দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স বনাম খাদ্য মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিনিধি : ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির ব্যাপারে খাদ্য অধিদপ্তর অধিদপ্তর অভিনব পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। কার্যাদেশ দেওয়ার আগেই খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে ভেড়ে। তার দুদিনের মধ্যেই সরবরাহকারীকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ৫০ হাজার মে. টন গম কেনার জন্য কোটেশন সিডিউল বিক্রির তারিখ ছিল ৩১ জানুয়ারি। আন্তর্জাতিক কোটেশনে সিডিউল বিক্রি হয় সাতটি। কোটেশন জমা পড়ে চারটি। কোটেশন জমা দেওয়ার সময় স্থির করা হয় ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। কোটেশন উন্মুক্ত করা হয় ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল আড়াইটায়। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় পরদিন ৪ ফেব্রুয়ারি। সেই সভাতেই চার দরদাতার মধ্যে মেসার্স এগ্রো ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডকে বেছে নেওয়া হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিষয়টি তোলা হয় এবং বৈঠকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ৫০ হাজার মে. টন গম ক্রয়-সংক্রান্ত প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। বিস্ময়করভাবে এই সময়ের মধ্যেই গমবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে ২ ফেব্রুয়ারি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, খাদ্য অধিদপ্তর ও দরদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে গমবাহী জাহাজ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত নমুনা প্রথমে খাদ্য অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে গুণগত মান নিশ্চিত করার সনদও সংগ্রহ করা হয়। নজিরবিহীন অসততা ও দ্রুততার সঙ্গে নিয়মমাফিক প্রচলিত কাজগুলো সম্পাদন করে সরবরাহকারীর কাছ থেকে গম ক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
উল্লেখ্য, মেসার্স জে কে ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লি., মেসার্স ফনিক্স গ্লোবাল ডিএমসিসি ও মেসার্স সুইস সিঙ্গাপুর ওভারসিস এন্টারপ্রাইজেস প্রাইভেট লি. নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানও আন্তর্জাতিক কোটেশনে অংশ নেয়। তাদের গমবাহী কোনো জাহাজ এই সময় চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়েনি। তাদের কাছ থেকে নমুনা গম সংগ্রহ ও পরীক্ষাও করা হয়নি। একটি মাত্র কোম্পানিকে ঘিরে খাদ্য অধিদপ্তরের যাবতীয় কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই বিরাট অংশ হয়ে আছে। তাদের ভাষ্য, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। এসবই কি দুর্নীতি, অনিয়মমুক্ত স্বচ্ছতা?
জানা যায়, প্রতি টন গমের দাম পড়েছে ২৯৯ দশমিক ০৭ মার্কিন ডলার, কেজিপ্রতি ২৫ দশমিক ১২ টাকা। অপর তিন প্রতিষ্ঠানের কোট করা দাম ৩০২ ও ৩০৯ মার্কিন ডলার। মেসার্স এগ্রো গ্রুপ সর্বনি¤œ দরদাতা হয়। ৫০ হাজার মে. টন গম আমদানিতে ক্রয়মূল্য বাবদ পড়ছে মোট ১২৫ কোটি ৬০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। সরকার চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ মে. টন গম কিনবে। এ জন্য ৮৯০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি খাদ্যভান্ডারে মজুদ রয়েছে ১৫ লাখ ২১ হাজার টন খাদ্যশস্য। এর মধ্যে গমের পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার মে. টন। গমের মজুদ কম থাকলেও সামগ্রিক মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকার পরও অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি করে অসাধু প্রক্রিয়ায় ৫০ হাজার মে. টন গম কেনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, গমের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ড্যামেজড শস্যের পরিমাণ ৪ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ হওয়ার কথা। ফরেন ম্যাটেরিয়াল থাকার কথা ০ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ১ শতাংশ। খুদের পরিমাণ যেখানে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হওয়ার কথা, সেখানে খুদের পরিমাণ ৭ শতাংশ। প্রোটিন কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এই গমে প্রোটিনের পরিমাণ ১১ শতাংশ। ময়েশ্চার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু এই গমে ময়েশ্চারের পরিমাণ ১৫ শতাংশ। কোটেশনে রাশিয়া ও ইউক্রেন উৎসের গম সরবরাহ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এই অসাধু প্রক্রিয়ায় অপেক্ষাকৃত কম রেট দিয়ে নি¤œমানের গম সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সরবরাহকারী ও অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা বিপুলভাবে লাভবান হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খাদ্যশস্য আমদানিতে খাদ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ বরাবরই রয়েছে। গত এক মেয়াদে তা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।