দেশে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি

নিজস্ব প্রতিনিধি : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ অনেকটা ভেঙে পড়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের জনগণকে উৎপাদন বাড়ানো ও সঞ্চয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও ২০২৩ সালে বিশ্বে মন্দার আশঙ্কা করছে। বলা হচ্ছে, বিশ্বে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক মন্দা বর্তমানের তুলনায় আরও ব্যাপকভাবে দেখা দিতে পারে।
আগামী বছর এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের খাদ্য ঘাটতি বড় সংকটের আকার নেবে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। মারাত্মক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হুমকিতে থাকা এসব দেশের তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশেরও। বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে এফএও। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সংস্থাটির ‘ক্রপ প্রসপেক্টস অ্যান্ড ফুড সিচুয়েশন’ শীর্ষক প্রান্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত মারাত্মক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে এশিয়া মহাদেশভুক্ত দেশ আছে নয়টি, বাংলাদেশসহ যার তিনটিই আবার দক্ষিণ এশিয়ার।
বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর উপস্থিতিকেও দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু অবস্থান করছে বাংলাদেশে। বর্তমানে বিশ্বে বহিরাগত উদ্বাস্তুদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়দাতা দেশ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক দাতাদের সহযোগিতায় এ উদ্বাস্তুদের ভরণপোষণ করা হলেও এখন সে সহায়তাও দিনে দিনে কমে আসছে। একই সঙ্গে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে বাংলাদেশ।
দেশে ১৭ কোটি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যপণ্যের তালিকায় রয়েছে চাল, ডাল, তেল, আটা, ময়দা, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম ছাড়াও সব ধরনের শাকসবাজি ও ফলমূল। উদ্বেগের কারণ হলো, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভরতা রয়েছে। তা ছাড়া খাদ্যপণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গেছে। বেশ কয়েক মাস ধরে দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের বাজারে অস্থিরতা চলছে। দেশে উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে চালের দাম বেড়েছে। এ বছর আগাম বন্যা, কম বৃষ্টিপাতের কারণে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। আটাও বিক্রি হচ্ছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে। শাকসবজি, মাছ-মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামও অনেক বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। এর বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন হচ্ছে মাত্র আড়াই লাখ টন। চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানি হচ্ছে। চিনির চাহিদা ১৮ লাখ টন, সেখানে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ৩০-৪০ হাজার টন। অর্থাৎ চিনির চাহিদারও প্রায় ৯৯ শতাংশ আমদানি-নির্ভর। মসুর ডালে পাঁচ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ঘাটতি সাড়ে তিন লাখ টন। পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি। তবে ৩৫ লাখ টনের বেশি উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ জটিলতায় পচে যায় ২৫ শতাংশ। ফলে প্রতিবছর ৮-৯ লাখ টন আমদানি করতে হয়। আটা-ময়দার চাহিদা পূরণে প্রতিবছর চাহিদাকৃত গমের ৮৫ শতাংশ আসছে বিদেশ থেকে। ধানের উৎপাদন ভালো হলেও স্বস্তি নেই অভ্যন্তরীণ বাজারে। তা ছাড়া বন্যা, খরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উৎপাদন কমার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে প্রতিবছরই। ফলে উৎপাদন হলেও আমদানি-নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। খাদ্যের এ পরিস্থিতির মধ্যে দেশে চলছে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট। ডলারের বিনিময় হার নিয়মিত ওঠানামা করছে। ব্যাংকগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় ডলার নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন মেটাচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ১৬ লাখ ৬৯ হাজার টন খাদ্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে চালের মজুত ১৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। মজুত বাড়ানোর জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির চেষ্টা করছে। বেসরকারি খাতেও আমদানি উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বৈশ্বিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে খাদ্য নিরাপত্তায়। সেখানে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে সব পণ্য চাইলেও চাহিদামতো উৎপাদন করা যাবে না। তাই আমদানিও করতে হবে। কিন্তু সেখানেও সক্ষমতা থাকা লাগবে, যাতে খাদ্য আমদানিতে ডলার সংকটে পড়তে না হয়।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি উন্নতির দিকে গেলেও করোনা মহামারির প্রভাবে আবারও তার অবনতি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, দেশে দারিদ্র্যের হার হচ্ছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে অতিদরিদ্র ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। কৃষিসচিব মো. সায়েদুল ইসলাম বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমরা ধান, গম ও ভুট্টা ছাড়াও সব ধরনের দানাদার ফসল শাকসবজি, ফলমূলসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যেরও উৎপাদন বাড়াতে জোর দিয়েছি। পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে। এক ফসলি জমিকে দুই ফসলে এভাবে ততোধিক ফসল উৎপাদন শুরু হয়েছে। সার, বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ, কীটনাশক, মাড়াই যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপে খাদ্য উৎপাদনও বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। ফলে যে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা বলা হচ্ছে, ওই সময় আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হব। খাদ্যসচিব মো. ইসমাইল হোসেন জানান, সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ বা মন্দা মোকাবিলায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়ানোর ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের খাদ্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আগাম আমদানিও অব্যাহত রাখা হবে।