দুপুরভরা চাঁদ

রেজা নুর : ঘর থেকে প্রথমে অড়হর খেত দেখা যায়। থোকা থোকা সবুজ ঝুঁকে থাকে। এমন ভোরবেলা বাতাস থাকে না। নিশ্চুপ ঘুম-ঘুম হাওয়া বুঁদ হয়ে থাকে কুয়াশাবনে। কোনো কোনো দিন ফরসা রঙিন আকাশে সূর্য লাল হয়ে আভা ছড়াতে চাইলে খেতটা তবু চোখ তুলে চায় না। ওরা শুধু নয়, …আলের ঘাসগুলো, পাশের বাঁশঝাড় কিংবা কাঁঠালসারি-সবাই শীতের সকালে দেরিতে ওঠে ঘুম থেকে। এদের জাগিয়ে দুটো কথা না বললে দিনের কাজ শুরু হয় না আসাদের।

গ্রামের একেবারে শেষে গাঙপাড়ে ছায়াঘেরা একটি বাড়ি। উঁচু উঁচু মেহগনি গাছ দেয়ালের মতো দাঁড়ানো। কাঁঠাল, পেয়ারা, হরিতকী গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জল দেখা যায়। বিশেষ করে, পশ্চিমের জানালা খুললে। অভ্যাসমতো, জানালা খুলে ঘুমচোখে বাইরে তাকাল আসাদ। সোজা হয়ে বসলে গায়ের লেপ সরে গিয়ে কোমর পর্যন্ত এসে স্থির হয়ে রইল। শীত তেমন নেই। তবু রাত ঘন হলে ঠান্ডা আসে গুটি পায়ে। সেই মেহমান মেহমান হিমের সাথে যোগ হয়েছে কুয়াশা। সারা রাত জোছনা ছিল। কুয়াশায় ছাঁকা আলো এই নির্জন বাড়িটার ওপর ছিল প্রোজ্জ্বল মেঘের মতো। চলমান জলধারা এমনিই আয়না হয়ে চমকায়। আজ চোখ কয়েকবার মিটমিট করেও দেখতে পেল না।

গায়ে চাদর চাপিয়ে বাইরে এল। এক কোনা ঝুলে আছে। মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঝুলন্ত সুতা হেঁটে যাচ্ছে। ও-ঘরে বাবার স্বর ওঠানামা করছে। ফজরের নামাজের পরও বহুক্ষণ জায়নামাজে বসে থাকেন। কত রকম কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে যান। কথাগুলোর মানে জানে না আসাদ। কিন্তু এর ভেতরের ভক্তি টের পায়। ধোঁয়াওঠা রান্নাঘরের চালের দিকে তাকাল। খুটখুট শব্দ আসছে। আধখোলা দরজায় আগুনের আভা। বেলা উঠলে পাতার সবুজে এমন আলো লেগে থাকত। আজ সকালের মন ভার।

চপ্পলের শব্দে রান্নাঘরের দরজায় হাত রেখে বাইরে তাকালেন মা। মৃদু হেসে ছেলের ঘুম-ঘুম চলা দেখছেন। ঘি-রঙের চাদরের আলপনা আঁকা প্রান্ত মাটি ছুঁই-ছুঁই। চাদরের ফুলগুলো ঝুঁকে আছে মাটির দিকে, যেন নিষ্প্রাণ কাপড়খÐে নয়, ওরা চায় মৃত্তিকার ঘ্রাণ। এলোমেলো চুলে একবার আঙুল চালিয়ে আকাশের দিকে দেখল। মাড়ের মতো আলোয় ছেলের মুখ আরও শিশু শিশু মনো হলো মায়ের কাছে। ছেলেবেলায় চুল আঁচড়াতে দিত না। চিরুনি হাতে দেখলেই দৌড় দিত। বলত, ‘ঊষার চুল আঁচড়ায়ে দাও, মা। ওর চুল লম্বা আছে।’ বেশি দিন আগের কথা তো নয়। তবু চোখের সামনে ছেলের এমন সুঠাম পুরুষ হয়ে ওঠা দেখে সময়ের বহতা না মেনে আর উপায় কী। ঊষার বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক। ইচ্ছা ছিল গ্রামেই বিয়ে দেবেন। তা আর হয়নি। অন্তত দশ গ্রাম দূরে গিয়ে পড়েছে ঊষা। প্রতি ভোরের দিগন্ত দেখে মেয়ের কথা মনে করে শ্বাস নেন মা।

উঠানের পরই মাঠের শুরু। আলপথে কিছুদূর গেলে বাজারে যাবার পথ। বেশ চওড়া। গাড়িঘোড়া যেতে পারে। পারখাজুরা বাজার বাঁক নেওয়া কপোতাক্ষের কণ্ঠে বসেছে। এক পাশে দোতলা হাইস্কুল ও প্রাইমারি। তার পরই সারি সারি দোকান নদের কণ্ঠহারের মতো সেজে আছে। রাতের বেলা দোকানগুলোর বিদ্যুতের বাতির ছটা জলে এসে পড়ে। দূর গ্রাম থেকে নৌকাগুলো সে আলো দেখে দেখে ঘাটে এসে ভেড়ে।

এ পথে কত রকম যান চলাচল করতে দেখে। নদের অববাহিকায় যেদিকে চোখ যায়, সবুজ আর সবুজ। কত কত ফসল। পাট, অড়হর, কলাই, ধান এইসব। গরুর গাড়িতে করে বাজারে নিয়ে যায় লোকজন। ঋতুভেদে মাঠের চেহারা বদলে যায়। কিন্তু পানের বরজগুলো দাঁড়িয়ে থাকে একইভাবে। এখন মাঠভরা ধান। মাঝে মাঝে বেগুন ও অড়হর খেত। পাটগাছের মতো লম্বা লম্বা গাছের ডগায় থোকা থোকা হলুদ ফুল। কোনো কোনোটাতে ফুলের পাশে সারি সারি লম্বা অড়হরদানা ঝুলে আছে। বাতাস হলে কানের দুলের মতো দুলত। এখন নিশ্চুপ। একগুচ্ছ অড়হর ফলে হাত রাখল আসাদ। ফুলের পরাগ আঙুলের ডগায় মধুর প্রলেপের মতো মেখে গেল। মাথা ঝুঁকিয়ে ঘ্রাণ নিল। মনে হলো, এই ফুল শুধু নয়, ফল হবার প্রতিশ্রুতি আছে এদের। তাই দ্রুত পাপড়ি ঝরিয়ে দেয়। বড় রাস্তায় উঠবার ঠিক আগেই একটা বেগুন খেত। শীতের বেগুন। ফুলের জামা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে কচি বেগুনগুলো। বসে পড়ল আসাদ। খুব মিহি সাদা সাদা কাঁটাযুক্ত গহন বনের মতো গম্ভীর হয়ে আছে। পাতা বেয়ে শিশির নামছে। খুব সতর্ক ফোঁটায় গুনে গুনে ফেলে দিচ্ছে ওদের স্নেহভরা অশ্রুগুলো। একবিন্দু জল টুপ করে পড়ল পেঁচানো মাটির এক দলায়। মাটি তুলছে কেঁচো। শুকনো ঢিবির পাশেই তরলকাদা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জমা করছে। আনমনে হাসল। ছোটবেলায় ভাবত, এগুলো কেঁচোর ঘর। বৃষ্টি হলে ওরা থাকে এখানে। বন্ধুরা এগুলো ভেঙে দিলে কাঁদত। বলত, ‘উগের ঘর ভাঙিসনে, উরা কানবেনে। পানি হলি থাকপে কনে উরা?’

পথের ধুলো স্নান। কিছুটা লালচে। গুড়ের সন্দেশের মতো বিন্দু বেঁধে আছে। সেই অমসৃণ ধুলোয় কতকগুলো বাদামের খোসা ছড়ানো। কোনো কোনোটা খোলা। বাদাম-দানার বদলে ওখানে এখন শিশির কণা। দু-একটি খোসা উপুড় হয়ে আছে। বুকের ধন উজাড় করে দিয়ে মাটিতে বুক বিছিয়ে কাঁদছে এখন। আরেকটু দূরে দুটো কাগজের ঠোঙা খোলামুখে স্থির হয়ে আছে। চাদরের ঝুলে থাকা ঝালর নড়ে উঠল। পিঠে কারও করস্পর্শের মতো হিম বহতা। বুকে বাতাস ভরে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে ঠোঙা দুটো। পেছনেরটা তাড়া করে ধরতে চাইছে আগেরটাকে। বেশ মজা পেল আসাদ। শব্দ করে হাসল।

দুই

মনিরামপুর উপজেলার প্রায় শেষ সীমানা এই পারখাজুরা, নোয়ালি-কাঁঠালতলা অঞ্চল। এখানকার লোকেদের জীবনযাত্রা মোটামুটি একই রকম। ধান-পাটের সাথে প্রচুর সবজির চাষ হয়। বেলে বেলে মাটি। পানের বরজ প্রায় ঘরে ঘরে। কপোতাক্ষ অনেকটা নিজের আকার বদলেছে। ঝিকরগাছার ওইপার থেকে সরু-তনু কিশোর হয়ে বয়ে আসা কপোতাক্ষ এখানে দুরন্ত যুবা। অল্প দূর সমুদ্দুর, এই ভেবে স্বচ্ছজলের গাঙ, অঢেল ঢেউয়ে গান গেয়ে চলে। দূরের জলের লবণ এনে মেশায় শরীরে। গোসলের সময় সমুদ্রস্নান বলে ভুল হয়। আসাদদের বাড়ির নিচের ঘাটটিও মনে হয় সৈকত। নির্ভেজাল বালু আর্দ্রতায় ধবধবে হয়ে আছে। শত পায়ের দাগ ধুয়ে নেয় জোয়ারের জলে। প্রতিদিন স্নানের ঘোলাটে জল ঢেউ হয়ে ফিরে যায় ভাটির টানে, সমুদ্রস্নানে। এই ঘাটে কুমোরপাড়ার হিন্দু সম্প্রদায় প্রতিমা বিসর্জন দেয়। শারদীয় সময়ে মণ্ডপের মতোই সেজে থাকে। প্রতিমার বিদায়ের সাথে সাথে বেলপাতা, গাঁদাফুল আর ছিন্ন কলাপাতা ভেসে যায় উজানে।

ঘাট থেকে কিছু দূরে জল যেখানে নিতান্ত শান্ত, সেখানে জাল ফেলে আসাদ। বাজারের পরে এইখানে জলের দ্বিতীয় বাঁক। মাঠের এক কোনা যেন কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো। কনুই বাঁকা হয়ে জল ঠেলে ধরেছে। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে পাড়ের ওপর দেখতে মাথা একেবারে তুলে তাকাতে হয়। জাল ফেলার আগে একটু ঝুলিয়ে জলের দিকে তাকায়। কালো জলে মৃদু ঢেউ। শীতের শেষের প্রায়-দুপুরের রোদ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণের দিকে। আর কদিন পর বাঁদার বজরাগুলো গোলপাতা পাখির ডানার মতো দুপাশে ঝুলিয়ে আসবে সারি সারি। সে সময়ে বহুক্ষণ আর জাল ফেলে না। পাকুড় গাছটার ছায়ায় উঁচু পাড়ের পায়ের কাছে বসে থাকে। মাঝিদের একমনে বইঠা বাওয়া দেখে। সুন্দরবন দেখতে সাধ হয়। গল্প শুনেছে অনেক। যাওয়া হয়নি। এই গোলপাতা গাছে কেমন করে দোলে দেখা যেত যদি!

মাত্র কয়েক খেপ ফেললেই খালুই ভরে গেল। একটা বড় রুই, চ্যাঙ, টেংরা, চিংড়ি বেশ কিছু ছোট মাছ নড়ছে। লাফিয়ে বাইরে আসতে চাইছে শিংমাছগুলো। এক হাতে জাল পেঁঁচিয়ে অন্য হাতে খালুই ধরে বাড়ি ফিরল। উঠানের মাঝখানের আড়ায় সুতা ঝুলিয়ে জাল বুনছেন বাবা। মা দুপুরের রান্নার আয়োজন করছেন। কাজের ছেলে বাক্কা আজ বাজারে সবজি নিয়ে যাবার তোড়জোড় করছে। জমিজমা তেমন নেই ওদের। বিঘে পাঁচেক ধানী জমি আর বাড়ির চারপাশে একরখানেক জমিতে সবজি চাষ হয়। বাক্কা আর বাবা দেখাশোনা করে সব। আসাদ শুধু এই জমিগুলোতে সকাল-বিকাল হেঁটে আসে বলা যায়। বাড়িতে দুটো খেয়ে মাঠে মাঠে হাঁটা আর মাছ ধরা ওর কাজ। বাবা কিছুই বলেন না। মা খাবার দেবার সময় ভালো করে দেখেন ছেলেকে। দু-একটি কথা জিজ্ঞেস করেন। হালকা হেসে জবাব দেয়। এই জবাব নির্দিষ্ট কোনো মানে এনে দেয় না মায়ের প্রাণে। মাঝে মাঝে বলেন :

পড়াশুনাডা আবার শুরু কর, বাপ।

না মা, বই হাতে নিয়ে পড়া, আমারে দিয়ে হবে না। মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্যি তো টেস্টে পাসটা পর্যন্ত করালে না স্যারেরা।

তুই ইংরিজেতি ফেল করলি, অঙ্কে ফেল করলি, তা স্যারেগোর কী দোষ?

চিষ্টা তো করতি পারতাম। সুমায় দিয়ে দেখতি পাইরতো স্যারেরা।

তা, মাঠে মাঠে টো টো কইরে ঘুইরে আর কুস্তি লইড়ে কত দিন কাটাবি। বিয়েশাদি না হয় কর। বউর মুখ দেখি।

বউ? হাহাহাহ। না মা। বিয়ের হাওয়ার চাইতে মাঠের হাওয়া খাওয়া অনেক ভালো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছেলের প্লেটে আরেকটু তরকারি তুলে দেন। ঊষার কথা, ওদের ভাইবোনের ছোটবেলার কথা মনে হয়। হু হু করে মন।

দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠানে চকি পেতে বাবার জাল বোনা দেখছে। খুঁটির মাথায় অর্ধেক জালটা কলার মোচার মতো ঝুলে আছে। বাবা দ্রুত হাতে সুতা পেঁচিয়ে যাচ্ছেন। মাকড়সা যেন এক। দুই হাতের চঞ্চলতা দেখছে আসাদ, চঞ্চল চোখে। সাদা সাদা সুতা। ফিনফিন করে উড়ছে মাঠ থেকে বেড়াতে আসা হালকা বাতাসে। উঠানের কোণের গাব গাছটার দিকে তাকাল। গাছের মাথা সুগোল। ঝাঁকড়া সবুজে নিঝুম হয়ে থাকে। সেই ছোটবেলা থেকে এমনই দেখছে। মাটি থেকে মিচমিচে কালো দেহটা মিশেছে পাতার আড়ালের ডালে। প্রতিবছর এর ফুল-ফল দেখে দেখে মন ভরে ওঠে। গাঢ় সবুজ পাতা ছাপিয়ে শেওলা ফুলের মতো ফুল ছেয়ে যায়। কদিন পরে আসে সবুজ সবুজ ফল। পাকে। মনে হয়, গাছে কমলা এসেছে এবার। বাবা বলেন, ‘গাব পাইকেছে। জাল চুবোতি হবে এর রসে। সুতা মজবুত হবে।’ এই সাদা সুতার জাল গাবরসে ডুবে গহন কালো হয়ে উঠবে গাঙের গভীর জলের মতোই। মনের সুখে মাছ ধরতে যাবে সে।

তিন

এলাকার মানুষের মনোরঞ্জন হয় শীতের রাতে পালাগান, যাত্রাপালায়। দিনের বেলা ফুটবল, হাডুডু কিংবা কুস্তি প্রতিযোগিতায়। খাজুরা স্কুল মাঠের এক পাশে কুস্তির কোর্ট কাটা। দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে বাজার কমিটি। দক্ষিণের বাঁদা থেকেও পাহলোয়ানরা আসছে। আশপাশের গ্রামগুলো, শাহপুর, ত্রিমোহিনী, সরসকাঠি থেকেও প্রতিদিন বিকেলে নতুন নতুন মুখ এসে অংশ নেয়। কয়েকটা পর্বে ভাগ করা হয়েছে খেলাটা। প্রতি পর্বের বিজয়ী পরবর্তী পর্বে উন্নীত হয়।

ফুটবল খেলাটা তেমন হয় না আসাদের। হাডুডু আর কুস্তিতে ওর প্রতিপক্ষ সহজেই কুপোকাত। ঝুরঝুরে মাটিতে যখন খেলতে নামে, দর্শক অবাক হয়। কালো কোঁকড়ানো চুল। দুই চিবুকের পাশে, ঘাড়ের প্রান্তে চুলের মেঘ ভেঙে ভেঙে পড়ে। ধুলো মেখে কালো তেলতেলে তনু শতভঙ্গে খেলে খেলার পরতে। পেশিপূর্ণ বাহু নয় আসাদের। স্বাভাবিক সুঠাম দেহ। চওড়া বুক। নাভিমূল থেকে সরু চুলের রেখা পেটের দুই পাশে পথ করে করে এগিয়েছে ওপরের দিকে। বুকের ঠিক মাঝখানে এসে অগভীর জলাশয়ের অতি স্বচ্ছ জলের মতো এলোমেলো কেশগুচ্ছ ছড়ানো মৃদু-উন্নত বুকে।

আজ ফাইনাল খেলা। বাঁদা অঞ্চলের এক পাহলোয়ান আর আসাদ খেলবে। পড়ে আসা বিকেলে উঠানে বসে আছে সে। একটু পরই যেতে হবে। বাক্কা কাজ গুছিয়ে নিয়েছে আগেই। আসাদের বাবাকে সাথে নিয়ে যাবে। ছেলের সবকিছুতে মৌন উৎসাহ আছে বাবার। বাড়ির পাশে কয়েকটি পায়ের দুপদাপ আওয়াজে সচকিত হলো আসাদ। দেখে, অন্য পাড়ার বন্ধুরা এসেছে। খালিদ সবার আগে। হেসে হাত নেড়ে বলল, ‘আর বইসে থাকার সুমায় কি আছে? একুনি ওঠ। হাঁইটে গা গরম কইরে নে।’

‘তুরা বাজারের দিকে আগুতি থাক, আমি আসতিছি।’ বলে বন্ধুদের যেতে বলল।

অন্য এক পথে বাজারের দিকে রওনা হয়। ওদের বাড়ির পাশের ছোট্ট মেহগনি বনটার ভেতর দিয়ে পথ। বন পার হলে অতি ছোট একটি পুকুর। খানাও বলা যায়। বিদায়ী শীতের বিকেলে এখনো দু-একটি শুকনো পাতা উড়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলে। একটু দাঁড়াল। ঝুঁকে থাকল। জলে নিজের ছবি দেখে হাসল অজান্তে। ছোট ছোট মাছ সাঁতার কাটছে। এই মাছগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখে সে। মনে হয়, রুপা বা কাচ দিয়ে তৈরি। সুচালো মাথার দুই পাশে ছোট্ট দুটো মার্বেল বসানো। হাত দিয়ে পানি ছুঁয়ে দিলে তিরতির করে সাঁতরে গেল ওরা। আসাদ বৃক্ষের মতো নীরব হয়ে দাঁড়ায়। পাশের গাছটাও টের পায় না। মাছেদের শান্ত জলের সাঁতারে মায়ের চুলের সিঁথির মতো দাগ উঠে মিলিয়ে যায় আবার। অবাক হয়, প্রকৃতি কত কত ছবি, সুন্দর কত কিছু আড়ালে, অলক্ষ্যে রেখে দিয়েছে। একটু মনোযোগে কি অপার সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায়। সূর্যটা পাতাহীন ডালে যখন প্রথম লাল ঠোঁট ছোঁয়, গাছেদের ঘুম আরও জড়িয়ে জড়িয়ে আসে মনে হয়। থমকে যায় আসাদ, দেখে, আবার হেঁটে হেঁটে যায়।

বড় রাস্তা একটু দূরে। স্কুল ছুটি হয়েছে। একটু পর পর পাঁচ-ছয়জনের জটলা হেঁটে যাচ্ছে। সবার পেছনে তিনটে মেয়ে। পাশাপাশি হাঁটছে। হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। হাসছে। ওদের সাদা ওড়নার মেঘ উড়ে উড়ে পড়ছে একে অপরের গায়ে। এমনিতেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। বইচাপা বুকে হাসির ধকল। ডানের মেয়েটা তো অবিকল বেনুর মতো। চিনতে ভুল হবার কথা নয়। তবে আজ ওর পরনে একটু আলাদা রকম পোশাক। তা ছাড়া কেমন সব ভাবনা দৃষ্টিকে কিছুটা অস্বচ্ছ করে দিয়েছে আজ। আসাদ কয়েকবার তাকিয়ে দূরের আলে হেঁটে যায় পেছন ফিরে। বাজারের পথে উঠবে তিন রাস্তার মোড়ে গিয়ে।

মাঝখানের মেয়েটা জোরে কিছু একটা বলে উঠতে চায়। বেনু বাধা দেয়। মুখ চেপে ধরে বলে, ‘ভালোবাসার মানুষকে অবহেলাও দিতে হয়, সই। মর্ম তখন বোঝে ঠিকঠাক।’

‘বেশি অবহেলায় মন-লতা হেলেও যেতে পারে সই, তখন কী হবে?’

‘আলো আর উষ্ণতা যেদিকে, লতা, সাপের ফণার মতো ঘুরে ঘুরে সেদিকেই আসে। জাইনে রাকিস।’

বেশ দূরে হাঁটতে হাঁটতে আসাদের অবয়ব ছোট হয়ে আসতে থাকে। বিকেলটা যেন পায়ে পায়ে মিইয়ে মেখে রেখে যাচ্ছে ঘাসে, খেতের ঢেউ-ওঠা বাতাসে।

চার

বেশ রাত পর্যন্ত আসাদ বাজারে রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন হবার পর গোসল করেছে গাঙে। বন্ধুরা বাড়ি থেকে কাপড়চোপড় এনে দিয়েছে। বলেছে, ‘আইজ বাজারে তুমারে নিয়ে আনন্দ করব আমরা। বাড়ি যাতি পারবা না।’ হোসেনের চায়ের দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে হইহই করছে সবাই। কেউ বলছে, ‘এত বড় পালোয়ানরে হারায়ে দেছে আমাগের আসাদ। কোম কতা না।’

‘ক্যান, এ-ও বা কোম কিসি। ওই বিটা দেখতি-শুনতি এর চাইয়ে লম্বা-চওড়া হলি কী হবে, আসাদ খেলার টেকনিক জানে। খেলায় কৌশলই আসল। ঠিক বলিচাও, ঠিক বলিচাও।’ সায় দেয় সবাই।

মানুষের এসব আনন্দময় মুখ দেখে খুশিতে মন ঝলমলে হয়। তবু মনের কোণে এক গহিনে ব্যথার কাঁটার কষ্ট ককিয়ে ওঠে নীরবে।

গল্প-গুজবের ভেতর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। হতাশ স্বরের শোরগোলের গুঞ্জন উঠল। এতক্ষণ আকাশে চাঁদ জেগে ছিল, খেয়ালই করেনি কেউ। জোছনায় চিকচিক করে উঠল গাঙের ছোট ছোট ঢেউ। হাতড়ে ম্যাচ খুঁজে পেল না হোসেন। একজন লাইটার জ্বেলে এগিয়ে ধরল। ম্যাচের কাঠি ঘষে লম্বা সলতের ল্যাম্প জ্বালাল। একান্ত অনিচ্ছুক হয়ে হেলে হেলে জ্বলছে শিখা। নিবু নিবু চায়ের চুলার নিচে তখনো গনগনে কাঠের কয়লা। খুঁচিয়ে আগুনকে রাগিয়ে দিল হোসেন। সবার অগোচরে উঠে এল। আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদের বাটি থেকে গলগল করে ঢেলে পড়ছে আলোর দুধ। দৃষ্টি নামিয়ে দেখে গাঙে সেই দুধের ঢেউ। একটু আগের ব্যথা বদলে অন্য এক সুখবোধে ভরে উঠল মন। স্কুলের কোনা থেকে রাস্তায় ওঠার সময় কারও ডাকে দাঁড়াল। আবছায়ার ভেতরও চিনতে পারল। কিছু বলার আগেই ছেলেটি হাত বাড়াল। দুই আঙুলের ফাঁকে এক টুকরো সাদা কাগজ চিকচিক করছে। উল্টোপথে ফিরে যাবার সময় শুধু বলল, ‘বেনু বু দেখা করতি কইয়েছে।’

বুকের ভেতর হু হু সমুদ্র এখন। বহুদিন দেখা হয়নি বেনুর সাথে। পরীক্ষার কথা বলে ব্যস্ততা দেখিয়েছিল। আসাদও তার পর থেকে মাঠে মাঠে খেতে ঘুরে বেড়িয়েছে বেশি। একমনে বাবার জালবোনা দেখেছে। মায়ের সাথে গল্প করেছে, সময়ে-অসময়ে, কারণে-অকারণে। খেলাধুলা ও মাছধরা ভুলে বাক্কার কাজে হাত লাগিয়েছে। আজ বেনু খবর দিয়েছে। জানে, দেখা না করলে ঘুমোবে না সে।

বেনুর জানালায় আলো জ্বলছে। ওদের বাড়িতে বিজলি যায়নি। হারিকেনের আলোয় পড়ে। জানালার শিক গলে পেছনের বাঁশবাগানের সরু পথে আলো পড়েছে। সেই আলো একটুখানি গায়ে মেখে সরে এসে দাঁড়াল শজনে গাছটার নিচে। তাকিয়ে দেখে, জানালায় আলো কমে গিয়েছে। একটু পরে পথে মচমচ শব্দ। আবছায়ার ছায়া এসে থেমেছে সামনে। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জোছনা এসে জোনাকির মতো ছড়ানো। অল্প বাতাসে দুলছে আলোর ফুল। একটি সরু আলো বেয়ে উপরে তাকাল আসাদ।

‘উপরে তাগাও ক্যান। সামনের দিকি তাকাতি পারো না? আমি কি ভ‚ত?’

‘তুমি না, ভ‚ত আমি। শজনেতলার ভ‚ত। তাই তো দেখা করতে চাও না।’

‘থাক, আর নিজির ঘাড়ে দোষ নিতি হবে না। ভুল আমার। পরীক্ষা তাতে কী। কথা তো বলতি পারতাম। মাফ কইরে দ্যাও।’

‘না না। মাফ চাওয়ার কী আছে। মনের ওপর জোর করা পছন্দ না আমার।’

‘তুমার কী পছন্দ, জানি আমি।’

সত্যিই তাই। বেনুর মতো মেয়ে ভালোবাসে ওকে। জোছনার মতো গায়ের রং। শুধু ডানা দুটো নেই। কে বলবে যে সে মানবী। এই পরি খুব শিগগির ঘরে আসতে চায়। অনেক বলেকয়ে বুঝিয়ে রেখেছে। আরও বছর কয়েক যাক। তারপর সব হবে। ঘর বাঁধায় মন বসেনি এখনো। এই পথ, মাঠ, ফসল, গাছপালা, গাঙÑএকান্ত সাথি হয়ে আছে। শুধু ঘুমোনোর সময়টুকু ঘরে থাকা। যেদিন এই মন সমান বিলোনো যাবে ঘরে-প্রান্তরে, ঘর বাঁধবে সেই দিন।

‘কী ভাবছ, আসাদ?’

‘কিছু না তেমন।’

‘শুধু দাঁড়ায় থাকপা, না বলবা কিছু।’

‘বলবা তো তুমি।’

‘চলো, মাঠে হাঁটি।’

‘তুমার কি মাথা খারাপ।

এত রাত্তিরি একলা মাইয়ে আমি অত দূরি যাব?’

‘কিছু হবে না। আইসো। আজ পূন্নিমার রাইত। সারা মাঠে দ্যাকপা দিনির মতো আলো।’

পাঁচ

খুব দেরি করে ঘুম ভেঙেছে আজ। কয়েকবার মা এসে ডেকেছেন। আধোঘুমে এপাশ-ওপাশ করেছে। কেমন এক অবসন্ন মন। বেলা হয়েছে বলে একেবারে গরম ভাত আর তরকারি বারান্দার টেবিলে এসে রেখেছেন মা। বেগুনভর্তা, আলুভর্তা আর মুরগির ঝোল। শুকনো মরিচ দিয়ে ঝাল করে রান্না মুরগির গোশত পছন্দ খুব আসাদের। বেশি বেলার ক্ষিধেয় আরও অমৃতের স্বাদ নিয়ে এল। পানি-লবণ এটা-ওটা আনার ফাঁকে মা প্রাণভরে ছেলের খাওয়া দেখলেন। মাঝে মাঝে হাসি দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাল আসাদ। খাওয়া শেষ হলে মা বললেন, ‘ঊষার আনতি পাটাচ্ছি। বাক্কা যাইয়ে নিয়ে আসপেনে।’

‘তা খুব ভালো হবে, মা। কত্ত দিন দেহিনি বুনডারে।’

দুপুরের রোদে আড়ায় জাল ছড়িয়ে নেড়ে দেওয়া। ঝুলে থাকা জালের কাঠিগুলো ঠিকমতো সাজানো হয়েছে কি না নেড়েচেড়ে দেখছেন বাবা। সুতাগুলো শুকালেও জালের কাঠি চুইয়ে তখনো গাব মেশানো কালো জল ঝরছে দু-এক ফোঁটা। গত সপ্তাহখানেক থেকে বড় বালতিতে চুবিয়ে রেখে রেখে সাদা জাল এখন মিচমিচে কালো। গাঙে ফেললে জল আর জাল আলাদা করে চেনা যাবে না।

‘আব্বা, নতুন জালে মাছ ধরতি যাব আজ। নেব, জালডা?’

‘আরেকটু দেরি কর। রং কাঁচা আচে। ঘণ্টাখানেক শুকোক।’

অন্যান্য দিন হলে হুট করে বাড়ির বাইরে চলে যেত। আজ চৌকিতে বসে একমনে তাকিয়ে আছে জালটার দিকে। একটু পরপর দেখছে চারদিক। হাঁটতে শেখা অবধি এই উঠান, সামনের মাঠ, চারপাশের গাছপালা প্রায় একই রকম দেখতে। আগের চেয়ে ছায়া ছায়া ভাবটা যা বেড়েছে। গাছগুলো আরও ডালপালা মেলেছে তাই। ঊষার কথা মনে পড়ে খুব বেশি। সে সংসার ছেড়ে আসতে পারে না তেমন। যাওয়াও হয়ে ওঠে না। বাড়িটা লোকালয় থেকে একেবারে আলাদা, প্রায় নির্জন মনে হয়। মায়ের যেন সময় আর কাটতে চায় না। তার বউমা আনার আবদার এবার রাখতেই হয়।

‘জাল শুকোয়েছে, খুকা’। বাবার ডাকে ফিরে তাকাল আসাদ। হেসে এক হাতে জাল গুটিয়ে অন্য হাতে খালুই নিয়ে গাঙের পথ ধরল। ঝাঁজালো রোদের দুপুর। ঝকঝকে নীল আকাশ। পশ্চিম দিগন্তের কোনায় শুধু একখÐ সুরমা-আঁকা মেঘ।

গাঙে আজ ¯্রােত বেশি। বারবার জাল ফেলেও মাছ উঠছে না। গোসলের ঘাটের ওপাশ থেকে নিয়ে চওড়া বাঁকা স্থানটায়ও চেষ্টা করে লাভ হলো না। ভিজে পায়ে থপথপ করে ভেজা মাটির ওপর পা দাবিয়ে হেঁটে অপেক্ষাকৃত একটু সরু জায়গায় এসে দাঁড়াল। দুপুরের কড়া রোদ জলে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে তারা খেলা করছে। বসে জিরিয়ে নিতে নিতে দেখছে আসাদ। জালের সুতাটা ডান হাতে পেঁচিয়ে উঠে পড়ল। ডান হাতের কনুইতে জাল আটকে খানিকটা নামল। হাঁটু-পানিতে নামার পর কারও ডাকে পেছনে তাকাল।

‘জাল ফেলতি অত পানিতি যাচ্চাও ক্যান, আসাদ?’

‘এইপারে মাছ হচ্চে না, তাই ওইপারে যাচ্চি, চাচা।’

‘সে-কি কতা কও। গাঙে একন কলাম খুব সোরোত। যাতি চালি, হাতের গিরে খুইলে সাঁতার দেও।’

‘না গো চাচা। এক বিগেত গাঙ পার হব তাতে আবার এত সতর্ক হতি হয়!’

‘সাবধানের মাইর নেই গো, বাপু। যা কচ্চি তা-ই শোনো।’

লোকটার সাথে কথা বলতে বলতে প্রায় মাঝগাঙে এসে পড়ল আসাদ। হঠাৎ পায়ের নিচে ঠাঁই পেল না। হালকা লাগল নিজেকে। সরুজলে প্রবল স্রোতের তোড়। মুহূর্তে কনুই থেকে জাল টেনে নিল স্রোত। জালের প্রান্তে আঁচল-চাবির মতো ঝোলানো লোহার কাঠিগুলো জলের তলের মাটি স্পর্শ করতে নেমে যাচ্ছে দ্রুত। স্রোতে ভেসে যাচ্ছে আসাদ। ডুবে থেকে থেকে একটু পরপর মাথা উঠিয়ে নিশ্বাস নিতে চাইছে। ডাঙা থেকে চিৎকার করছে লোকজন। কুস্তির জয়জয়কারের মতো যেন সেই গুঞ্জন। প্রতিবার উঠে সূর্যের দিকে দেখছে। ঝাঁপসা চোখে পূর্ণিমার চাঁদের মতো লাগছে এখন। জাল ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে জলের অতলে। চাঁদটা আলোয় আলোয় ডাকছে মাঠের পথে হেঁটে যেতে। ওই তো বেনুর মুখ। দুধের মতো জোছনা-বিছানো রাতে হাঁটছে দুজন। মধ্যরাত। চাঁদটা ঠিক মাথার ওপরে। বেনুর চুলে জোছনার চুমো। পরিটার জন্য আর পাখার প্রয়োজন নেই। এমন আলোয় দুই হাত মেলে দিলে খুলে যায় সাত আকাশ।

পাঁচ-ছবার মাথা তোলার পর আর ওঠেনি আসাদ। দুই দিন পর হাতের কবজিতে জাল নিয়ে ভেসে উঠেছিল। ঢেউগুলো তাকে তুলে দিয়েছিল ডাঙায়।

-ম্যাসাচুসেটস।