দুই হাজার কোটিপতির ভোটের খেলা

নিজস্ব প্রতিনিধি : দুজনই কোটিপতি। শত শত কোটি, এমনকি হাজার কোটি টাকার মালিক। ব্যবসায়িক অঙ্গনে দুজনই ব্যাপকভাবে পরিচিত। একজন সমভাবে সমালোচিত। লাখ লাখ মানুষকে পথে বসানোর দায়ে। অপরজন সামাজিক মর্যাদা রাজনীতিবিদদের কাছেও কদর পাচ্ছেন কেবলই অর্থ, সংবাদ ও টেলিভিশনের মালিকানাগুণে। দুজনের পৈতৃক ঠিকানা একই উপজেলায়।
রাজধানীর অদূরেই এই উপজেলা। গোটা উপজেলায়ই তাদের পরিচিতি রয়েছে। এখন তারা মর্যাদার লড়াইয়ে নেমেছেন। একজন নিজে প্রার্থী। অপরজনের স্ত্রী প্রার্থী। স্বামী-স্ত্রী মিলে সমস্ত নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। বিস্ময়করভাবে এই ভদ্র মহিলা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ ধর্মীয় সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ, মসজিদ-মাদ্রাসার ইমাম, শিক্ষকরাও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রকাশ্যে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
দুই প্রার্থীর একজনের নাম সালমা ইসলাম। পেশায় অ্যাডভোকেট। মালিকানাগুণে একটি প্রভাবশালী দৈনিকের সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তারই স্বামী দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বাবুল। অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, মিতভাষী হিসেবে পরিচিত সালমা ইসলাম বিগত সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন। এখন এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। এরশাদকে প্রভাবিত করে নুরুল ইসলাম বাবুল নিশ্চিত ছিলেন, তার স্ত্রীর আসনটি মহাজোটগতভাবে সুনিশ্চিত করা হবে। কিন্তু গোল বেধে যায় এরশাদের হঠাৎ অসুস্থতা এবং পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের ভানুমতির খেলা। সালমার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সালমান এফ রহমান। সঙ্গে বিশেষ বোঝাপড়ায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন বণ্টনে দর-কষাকষিতে হাওলাদার সালমা ইসলামের ব্যাপারে কোনো ভূমিকা নেননি বলে জাতীয় পার্টির সালমা সমর্থক নেতা-কর্মীদের অভিযোগ। এরশাদকে বঞ্চিত করে ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্যের কারণেই প্রধানত এরশাদ মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে হাওলাদারকে সরিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে সালমান এফ রহমানের এলাকায় ব্যাপক পারিবারিক ঐতিহ্যগত সমাদার থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তার তেমন কোনো প্রভাব নেই। একই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক গৃহায়ণমন্ত্রী মান্নান খান। তাকে টেক্কা দিতে পারলেও জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট সালমার মহাজোটগত মনোনয়ন ঠেকানো সহজসাধ্য ছিল না। এলাকায় রাজনৈতিকভাবে সালমা অনেক এগিয়ে। ক্ষমতায় না থাকার পরও এলাকায় অনেক উন্নয়নকাজ করেছেন, অসংখ্য মানুষকে সহায়তা করেছেন ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। শেয়ার মার্কেটে ধস নামিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন সালমান। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘোষণা দিয়েও রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়নি। নির্বাচন সামনে রেখে এলাকায় যোগাযোগ বাড়ালেও সালমার তুলনায় পিছিয়েই ছিলেন।
এবারের নির্বাচন দুই পক্ষই মর্যাদার হিসেবে দেখছে এবং সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। এলাকার অনেক মানুষই নীরব দর্শক হয়ে তাদের প্রতিযোগিতা প্রত্যক্ষ করছেন। এই এলাকার অনেকেই মন্তব্য করেন, এখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চেয়ে টাকার খেলাই হচ্ছে বেশি। সঙ্গোপনে, সুকৌশলে চলছে এই খেলা। ৫০০ টাকা, হাজার টাকার কচকচে নোটের ছড়াছড়ি এখানে। ভোটের আগের দিন রাতে নয়, এই কর্মটি করা হচ্ছে ভোটের চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই। যত দূর জানা যায়, গোটা চার ইউনিয়নের অধিকাংশ ভোটারকে নগদ অর্থে বা অন্যভাবে ম্যানেজ করা বা কিনে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এসব ইউনিয়নের সব দলের নেতা থেকে নিয়ে কর্মীদের হাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া এক পক্ষ তফসিল ঘোষণার পর থেকেই শুরু করে। তাদের ও অন্য মাধ্যমেও দরিদ্র, হতদরিদ্রসহ সাধারণ ভোটার, দলীয় কর্মী-সমর্থকদের হাতে নেওয়া হয়েছে। জনসমর্থনের পাশাপাশি এই অসাধু প্রক্রিয়ায় ভোটে এগিয়ে থাকা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অপর পক্ষ দলীয় মনোনীত হলেও গোপন এই কার্যক্রমে পিছিয়ে নেই। দুই হাতে টাকা বিলাচ্ছে।