এসে, এমনকি ধর্মকথা শুনতে এসেও। লাশ পেয়ে কেউ ব্যথিত, কেউ উল্লসিত। জীবনের কী করুণ অপচয়।
ইসলামের নামে রাজনীতির কদাকার চেহারা আমরা একাত্তরে ভালোভাবে দেখেছি। আর মুক্তিযুদ্ধের নামে ক্ষমতায় এসে আজ যা করা হচ্ছে তার পরিণাম কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, ভেবে দেখেন। এ নিয়ে এখানে বলার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ সব ঘটছে মানুষের চোখের সামনে। দেশ ইট-সুরকিতে ভরে যাচ্ছে বটে, কিন্তু এসবের নিচেই চাপা পড়েছে বাংলাদেশের আত্মা।
বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়ার ছায়া-অবশেষ হয়ে শুরু করে এখন তা পরিবারতন্ত্রে অধঃপতিত করায় ঘটেছে এই বিকৃত বিকাশ। দেশটা হয়ে পড়েছে দুই দলের খাজনা তোলার উপকরণ। দলের নেতারা কর্মচারী-নায়েব-মোক্তার নয়, জনগণও প্রজা নয়। রাজনীতি পীরের দরগাও নয় যে পরিবারের কাউকেই গদিনসীন করতে হবে।
আপনারা আছেন, তাও মন্দের ভালো। অনেক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছেন। দেশটাকে সাধ্যমতো জেনেছেন। কিন্তু আপনাদের সন্তানদের দল ও জনগণের ওপর এখনই চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তারা একটি দল ও সরকার চালাবার মতো যোগ্যতা ও দক্ষতা এর মধ্যেই অর্জন করে ফেলেছেন বলে মনে হয় না। নেতা হতে হলে দেশে গিয়ে জনগণের মধ্যে কাজ করতে হবে, সর্বাবস্থায় তাদের পাশে থাকতে হবে, তাদের কাছে শিখতেও হবে। উড়ে গিয়ে দলীয় প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া ব্রিটিশ আমলের গভর্নর জেনারেলের মতো অবস্থারই নামান্তর। ধান্দাবাজেরা তাদের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করবে। এতে সর্বস্তরে বিকৃতি আরো বাড়বে, যার পরিণতি ভালো হবার কথা নয়।
যোগ্যতাবিহীন মূল নেতৃত্বের আগমন পরিবার থেকে ঘটলে তাকে দরকারের সময় থামাবার কেউ থাকে না। এ বড় ভয়ংকর অবস্থা। এরা দলীয় নেতা-কর্মীদের মনে করেন কর্মচারী, জনগণকে মনে করেন প্রজা। পরিবারতন্ত্রের এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
দলের কোনো এমপি মারা গেলে আপনারা উপনির্বাচনে মনোনয়নের জন্য প্রথমেই খোঁজেন সেই মৃত ব্যক্তির বউ বা ভাইবেরাদর আছে কী না। এলাকার অন্য নিবেদিত নেতারা, যারা দিনরাত খাটছেন তাদের কথা ভাবা হয় অল্পই। এভাবেও সম্প্রসারিত হচ্ছে বিকৃতি ও পরিবারতন্ত্র। কারণ, মাইন্ডসেটআপ সেভাবেই তৈরি হয়েছে বিকৃত বিকাশের বদৌলতে।
বাংলাদেশ ব্যক্তির শাসন দেখেছে, সামরিক শাসন দেখেছে, পরিবারের শাসন দেখেছে; দেখে চলেছে জনগণকে প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল-উত্তর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। শুধু আইনের শাসনটাই এখনো দেখার বাকি। অথচ এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। দয়া করে আইনের শাসনটাও তাদের দেখতে দিন! তারা কত কাল আর হাইকোর্ট দেখবেন!
দলের ভেতর থেকে অভিজ্ঞ নেতা বাছাই করুন, কর্মচারী সৃষ্টির বদলে নেতা সৃষ্টির অবকাশ তৈরি করুন। পরিবারের কোনো সদস্য রাজনীতি করতে চাইলে তাকে শিখে-পড়ে উঠতে আসায় উৎসাহিত করুন।
রাজনীতি, নেতৃত্ব, গণতন্ত্র, আমলাতন্ত্র, পেশাজীবী সংগঠন ও সুশীল সমাজের স্বাধীন-স্বাভাবিক বিকাশের যে ক্ষতিটা আপনারা করেছেন, দয়া করে তা ঠিক করে দিয়ে যান, বেলা থাকতে থাকতে।
মাননীয় নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিন। ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে। মানুষকে ভোট দিতে দিন।
বাংলাদেশে অন্তত একটি ক্ষেত্রে হলেও আপনাদের এক কাতারে এসে কাজের সুযোগ অবশিষ্ট আছে। সেটি হচ্ছে ভবিষ্যতের ভয়ালতর বিকৃতি প্রতিরোধে পারিবারিক শাসন থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে সরে আসা কিংবা ঐক্যবদ্ধভাবেই পক্ষে দাঁড়ানো। কোনো একজন একা সরে আসতে চাইলেও কঠিন হবে, কারণ আবার চলে আসবে দেউলিয়াজনিত ভারসাম্যের প্রশ্ন।
আমি সব সময় একান্ত বিশ্বাস থেকে যে কথা লিখি ও প্রচার করি, সেটি দিয়েই আমার চিঠি শেষ করব। ভুলত্রুটি মার্জনার চোখে দেখার অনুরোধ করছি।
উপমহাদেশে বাংলাদেশ সবচেয়ে প্রগতিশীল রাষ্ট্র, যার সৃষ্টি হয়েছে রক্তস্নাত স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। অন্য দুটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে আলোচনার টেবিলে, যে দুই দেশে এখন চলছে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মৌলবাদী ও মিলিটারি-কবলিত শাসন।
স্বাধীন-স্বাভাবিক বিকাশের রাজনীতি ও নেতৃত্ব পেলে যে সরব উত্থান ঘটবে, তাতে বাকি দুই দেশকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
আপনাদের দীর্ঘায়ু কামনা করি।
বিনীত,
আহমেদ মূসা
সম্পাদক, সৃজনকাল
৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, টেম্পা, যুক্তরাষ্ট্র।