দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান এবং বাংলাদেশ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের শুভযাত্রায় বাংলাদেশ সরকারকে জানাই সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও শুভ কামনা। প্রবাসজীবনে বাংলাদেশিরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, দেশের প্রতি তাদের যে অন্তহীন ভালবাসা, তা স্বদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের হৃদয়ঙ্গম করার আদৌ সুযোগ নেই। প্রবাসজীবসের প্রতিকূলতা এবং ঘাত-প্রতিঘাত দেশে বসে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করা যায়না। বর্ণবৈষম্য, ঘাত-প্রতিঘাত, ক্রীতদাসসম ব্যবহার, বাসস্থান সংঙ্কট- সবকিছু মিলিয়ে প্রতিনিয়ত বৈরী পরিবেশের পাঞ্জা লড়েই প্রবাসজীবন কাটাতে হয়। নামাজান্তে জায়নামাজের উদার জমিনে বেদনার অশ্রু যখন গড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশে মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকুক, মুক্ত স্বাধীনবাংলা সাবভৌম ক্ষমতায় সারা বিশ্বের বিস্ময় সোনার বাংলা হয়েই চির প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই প্রধানমন্ত্রী। তিনি কোন দলের চেয়ারপারসন সেটা বিশ্বসভায় বিবেচ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বিশ্বসভায় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ভবিষ্যত কর্মকাণ্ড, বৈদেশিক নীতির রূপরেখা- এক কথায় সার্বিক উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা উত্থাপন করেন। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি নামক যে দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে তার সমূল উৎপাটন ছাড়া বর্তমান সরকারের যাবতীয় সাফল্য এবং উদ্যোগ চিরতরে নস্যাৎ হয়ে যাবে। আর সরকারের সামগ্রিক অর্জনের সিংহভাগই কলঙ্কের কালিমায় নিষ্প্রব হয়ে যাবে।

সোনার বাংলা গড়ার রূপরেখার মূল বিষয়টি অবশ্যই সবার হৃদয়ে প্রোথিত। আওয়ামী লীগ, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সরকারের বিভিন্ন স্তর বা পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে শুদ্ধি অভিযানের শুভসূচনা, তা স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৮ বছর পরে হলেও এই দুরূহ, সাহসী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বলা যায়, এটা প্রতিটি বাংলাদেশির হৃদয়ের প্রত্যাশিত বিষয়। এই উদ্যোগ মাঝপথে যেনো থেমে না যায়, যে লক্ষ্যে সরকারের কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা দরকার এবং যে কোন মূল্যে চ‚ড়ান্ত সাফল্য অর্জিত হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা তেকে অধঃস্তন কর্মকর্তা কেউ যেন এ অভিযানের আওতামুক্ত না থাকে। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ভ‚মি, রাজস্ব, সরকারি ক্রয়, কনস্ট্রাকশন, রাস্তা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য- এসব খাতে স্থানীয়ভাবে দুর্নীতির প্রভাব অনেক। এছাড়া সরকারের অঙ্গ সংগঠন বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, রাজউক, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, শেয়ার বাজার, ফেডারেল ব্যাংক থেকে শত কোটি ডলার চুরি, স্থানীয় অভ্যন্তরিণ ব্যাংক থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার অর্থাৎ কোন একটি অনৈতিক কাজও যেন এই অভিযানের আওতামুক্ত না থাকে। বিদেশে পাচার করা সমস্ত টাকা দেশে ফেরত এনে দোষীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দোষীদের উপযুক্ত শান্তি প্রদানে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনীয় আইনের সংশোধন করতে হলে তাও করতে হবে। এমন কি সর্বোচ্চ বিচার বিভাগের দায়িত্বে রত কর্মকর্তা হতে নিম্ন আদালতের কর্মকর্তাদের স্থাবর-অস্থাবর সহায়-সম্পত্তির একটি পরিষ্কার হিসাবও সরকারের জানা থাকা প্রয়োজন। এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন, যাদের অনেক নিকট আত্মীয়-স্বজন বিদেশে অবস্থান করেন। নিজেদের অবৈধ উপার্জনের টাকা গোপন পথে তাদের কাছে পাঠিয়ে সে টাকা বিদেশ থেকে আত্মীয়ের কাছ থেকে ফেরত আনেন বৈধভাবে উপঢৌকন হিসাবে। এভাবেই অবৈধ টাকা জায়েজ করেন দুর্নীতিবাজরা। স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে এ যাবত সংঘটিত সব দুর্নীতির সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিচারের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকারের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন মন্ত্রী অত্যন্ত সুকৌশলে সমস্ত দুর্নীতি প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়েছেন। তারা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই বর্তমান অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তার মানে এই যে, এতদিন বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানতেন! যে কারণে তার অনুমতি ছাড়া এ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি!

দ্বিতীয়ত, ক্যাসিনো ব্যবসার প্রথম লাইসেন্স বিএনপিই হাওয়া ভবন থেকে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে বহু ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে (বিতর্কিত) মৃত্যুদণ্ড এবং কারাবাস নিশ্চিত করে। কিন্তু এই অবৈধ ক্যাসিনো বা মদ-জুয়ার বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কেন? যাকে আপনারা দেশরত্ন, গণতন্ত্রের মানসকন্যা উপাধিতে ভ‚ষিত করছেন, তাকে আপনারা নিজেদের স্বার্থে, পার্টির অস্তিত্ব দৃঢ় করার লক্ষ্যে ভাল কোন পরামর্শ না দিয়ে, এমন কি দেশের মানুষের স্বার্থে ভাল করে দিক-নির্দেশনা না দিয়ে যে ক‚ট পরামর্শ দিয়ে আসছেন। আবার প্রধানমন্ত্রীর অজান্তে এসব কুকর্ম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তা দেশের জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনেনি বরং কলঙ্কিত করেছে দেশ, জাতি ও সরকারকে। দেশের মানুষ অত বোকা নয়। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ফেডারেল ব্যাংক হতে শতকোটি ডলার চুরির নায়করা এখন কোথায়? দেশবাসী জানতে চায়। প্রধানমন্ত্রীকেই যদি সব কাজ করতে হবে, তবে আপনাদের মত মন্ত্রীর প্রয়োজন আছে কি? বিশ্বসভায় প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার সফল বাস্তবায়নে যেমন বিশ্বব্যাপী সুনামের দাবিদার, তেমনি বিফলেও আছে তিরস্কার।
-নিউ ইয়র্ক।