দুর্নীতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ

এম আর ফারজানা
বিশ্ব বিপর্যস্ত করোনাভাইরাসে। করোনা থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন দেশে চলছে ভ্যাক্সিন আবিস্কারের প্রতিযোগিতা। সেসময় আমরা দেখি আমাদের দেশে ভাইরাস নিয়ে দুর্নীতির চিত্র। পৃথিবীর আর কোন দেশে ভাইরাস নিয়ে এমন কলঙ্কজনক অধ্যায় দেখিনি। নীতিহীন মানুষরাই দুর্নীতি করে। আমরা যখন আমাদের নীতি থেকে দূরে সরে যাই, তখনই দুর্নীতি হাতছানি দেয়। লোভের জিহ্বা লক লক করে বাড়তে থাকে। আমরা ডুব দেই দুর্নীতির সাগরে। শুধু একজন নয়, সাথে আশেপাশের সবাইকে নিয়ে দুর্নীতির বাণিজ্য শুরু করি।
করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে চিকিৎসা-টেস্টের নামে দুর্নীতির বটগাছ গড়ে তুলেছেন জেকেজি আর রিজেন্ট হাসপাতাল। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান দুর্নীতিবাজ শাহেদের ক্ষমতার অপব্যবহার অনেকের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। আর জেকেজি হেলথকেয়ার (জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা)-এর এমডি আরিফুল চৌধুরী এবং চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট দেখিয়ে দুর্নীতির জাল বিছিয়ে ধরেছেন সাধারণ মানুষকে। কামিয়ে নিয়েছে লক্ষ, কোটি টাকা। সাবরিনা একজন চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশা এমন একটা পেশা, যেখানে সাবরিনা নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন।
অথচ ডা. সাবরিনা কি করলেন? অতিমাত্রার লোভে ডুবে গেলেন অসৎ পথে। তিনি চাইলে মানুষের আইডল হতে পারতেন। সে সুযোগ তার ছিল। কোভিড-১৯-এর ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে মানুষের বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা, দুর্নীতি করে অর্জিত টাকায় গাড়ি-বাড়ি করা যায়, কিন্তু দিনশেষে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। প্রায় ১৫,৪৬০-কে কোভিড-১৯ টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছে জেকেজি। যেনো এ এক রূপকথার গল্প!
আর রিজেন্টের শাহেদ, যার নামে ৩২টা মামলা আছে, যে টক শো করে। লীগের উপ কমিটিতে ছিলেন, বিভিন্ন সময় নিজের পরিচয় দিতেন বিভিন্ন নামে। কখনো মেজর, কখনো সচিব বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৪ সালে শেষ হয়ে গেছে। আর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। কীভাবে সরকার এমন একটি হাসপাতালের সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা চুক্তিতে গেল? হাসপাতালটির সঙ্গে সরকারের চুক্তি ছিল ভর্তি রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার। সরকার এই ব্যয় বহন করবে। কিন্তু রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, করোনার নমুনা পরীক্ষা না করে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করত তারা। নিয়ম বহির্ভূতভাবে রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছে। উদ্দেশ্য অসৎ হলে যা হয়। একদিকে রোগীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, আবার অন্যদিকে রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে- এ মর্মে সরকারের কাছে প্রায় দুই কোটি টাকার বিল জমা দেয়। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই ইনকাম! লোভের অসীম পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাধারণ জনগণের। যাদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে ইতালিতে যাওয়া দেশের অনেকের করোনা পজেটিভ ধরা পড়েছে, অথচ দেশ থেকে তারা করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেসব সার্টিফিকেট ছিল ভুয়া। যারা নিয়েছে, তারা হয়ত ধারণাও করতে পারেনি এমন হবে! ইতালিতে তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে চিকিৎসার জন্য এবং এসব খবর ইতালির গণমাধ্যমে ফলাও প্রকাশিত হয়েছে, ফলে বাংলাদেশের সাথে ইতালির ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত। দুর্নীতির প্রভাব এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ। বিশ্ববাসী জেনে গেছে আমরা ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট তৈরি করি। এতে শাহেদ, সাবরিনা বা আরিফুলের যত না লাভ হয়েছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের।
করোনাভাইরাসের প্রকোপে যেখানে সারাবিশ্ব লড়ছে, সেখানে এই করোনা নিয়েও ব্যবসা করতে হবে? মানুষ কতটা জঘন্য হলে, কত নিচ হলে এমন কাজ করতে পারে, তা ভাবা যায়? সাবরিনা ও আরিফুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে, শাহেদও হয়ত গ্রেফতার হবে। কিন্তু তাদের যারা সহযোগিতা করেছে, তারা কি গ্রেফতার হবে? দেশের এই অবস্থা একদিনে এমন হয়নি। দুর্নীতির চারাগাছ এখন বটগাছে পরিণত হয়েছে। একটা চারা গাছকে আপনি যত সহজে উপড়ে ফেলতে পারবেন, একটা বটগাছকে কি তা করতে পারবেন? কখনই না। কারণ বটগাছটা ডালাপালা মেলে শিকড় ছড়িয়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাকে উপড়ে ফেলা সহজ নয়। দুর্নীতি এখন বটগাছের মত সমাজে জেঁকে বসেছে। সমাজের প্রতিক্ষেত্রেই এখন দুর্নীতি। কেউ গোপনে করে, কেউবা সহযোগিতা করে। সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, ধরা না পরা পর্যন্ত সবাই সাধু! ধরা পরলে দেখা যায়- মূল ব্যক্তিকে আর সহযোগীরা চেনে না! কিন্তু একজন মানুষ চারপাশের মানুষের সহযোগিতা ছাড়া তার পক্ষে দুর্নীতি করা সম্ভব না। যারা দুর্নীতিকে সাপোর্ট করে, তারাও দুর্নীতিবাজ। শাহেদরা সাপোর্ট পেয়েই এতদূর এসেছে।
শুধু কি করোনাভাইরাস? নিউজে দেখলাম, কিছু গাড়ি চালকের সাথে শাহেদের চুক্তি ছিল পথচারীদেরকে লক্ষ্য করে গাড়িচাপা দিয়ে আহত করে জোরপূর্বক ঐ হাসপাতালেই এনে ভর্তি করা। এতে চালক আট হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেত। আর হাসপাতালে আহত রোগীকে এনে ভুয়া আইসিইউতে ভর্তি করিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে লক্ষ-লক্ষ টাকার বিল আদায় করত। কত জঘন্য! ভাবতেই অস্থির লাগছে। এদের ঘৃণা করতেও ঘৃণা লাগছে!
কিছুদিন আগে সাংসদ শহীদ ইসলাম পাপুল লক্ষ্মীপুর থেকে (স্বতন্ত্র প্রার্থী) নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বিদেশে মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতের জেলে আটক আছেন। কুয়েতে তার প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করেছে সে দেশের সরকার। ভাবা যায়, একজন সাংসদের এমন অপকর্মের কথা? একজন সাংসদের ক্ষমতা অনেক। তার উদ্দেশ্য মহৎ হলে সমাজের আবর্জনা দূর করে পরিচ্ছন্নতার চাদরে মুড়িয়ে দিতে পারেন একটা সমাজকে। জনগণের সেবা করার এমন সুযোগ অন্যরা খুব একটা পায় না। একজন সাংসদ জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে গিয়ে কথা বলবেন এটাইতো হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা দেখছি তার উল্টা চিত্র। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে যখন একজন সাংসদকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় তার অপকর্মের জন্য, তখন শুধু একজন সাংসদই অপমানিত হয় না, সেই সাথে দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়। কারণ বিদেশে তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। লাল-সবুজের পতাকা বাহক একজন প্রতিনিধি। পাপুল বিদেশের পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছেন তার অপকর্মের জন্য। এরা নিজেরা ডোবে, সাথে দেশকেও ডোবায়।
আরেক নিউজে দেখলাম, দুবাইয়ে ড্যান্সবারে বাংলাদেশি তরুণীদের দিয়ে যৌন ব্যবসাকারী বিএনপি নেতা আজম খান গ্রেফতার হয়েছেন। চাকরির লোভ দেখিয়ে আট বছরে সহস্রাধিক নারীকে পাচার করা হয়েছে দুবাইয়ের চারটি তারকা হোটেলে। দেশের মেয়েদের এভাবে পাচার করতে তার একটুও বুক কাঁপেনি? আচ্ছা তার পরিবারের, বোন-ভাগনি-স্ত্রীকে অন্য কেউ যদি পাচার করত, কেমন লাগত তার? আসলে এরা মুখোশের আড়ালে মানুষ নামের কীট।
খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা একা নয়, এদের চক্র আছে। অর্থাৎ অনেকে মিলেই এসব ব্যবসা করে। আমরা যারা প্রবাসে থাকি, এসব নিউজ দেখে বিব্রত হই। কারণ দেশে দুর্নীতি এখন ডাল-ভাত হয়ে গেছে। পাপুল, আজম খান, শাহেদ ,পাপিয়া, সাবরিনা- আরো কত কত নাম!
সমাজের স্তরে স্তরে আজ দুর্নীতি। তাই বলে বিদেশেও দেশের নাম ডোবাতে হবে? এমনিতেই বর্তমানে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে ভাইরাসের কারণে। এখন যদি এসব কারণে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়, এতে শুধু সরকারেরই ক্ষতি হবে না, এতে দেশের সুনামতো যাবেই, সেই সাথে অর্থনীতির একটা প্রভাব পড়বে দেশের উপর, ক্ষতি হবে জনগণের। সত্যিকার অর্থে যারা দেশকে ভালোবাসেন, আর যাই হোক দেশের ক্ষতি করতে পারে না, তিনি দেশে থাকুন আর বিদেশ। বিদেশে অনেকেই দেশের মান উজ্জ্বল করছেন তাদের কর্মকান্ড দিয়ে। লাল-সবুজের পতাকা যখন দেখি বুকের মধ্যে একটা আলোড়ন তুলে যায়, মনে হয় এইতো আমার দেশ। তাই বিদেশে যখন দেশের এমন দুর্নীতির খবর দেখি, সত্যি বিব্রত হই।
-নিউজার্সি।